রা জ নী তি

বাস্তবতার বিচার ও শুভবুদ্ধি দেখতেই আগ্রহী

আপডেট : ১৪ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ২১:৪৭
রাজনৈতিক সংকট ঘনীভূত হয়ে উঠলেও এখন রাজপথে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি সামলাতে হচ্ছে না সরকারকে। শুধু সরকার নয়, জনসাধারণও এমনতরো পরিস্থিতি মোকাবিলা করে। এটা করে বিশেষত শহর-বন্দরের মানুষ। এরা বেশি আয় করে, এক অর্থে বেশি অবদান রাখে অর্থনীতিতে। ভালো যে, হরতাল-অবরোধের মতো কর্মসূচি গ্রামীণ জীবন ও অর্থনীতিকে বড় একটা ছোঁয় না। তবে তারাও খবর রাখেন— রাজধানীতে কী হচ্ছে। আমরা যারা এখানে বসে সংবাদপত্রে লেখালেখি করি, টকশোয় যাই, তারা দেশের খবর বেশি বা ভালোভাবে রাখি বলে মনে করা হয়। গ্রামে বসবাসকারী আত্মীয় ও পরিচিতজন ফোন করে জানতে চান রাজনীতির ভেতরের খবর। কোনো সমঝোতা কি হয়ে যাবে শেষ মুহূর্তে? তাদের ব্যাকুল প্রশ্নে বোঝা যায়, দেশে আর কোনো সংঘাত তারা চাইছেন না। সংবিধানসম্মতভাবে হোক আর যেভাবেই— সরকার একটা একতরফা নির্বাচন করতে গেলে বিরোধী দল শুধু বর্জন করবে না, সেটি মোকাবিলাও করবে। তখন কেবল শহর-বন্দরে নয়, গ্রাম-গঞ্জেও ছড়িয়ে পড়বে সংঘাত। এর উত্তাপ থেকে অন্তত কেউ দূরে থাকতে পারবে না। সরকার সংঘাতে জড়িয়ে পড়লে বা সাধারণভাবে রাজনীতি নিয়ে ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠলে প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণও শিথিল হয়ে পড়ে। এর একটা প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ে আইন-শৃঙ্খলায়। মিডিয়ায় প্রতিদিনই সাধারণ আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির বড় রকম অবনতি নির্দেশ করে, এমন কিছু খবর আসছে; আর তা নতুনভাবে উদ্বিগ্ন করে তুলছে মানুষকে। রাজধানীসহ শহরাঞ্চলে যানজট পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে আরও। মেয়াদের শেষ সময়ে ট্রাফিক ব্যবস্থায়ও প্রশাসনের দৃষ্টি নেই যেন। এর মধ্যে একটাই ভালো খবর, প্রধান বিরোধী দল আপাতত রাজপথে কোনো কর্মসূচি রাখছে না। তবে তার সহযাত্রী জামায়াতে ইসলামীর ওপর ভরসা নেই। মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় নতুন কোনো রায় হবে শুনলে বা উচ্চ আদালতে কিছু একটা হতে যাচ্ছে জানলেই তারা হরতাল ডেকে বসবেন। এ ধরনের হরতাল ডেকে ডেকে দলগতভাবে তারা কী অর্জন করেছেন কে জানে, তবে ব্যাপক মানুষের বিরক্তি উত্পাদন করেছেন। বিএনপিও দলটির ওপর কিঞ্চিত বিরক্ত মনে হয়। তবে সে কারণে আগামী নির্বাচনে তাদের সম্পর্ক পাল্টাবে না। বিএনপিকে আঁকড়ে ধরে থাকবে জামায়াত; বিএনপিও তার সমর্থকদের ভোট বুঝে নিতে ভুলবে না। দলটির নতুন সঙ্গী হয়েছে হেফাজতে ইসলাম। তাদের এখন আর ‘অরাজনৈতিক শক্তি’ বলে অবহেলা করা যাবে না। সাম্প্রতিক স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোয় তারা বিরোধী দল সমর্থিত প্রার্থীদের জেতানোর ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রেখেছেন। পশ্চিমারাও দেখছি আগ্রহী হয়ে উঠেছেন তাদের বিষয়ে। হেফাজত নেতাদের অনেকের সঙ্গেই সরকার পক্ষের সুসম্পর্ক ছিল। সাম্প্রতিককালে কীভাবে এর অবনতি হয়েছে, তা সবার কাছেই স্পষ্ট। এর মধ্যে নির্বাচন নিয়ে প্রধান বিরোধী দলের সঙ্গে একটা সম্মানজনক সমঝোতা হয়ে গেলে কিন্তু তা সরকারের জন্য ‘প্লাস পয়েন্ট’ হতো। কিন্তু সরকার তার জায়গা থেকে নড়তে চাইছে না। এর পাশাপাশি ড. ইউনূসের মতো কোনো কোনো বিষয়ে লাগাতারভাবে খোঁচাখুঁচি করে নিজেকে আরও অজনপ্রিয় করছে। এতে প্রভাবশালী পশ্চিমা বিশ্বেও তার ভাবমূর্তির অবনতি হচ্ছে মনে হয়। রাজনৈতিক সংকট নিরসনে সরকার অন্তত তাদের কাছ থেকে বাড়তি কোনো সুবিধা পাবে না। ধর্মীয় মৌলবাদীরা সঙ্গে থাকলেও বিএনপি বরং কিছু সুবিধা পেতে পারে এ ক্ষেত্রে। ‘ইতিবাচক’ সংলাপ আয়োজনে খুব সম্প্রতি বিদেশিদের বেড়ে ওঠা তত্পরতায় সরকারের কিছুটা বেকায়দা অবস্থা (এবং সে কারণে বিরক্তি) কিন্তু এরই মধ্যে দৃশ্যমান। বিভিন্ন জনমত জরিপে নাকি দেখা যাচ্ছে, বিরোধী দল তথা বিএনপির অবস্থা ভালো। জরিপ অবশ্য ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগও করছে বলে বোঝা যাচ্ছে সজীব ওয়াজেদ জয়ের বক্তব্যে। সে অনুযায়ী, ক্ষমতাসীনদের জনসমর্থন বেড়ে উঠছে! রাজনীতির উভয় পক্ষ বিজয়ের ব্যাপারে আশাবাদী থাকলে অবশ্য ভালো। সে ক্ষেত্রে তাদের কেউ নির্বাচন বর্জনে উত্সাহ দেখাবে না। বিএনপি নেত্রী ও তার অনুসারীদের কার্যক্রম আর বক্তব্যে বোঝা যাচ্ছে, তারাও নির্বাচনের প্রস্তুতি নিয়ে রাখছেন। দাবি আদায়ে ‘চূড়ান্ত আন্দোলনের’ প্রস্তুতিও তাদের থাকবে। প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগের কাছেই তারা শিখেছেন, মাঠের বিজয় নিয়ে যেতে হয় নির্বাচনে। তাহলে নির্বাচন পরিচালনাকারী প্রশাসন ও জনগণের মধ্যে একটা হাওয়া থাকে যে, নতুন শক্তি রাষ্ট্রক্ষমতায় আসছে। সরকার বিরোধী আন্দোলনে হরতালের পর হরতাল আর জ্বালাও-পোড়াও করেও তাই এখানে নির্বাচনে বিপুলভাবে জিততে পারে বিরোধী দল। সে ধরনের আন্দোলন অবশ্য গড়ে তুলতে পারেনি বিএনপি। মাঝে অদৃষ্টপূর্ব কিছু জ্বালাও-পোড়াও ঘটেছে জামায়াতে ইসলামী ও হেফাজতে ইসলামের কর্মসূচি চলাকালে। রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশে সেগুলোয় বিএনপির কিছু অংশগ্রহণ ছিল বৈকি। এতে জনমত কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে যাবে না। এসব চলাকালে রাজনৈতিক দূরদৃষ্টির পরিচয় দিয়ে সরকার যদি নির্বাচন ঘিরে সৃষ্ট বিতর্ক নিরসনে এগিয়ে যেত, তাহলে হয়তো কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থায় থাকতেন তারা। যেসব ঘটনায় সুশাসনের ঘাটতির বিষয়ে মানুষের দৃষ্টি ব্যাপকভাবে আকৃষ্ট হয়েছে, সেগুলোর নিষ্পত্তিতেও এ সময়ে উত্সাহী দেখা যায়নি সরকারকে। তারা ব্যাপক উন্নয়ন কাজ করেছেন সন্দেহ নেই; বিভিন্ন খাতে অগ্রগতি আনতে সরকারের প্রয়াসও লক্ষণীয়। কিন্তু জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে আমাদের মতো দেশে সরকারের ভাবমূর্তি রক্ষার চেষ্টা যে জরুরি, দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেদিকে দৃষ্টি নেই এর নীতি-নির্ধারকদের। তারা এখন ‘অপপ্রচার মোকাবিলা’ নিয়েও ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। সরকারের বিশ্বাসযোগ্যতার সংকট বাড়াতেই যে এটি কার্যকর হয়ে উঠেছে, সেদিকে আবার দৃষ্টি দিচ্ছেন না। নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে অনড় অবস্থানের কারণেও তাদের বিশ্বাসযোগ্যতার সংকট বেড়েছে। লক্ষণীয়, এ ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ আদালতের রায় পক্ষে থাকলেও তারা মানুষকে বোঝাতে সক্ষম হননি যে, বর্তমান সরকার তথা এর প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন হতে পারে। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত বা বৃটেনে কীভাবে জাতীয় নির্বাচন হয়ে থাকে, বাংলাদেশের সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রেক্ষাপটে সেটি কম শোনানোই ভালো। লোকে এখন এটাও লক্ষ্য করছে, নির্বাচন ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে নির্বাচন কমিশনও (ইসি) শুরু করে দিয়েছে কিছুটা অদ্ভুত আচরণ। ইসি, পিএসসি ও দুদকের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো মাঝে অনির্বাচিত সরকারের সময় বরং কিছুটা স্বাতন্ত্র্য নিয়ে কাজ করছিল। বিপুলভাবে নির্বাচিত সরকার অতঃপর তাদের স্বাতন্ত্র্য কেড়ে নিয়েছে কিনা, এদিকেও লক্ষ্য রাখছে মানুষ। আর্থিক খাত নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থাগুলোর দৈন্য বা সরকার মুখাপেক্ষিতাও বেড়েছে। তাতে এ খাতে অনিয়ম-দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ বা সে রকম ঘটনা ঘটে গেলে তার নিরপেক্ষ তদন্তও সম্ভব হচ্ছে না। গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের সঙ্গে এগুলোর সম্পর্ক কী, সে প্রশ্ন উঠতে পারে। সম্পর্কটা ওখানে যে, সুশাসন ও ভাবমূর্তি উজ্জ্বলকরণের মাধ্যমে একটি নির্বাচিত সরকারকে ক্রমে সবার আস্থাভাজন হয়ে উঠতে হয়। তাহলেই সেটি হয়ে ওঠে গণতান্ত্রিক সরকার। নব্বইয়ে গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তনের পর এমন একটি সরকারও কি আমরা পেয়েছি, যারা দলবাজির ঊর্ধ্বে উঠে গোটা দেশ ও তার স্বার্থ দেখতে পেয়েছে আর সেটির বাস্তবায়নে কাজ করেছে? এমনটি ঘটলে ক্ষমতাসীন দলের কর্তৃত্ব কমিয়ে জনঅংশগ্রহণ বাড়ানোয় মনোযোগ দিত সরকার; বিরোধী দলের অংশগ্রহণও তাতে স্পষ্ট হতো। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলায় দৃষ্টি দিতেন ক্ষমতাসীনরা আর সে ধারায় ইসি শক্তিশালীকরণের মাধ্যমে বৃটেন বা ভারতের মতোই জাতীয় নির্বাচন আয়োজনের প্রক্রিয়া এগিয়ে যেত। সেদিকে মনোযোগ না দিয়ে কিছু স্থানীয় সরকার আর উপ-নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পাদন করেই দাবি করা যায় না যে, আমাদের (অর্থাত্ আমার) অধীনেই নিরপেক্ষ জাতীয় নির্বাচন হবে। নব্বই-পরবর্তীকালে চর্চিত গণতন্ত্রে সমস্ত ক্ষমতা আমরা কেন্দ্রীভূত করেছি প্রধানমন্ত্রীর হাতে। এটাও হয়েছে সর্বনাশা। এ কারণেই অন্তর্বর্তীকালীন মন্ত্রিসভার সব সদস্য বিরোধী দলের হয়েও শুধু এর নেতৃত্বে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী থাকলে তা মানবে না বিএনপি। অতীতে একই ধরনের সংকট চলাকালে আওয়ামী লীগও এটা মানেনি। অর্থাত্ একই যুক্তিতে উভয়ে একই আচরণ করছে ভিন্ন সময়ে। কিন্তু গণতন্ত্রকে সফল করে তুলে সামগ্রিক অবস্থায় পরিবর্তন আনতে কেউ উদ্যোগী হচ্ছেন না। দেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে পরিবর্তন, কোনো কোনো খাতে যুগান্তকারী পরিবর্তন এলেও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন ব্যবস্থাপনায় আমরা যেন আরও পিছিয়েছি। রাষ্ট্রক্ষমতায় আসা-যাওয়া করা দুটি দলের পারস্পরিক অবিশ্বাস দৃশ্যতই বেড়েছে আরও। সে কারণেও তত্ত্বাবধায়ক না হলেও নির্দলীয় ধরনের একটি নির্বাচনকালীন সরকার ও তার অধীনে প্রশাসনের পুনর্বিন্যাস যেন এখন আরও জরুরি। দেশের কত শতাংশ মানুষ নির্দলীয় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার চায়, এ প্রশ্ন করে লাভ নেই। শুধু বিএনপি ও তার সঙ্গী-সাথীদের বাঁধা ভোটাররাও যদি বর্তমান সরকারের ওপর আস্থা না রাখেন, শুধু এ কারণেই ওই ধরনের নির্বাচনকালীন সরকার প্রতিষ্ঠা করা দরকার। নইলে তো বিরোধী দলগুলো নির্বাচনে অংশ নেবে না; নির্বাচন প্রতিহতও করবে। তাতে সংঘাত তো হবেই; নির্বাচন অনুষ্ঠানের আগেও বড় ধরনের সংঘাত হবে বলে মনে করা হচ্ছে। রাজপথে ভয়াবহ যানজট মোকাবিলা করে আমরা কিছুটা এগোতে পারলেও ওখানে নতুন করে সৃষ্টি হওয়া সংঘাত খুব কাহিল করে ফেলবে আমাদের। অর্থনীতি এর চাপ সহজে নিতে পারবে না। রাজনীতিতেও এটা হবে না কোনো ভালো অভিজ্ঞতা। আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে ক্রমে এগিয়ে যেতে থাকা একটি দেশের ভাবমূর্তির জন্যও সেটি ভালো হবে না। রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগই বা একটি একতরফা (অর্থাত্ অর্থহীন) নির্বাচন আয়োজন করে কেন জাতীয় পার্টি ও বিএনপির সমপর্যায়ের হবে? তার চেয়ে একটি নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনে উল্লেখযোগ্য ভোট ও আসন পেয়ে শক্তিশালী বিরোধী দল হিসেবে থাকাটাও গৌরবের। যে ধরনের নির্বাচন বিরোধী দল কোনোমতেই মেনে নেবে না, তেমন একটি নির্বাচন আয়োজনের পক্ষে জেদ ধরে থাকা বা সেটি নিয়ে নতুন শর্ত দিয়ে দরকষাকষি মনে হয় না মানুষ ভালোভাবে নিচ্ছে। এরই মধ্যে খবর বেরিয়েছে, ক্ষমতাসীন মহাজোটের শরিক, এমনকি মূল দলের একাংশও মনে করছে না— সংসদ ভেঙে না দিয়ে জাতীয় নির্বাচন করাটা বিধেয় হবে। গণতন্ত্র বলতে আমরা এখনো কিন্তু নির্বাচনী গণতন্ত্রই বুঝছি। এটার জন্যও ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ যে জরুরি, তা বুঝতে হবে ক্ষমতাসীনদের। অন্যরা ব্যাপার নন— প্রধানমন্ত্রী এটা মেনে নিলেই প্রেক্ষাপট দ্রুত বদলে যাবে। লেখক : সাংবাদিক [email protected]