নেদারল্যান্ডসের ফাঁকা জেলখানা

আপডেট : ১৪ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ২২:১০
ইউরোপের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের ছোট দেশ নেদারল্যান্ডসের জেলখানাগুলি সরকারের শিরঃপীড়ার কারণ হইয়া দাঁড়াইয়াছে। তাহাদের বন্দীশালাসমূহের ধারণ ক্ষমতা ১৪ হাজার। কিন্তু এখানে বন্দী আছে ১২ হাজার। অর্থাত্ কারাগারগুলি ‘হাউস ফুল’ করিয়া রাখিতে সেই দেশের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী হিমশিম খাইতেছে। লোকে অন্যায়-অপরাধ করা মনে হয় ছাড়িয়াই দিয়াছে। ফলে, কয়েকখানা কারাগৃহ একদম ফাঁকা পড়িয়া আছে। এমতাবস্থায় চিন্তাশীল ওলন্দাজ নাগরিকগণ বলিতে শুরু করিয়াছেন যে, খালি কারাগারের পিছনে রাজকোষের অর্থ ব্যয় করিবার কোনোই মানে থাকিতে পারে না। ইহা অপচয় ছাড়া আর কিছুই নহে। এই পরিস্থিতিতে সরকার ৮টি জেলখানা বন্ধ করিয়া দেওয়ার সাধু সংকল্প গ্রহণ করিয়াছেন বলিয়া সংবাদ পাওয়া গিয়াছে। সম্প্রতি এই ব্যতিক্রমী খবরটি ছাপা হইয়াছে পত্রিকান্তরে। নেদারল্যান্ডসে এহেন বন্দীর দুর্ঘট কেমন করিয়া ঘটিল, সে এক গভীর চিন্তার বিষয়ই বটে। এমন তো নহে যে, দেশটিতে জনসংখ্যা নিতান্তই কম। সত্য বটে, বাংলাদেশ, ভারত ও চীনসহ এশিয়ার আরও অনেক দেশের তুলনায় নেদারল্যান্ডসে জনসংখ্যার ঘনত্ব যথেষ্ট কম। কিন্তু দক্ষিণ এশিয়ার হিমালয় কন্যা নেপাল কিংবা প্রশান্ত মহাসাগরীয় দেশ নিউজিল্যান্ডের তুলনায় নেহায়েত কম নয়। নেপালের জনসংখ্যার ঘনত্ব প্রতি বর্গমাইলে চারশ’ কিংবা তার চাইতে কিছু বেশি। নিউজিল্যান্ডে প্রতি বর্গমাইলে লোকসংখ্যা চল্লিশের কাছাকাছি। পক্ষান্তরে নেদারল্যান্ডে জনসংখ্যার ঘনত্ব হাজার ছুঁই ছুঁই। নেদারল্যান্ড নামের দেশটির অতীত যে একেবারে পূত-পবিত্র, পুণ্যস্নাত তাহাও নহে। দেশটির শিল্পকলার সুনাম রহিয়াছে। বিশ্বখ্যাত ইম্প্রেশনিস্ট চিত্রশিল্পী ভ্যানগগ নেদারল্যান্ডসে না জন্মাইলেও তাহার পিতা একজন ওলন্দাজ। প্রথম মহাযুদ্ধের সময়ে নিরপেক্ষ অবস্থান গ্রহণ করিলেও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে দেশটি জার্মানির পদানত হইয়াছিল। ঔপনিবেশিক শক্তি হিসাবেও একদা এই নেদারল্যান্ডসের নাম ছিল। ওলন্দাজ জলদস্যুদের কথাও আমরা ইতিহাসে পড়িয়াছি। বাংলাসহ ভারতবর্ষের সহিত তাহাদের ব্যবসাবাণিজ্যের কথাও জানা যায়। প্রসঙ্গত বলা আবশ্যক যে, নেদারল্যান্ডসের নাগরিকদেরই ওলন্দাজ বলা হইয়া থাকে। নেদারল্যান্ডের আরেক নাম হল্যান্ড। এর মানে ফাঁপা ভূমি। সেই ফাঁপা ভূমির মানুষ এখন এতোই ভাল হইয়া গিয়াছে যে, ধরিয়া জেলে পুরিবার লোক পাওয়া যাইতেছে না। ফাঁকা বন্দীশালার দিকে চাহিয়া স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক হয়তো ফাঁপরে পড়িয়া গিয়াছেন। জনান্তিকে একখানা সদুপদেশ দেওয়া বোধকরি অসমীচীন হইবে না। জেলখানা কিভাবে বন্দী আকীর্ণ করা যায় সেই বিষয়ে ওলন্দাজগণ ইচ্ছা করিলে বিশ্বের যেইসব দেশের কারাগারসমূহে বন্দী উপচাইয়া পড়িবার উপক্রম, সেইরকম কোনো দেশ হইতে কনসালটেন্সি গ্রহণ করিতে পারেন। এইরূপ কনসালটেন্সি গ্রহণ করা হইলে নিশ্চিত ঝাঁকে ঝাঁকে বন্দী ধরা পড়িবে। বন্দীশালাগুলি অচিরাত্ উপচাইয়া পড়িবে। শীঘ্রই আরও অনেকগুলি নূতন ও আধুনিক এবং ওয়েল প্রটেকটেড বন্দীশালা যে সেখানে নির্মাণ করিতে হইবে, তাহাও প্রায় নিশ্চয় করিয়া বলা যায়। প্রসঙ্গত এইখানে জানাইয়া রাখা ভাল যে, আমাদের এই বাংলাদেশে ছোট-বড় মিলাইয়া বন্দীশালা রহিয়াছে ৮০ খানা। ৮টি আছে কেন্দ্রীয় কারাগার। এইখানে জেলখানাসমূহের ধারণ ক্ষমতা ২৯ কী ৩০ হাজার। কিন্তু বন্দী আছেন প্রায় ৭০ হাজার। এইখানে বন্দীশালার বাসিন্দার অভাব হয় না কখনই। ছোট অপরাধী এইখানে কারাগারে গিয়া প্রায়শ বমাল হইয়া বাহির হয়, যদিও কারাগারকে সংশোধনাগার হিসাবে বিবেচনা করিবার ফিলোসফি আমাদের অজানা নহে। কোনো বিষয়ে জানা থাকা এবং মানিয়া চলা যে এক কথা নহে, তাহা বলিবার অপেক্ষা রাখে না। নেদারল্যান্ডসের রাষ্ট্র ও সরকার কারাগারের অন্তর্নিহিত দর্শন হয়তো জানেন এবং মানেনও। সেই জন্যই তাহাদের কারাগারগুলি ক্রমান্বয়ে বন্দীবিরল হইয়া যাইতেছে।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন