বাঙালিদের যে হুজুগে জাত বলা হয় এটা অত্যুক্তি নয়। কোনো একটা হুজুগ পেলে ধনী-নির্ধন, শিক্ষিত-অশিক্ষিত নির্বিশেষে সকলে তা নিয়ে মেতে উঠে। এখন হুজুগ শুরু হয়েছে সংলাপ নিয়ে। দুই নেত্রীর মধ্যে সংলাপ। যেন দুই নেত্রী বা দুই দল সংলাপে বসলেই দেশের সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। সংঘাত-সংঘর্ষের রাজনীতিতে দেশের যে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা রানা প্লাজার মতো ধসে পড়ার উপক্রম করেছে, সেটি আবার খাড়া হয়ে যাবে।......... ইত্যাদি ইত্যাদি।
এই সংলাপ নিয়ে এখন অধিকাংশ বুদ্ধিজীবী, কলমজীবী লেখালেখি, টকশো’তে ব্যস্ত। ড. কামাল হোসেন দীর্ঘ সাক্ষাত্কার দিচ্ছেন। সিডিপি’র মতো সুবিধাভোগী এলিট ক্লাব, সুজন, দুর্জনের মতো বিতর্কিত সংস্থাগুলোও সেমিনার, আলোচনা সভা ডেকে সংলাপ নিয়ে ভালো ভালো কথা বলছেন। শেষ পর্যন্ত খাল কেটে কুমীর ডাকার মতো মার্কিন বিদেশমন্ত্রী জন কেরির কাছে ধর্ণা দেয়া হয়েছে দু’নেত্রীর কাছে চিঠি লিখে সংলাপে বসার তাগিদ দেয়ার জন্য। বানরকে পিঠা ভাগের জন্য ডেকে আনলে পরিণতি কি দাঁড়ায় সে শিক্ষাটি ইতিহাসের কাছ থেকে আমাদের এলিট ক্লাস সঠিকভাবে গ্রহণ করেননি।
দুই নেত্রী সংলাপে বসলেই কি দেশের বর্তমান অচলাবস্থার অবসান হবে? সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠান একেবারে নিশ্চিত হয়ে যাবে? অতীতে ব্রিটিশ ভারতে কতোবার কংগ্রেস-লীগ বিরোধ মীমাংসার জন্য গান্ধী-জিন্না বৈঠক হয়েছে। সমস্যার কোনো সমাধান হয়েছিল কী? শেষ পর্যন্ত লন্ডন থেকে ক্রিপস মিশনকে ভারতে আসতে হয়েছে। শুধু গান্ধী-জিন্নাকে নিয়ে নয়, তত্কালীন ভারতের আরো অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে শিমলা বৈঠকে বসতে হয়েছে।
ব্রিটিশ শাসনামলেও রাজনৈতিক অচলাবস্থা দূর করার জন্য ব্রিটিশ সরকার কেবল গান্ধী ও জিন্না এই দুই নেতাকে নিয়ে বৈঠকে বসেননি; বার বার লন্ডনে সকল দলমতের নেতাদের নিয়ে গোলটেবিল বৈঠক করেছেন। তাতে সকল সমস্যা দূর হয়নি। কিন্তু সমস্যা সমাধানের শান্তিপূর্ণ পথের সন্ধান পাওয়া গেছে। বর্তমানে আমার মতো যারা প্রবীণ বয়সী, তাদের হয়তো ব্রিটিশ আমলে রাউলাট বিল পাস বা গান্ধী আরউইন (ব্রিটিশ বড় লাট) চুক্তির কাছাকাছি সময়ে গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা স্মরণ আছে।
পাকিস্তান আমলেও কেবল মুজিব-আইয়ুব বৈঠক বা মুজিব-ভূট্টো সংলাপ দ্বারা কোনো সমস্যা সমাধানের চেষ্টা হয়নি। প্রেসিডেন্ট আইয়ুব রাওয়ালপিন্ডিতে গুরুত্বপূর্ণ সকল রাজনৈতিক দল ও নেতাদের গোলটেবিল বৈঠক ডেকেছিলেন। তাতে সমস্যাটির তাত্ক্ষণিক সমাধান হয়নি। কিন্তু পাকিস্তানে তখনই কোনো অশান্তিও দেখা দেয়নি। বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে দুই নেত্রীর বা দুই দলের সংলাপ নয়, দেশের সকল গণতান্ত্রিক দল ও নেতা এবং পেশাজীবী মানুষের প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি গোলটেবিল বৈঠক ডাকা উচিত।
এই বৈঠক ডাকার উদ্যোগ সরকারেরই নেওয়া উচিত। নইলে এই ধরনের বৈঠক ডাকার জন্য সরকারের উপর চাপ সৃষ্টির জন্য সুশীল সমাজের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের এবং মিডিয়ার তত্পরতা প্রয়োজন। কেবল সংলাপ চাই, সংলাপ চাই বলে হুজুগ তুলে তারা বরের ঘরের পিসি এবং কনের ঘরের মাসির ভূমিকা গ্রহণ করতে পারবেন, তার বেশি কিছু নয়। ব্রিটিশ ভারতে কতোবার গান্ধী-জিন্না বৈঠক ব্যর্থ হয়েছে এবং কতোবার তখনকার বুড়ো আগা খান, রাজা গোপালাচারিয়ার মতো নির্দলীয় নেতাকে দুই দলের মধ্যে মধ্যস্থতার ভূমিকায় নামতে হয়েছে তার ইতিহাস কি আমরা ভুলে গেছি? গোলটেবিল বৈঠকও সমস্যার তাত্ক্ষণিক সমাধান দেয়নি, কিন্তু বহু মাথার সম্মিলনে সমস্যা সমাধানের পথের সন্ধান পাওয়া গেছে।
এখন প্রশ্ন, বাংলাদেশের এলিট ক্লাসের মধ্যে এখন ব্রিটিশ ভারতের আগা খান, রাজা গোপালাচারিরা, জয় প্রকাশ নারায়ণ, ড. গঙ্গাধর অধিকারী প্রমুখের মতো কি কোনো নির্দলীয় ও সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিত্ব নেই, যারা দুই দলের মধ্যে মধ্যস্থতার ভূমিকা গ্রহণ করতে পারেন কিংবা একটি সর্বদলীয় গোলটেবিল বৈঠক ডাকার জন্য সরকারকে উদ্যোগ গ্রহণে সম্মত করাতে পারেন? এই কাজটি পারতেন ড. কামাল হোসেন, ড. ইউনূস বা তাদের মতো ব্যক্তিত্বের অধিকারী ব্যক্তিরা; যেমন একসময় প্রবীণ সাংবাদিক ফয়েজ আহমদ এরশাদ হটাও আন্দোলনে দুই নেত্রীকে এক জায়গায় বসানোর চেষ্টা করে অনেকটা সফল হয়েছিলেন।
বর্তমানে মুশকিল হয়েছে, ড. কামাল হোসেন, ড. ইউনূসের মতো ব্যক্তিরা কোথায় নির্দলীয় রাজনৈতিক অবস্থানে থেকে জাতীয় অভিভাবকের ভূমিকা গ্রহণ করে জাতীয় সঙ্কটে অভিভাবকের দায়িত্ব পালনে এগিয়ে আসবেন, তা নয় তারা কেউ ব্যক্তিগত অহমিকা, ব্যবসায়িক স্বার্থ বা রাজনৈতিক সংকীর্ণ স্বার্থের জালে জড়িয়ে পড়ে নিজেরাই শুধু বিতর্কিত হয়নি, রাজনীতিতে হাসিনা-বিদ্বেষী ও বিএনপি-জামায়াতের পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষ সমর্থক বলে পরিচিত হয়েছেন। ড. কামাল হোসেন, ড. ইউনূস বা তাদের বন্ধু-বান্ধব নিয়ে গঠিত একাধিক এলিট ক্লাব এখন বিতর্কিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি প্রবর্তনের প্রশ্নে নিজেরাই বিএনপি’র দাবির সমর্থনে মাঠে নেমে গেছেন। তারা এই রাজনৈতিক সমস্যায় বিতর্কযুক্ত জাতীয় অভিভাবকের ভূমিকা গ্রহণ করবেন কিভাবে? কে তাদের মানবে?
এখন বাজারে গুজব, এই এলিট ক্লাবের ব্যর্থ বুদ্ধিজীবী নেতারাই মার্কিন বিদেশমন্ত্রী জন কেরির কাছে ধর্ণা দিয়ে তাকে দিয়ে বাংলাদেশের দুই নেত্রীর কাছে সংলাপে বসার তাগিদ দেয়ার চিঠি লিখিয়েছেন। বেচারা জন কেরি এখন সিরিয়ায় মার্কিন-নীতি ফাটা বাঁশে আটকে যাওয়ায় তা থেকে উদ্ধার লাভের চেষ্টায় হিমসিম খাচ্ছেন। তার সময় কোথায় বাংলাদেশে রাজনৈতিক সংলাপ নিয়ে মাথা ঘামানোর? কিন্তু বাংলাদেশের কিছু নাছোড়বান্দা ‘অনুগত বন্ধুর’ চাপ না কি ওবামা-প্রশাসনও সামাল দিতে পারছেন না। এটা অনুমান নয়, মার্কিন সংবাদ সূত্রেরই খবর।
দেশের যে মহলগুলো এখন সংলাপ সংলাপ করছেন, তাদের বেশিরভাগেরই উদ্দেশ্য, সমস্যা সমাধানের জন্য নেত্রীকে সংলাপে বসানো নয়, উদ্দেশ্য সংলাপে বসানোর নামে বিএনপি’র তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি যাতে সরকার মানতে রাজি হয় তার পরিবেশ সৃষ্টি করা এবং নির্বাচন হলে তাতে হাসিনা সরকারের পরাজয়ের সম্ভাবনা নিশ্চিত করা। নইলে ড. কামাল হোসেনের মতো বিজ্ঞ আইনজীবী এবং রাজনীতিক কী করে তার সাম্প্রতিক সাক্ষাত্কারে বলেন, ‘দেশের জনগণের ভাগ্যোন্নয়নের জন্য সরকার অনেক কাজ করেছেন এই দাবি যদি সত্য হয়, তাহলে একটি নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনে যেতে সরকারের ভয় কোথায়?’
ড. কামাল হোসেন অত্যন্ত সুচতুরভাবে কেন তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি বাতিল করতে হাসিনা সরকার বাধ্য হলো সেই প্রশ্নটি বার বার এড়িয়ে যান। নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারও যে শেষ পর্যন্ত নির্দলীয় থাকে না, বরং এই এলিট ক্লাবের চাতুর্যে ও সাহায্যে শেষ পর্যন্ত বিএনপি’র খপ্পরেই চলে যায় এবং ড. কামাল হোসেন ও তার এলিট বন্ধুরা সেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কনসাস-কীপার সেজে কিভাবে সেই সরকারকে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে দাঁড় করান, সে উদাহরণ তো সাহাবুদ্দীন-লতিফুর এবং ইয়াজউদ্দিনের তত্ত্বাবধায়ক সরকার এই দুই আমলেই আওয়ামী লীগ প্রত্যক্ষ করেছে এবং দারুণ নির্যাতন সহ্য করেছে। সুতরাং ন্যাড়া বেলতলায় ক’বার যাবে?
আসলে এখন যেটা দরকার, সেটা হলো আগামী সাধারণ নির্বাচন যে পদ্ধতিতেই হোক, তা যেন অবাধ ও নিরপেক্ষ হয় তা নিশ্চিত করা। এই ব্যাপারে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে অবশ্যই বৈঠক হতে পারে, সর্বদলীয় গোলটেবিল বৈঠকও হতে পারে। কিন্তু বিএনপি বা তার সমর্থক এলিট ক্লাবগুলো সে বৈঠকের কথা বলছে না। তাদের দাবি তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা মানতে হবে।
এই ব্যাপারে বিএনপি’র জেদ ধরার কারণটি বোঝা যায়। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাটিকে ‘পলিউট’ করে দেশি-বিদেশি মদদে নিজেদের উদ্দেশ্য সিদ্ধিতে ব্যবহার করার মজা তারা দু’দুবার উপভোগ করেছে। আগামী নির্বাচনেও তারা সেই মজা উপভোগ করতে চান। নইলে তারা নির্বাচন অনুষ্ঠানের একটি পদ্ধতির প্রশ্নে জেদ ধরতেন না। জেদ ধরতেন নির্বাচনকে আরো অবাধ ও সুষ্ঠু করার লক্ষ্যে সরকারের সঙ্গে বৈঠক করা এবং নির্বাচন কমিশনকে আরো স্বাধীন ও শক্তিশালী করার জন্য।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন হলেই যদি তা অবাধ ও সুষ্ঠু হওয়া নিশ্চিত হয়, তাহলে বিচারপতি হাবিবুর রহমান শেলীর নেতৃত্বে গঠিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের (১৯৯৬) অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের পর বেগম জিয়া কেন ‘তাদের জয় ছিনতাই করা হয়েছে’ ধুয়া তুলে প্রথমে সেই নির্বাচনের ফল মানতে চাননি? বর্তমানে তো বর্তমান সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত পাঁচটি সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হয়েছে বলে বিএনপি মেনে নিয়েছে। সেকি তারা জয়ী হয়েছে বলে? জয়ী হলে নির্বাচন সুষ্ঠু হয়, জয়ী না হলে নির্বাচন সুষ্ঠু হয় না। এ থিওরিতো সভ্য জগতে অচল।
বাইরের চাপে শেখ হাসিনা ও বেগম জিয়া সংলাপে বসতে পারেন, কিন্তু সেই সংলাপ সফল হবে তার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। এভাবে একবার সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টারকে ঢাকায় ডেকে এনে চাপ সৃষ্টি করে দুই নেত্রীকে সংলাপের নামে তার পাশে বসানো হয়েছিল। তা সফল হয়নি। একইভাবে কমনওয়েলথ-সেক্রেটারির দূতিয়ানিও ব্যর্থ হয়েছিল। এবারেও বিদেশি হস্তক্ষেপ বা মধ্যস্থতায় নয়, সংলাপ হতে পারে নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু করা নিশ্চিতকরণের বিধান নিয়ে। এক পক্ষের দাবিমতো তাদের নির্বাচন পদ্ধতি মেনে নেয়ায় সম্মতি জানিয়ে নয়।
বিএনপি এর আগেও বলেছে, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি মেনে নেয়া হলে তারা সংলাপে বসতে রাজি। দাবিই যদি মেনে নেয়া হয় তাহলে সংলাপে বসার দরকারটা কি? এখন আবার তারা সুর ঘুরিয়েছেন। গত শুক্রবার (১৩ সেপ্টেম্বর) ব্রিটিশ পার্লামেন্টের একদল সদস্যের সঙ্গে আলাপ প্রসঙ্গে বেগম খালেদা জিয়া বলেছেন, তিনি যেকোনো স্থানে যেকোনো মুহূর্তে সংলাপে বসতে রাজি। কিন্তু তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রশ্নে অনড় থেকে তিনি সমস্যা সমাধানের কোন্ সূত্র ধরে সংলাপে বসবেন? তিনি শর্তহীনভাবে খোলা মনে কেবল নির্বাচন আরো সুষ্ঠু ও অবাধ করার প্রশ্নে সরকারের সঙ্গে সংসদে এবং সংসদের বাইরে আলোচনায় বসতে রাজি আছেন কি? নাকি সালিশি মানি, তাল গাছটা আমার।
দুই নেত্রীকে সংলাপে বসানো যাবে এবং তাতে বর্তমান অচলাবস্থা দূর হবে সমস্যার এমন সরলীকরণে আমার বিশ্বাস স্থাপনে ভয় হয়। বিএনপি একদিকে সংলাপে বসার কথা বলছে, অন্যদিকে দেশে সংঘাত সৃষ্টির হুমকি দিচ্ছে। হুমকি দিয়ে সংলাপে বসা যায় না এবং তা সফল করাও যায় না। বেগম জিয়া একদিকে ব্রিটিশ এমপিদের কাছে বলছেন, তিনি সংলাপে বসতে প্রস্তুত, অন্যদিকে তার এক লেফটেন্যান্ট ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ হুঙ্কার দিয়ে বলছেন, তাদের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি মানা না হলে অক্টোবর মাসের শেষদিক থেকে আবার আন্দোলন। বিএনপি’র (সঙ্গে জামায়াত) আন্দোলন। যার অর্থ যানবাহনে অগ্নিসংযোগ, দোকানপাট ভাংচুর, জনজীবনে সন্ত্রাস ও আতঙ্ক সৃষ্টি।
দেশের বর্তমান অবস্থার এই বাস্তবতা উপলব্ধি করে দেশের সচেতন বুদ্ধিজীবী, রাজনীতিক এবং সকল পেশায় নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের উচিত, সঙ্কট মুক্তির জন্য কেবল দুই নেত্রীর শুভবুদ্ধির উপর নির্ভর না করে এবং শুধু সংলাপ সংলাপ বলে হুজুগ না তুলে নিজেরাই উদ্যোগী হয়ে একটি গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করা এবং তাতে সরকার ও প্রধান বিরোধী দলকেও যোগদানে রাজি করানো। সরকারকে যদি এই গোলটেবিল বৈঠকের উদ্যোগ গ্রহণে রাজি করানো যায়, তাহলে বিরোধী দলকে তাতে যোগ দেয়ার দায়িত্ব গ্রহণ করতে হবে এলিট ক্লাবের বর্তমান প্রভাবশালী নেতাদেরই। এই বৈঠক অনুষ্ঠানের ব্যাপারে ড. কামাল হোসেন, ড. ইউনূস, রেহমান সোবহান, ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য, ব্যারিস্টার আমিরুল ইসলাম, ব্যারিস্টার রোকনউদ্দীন মাহমুদ, ব্যারিস্টার রফিকুল হক প্রমুখ, মিডিয়ার পক্ষ থেকে তোয়াব খান, আনোয়ার হোসেন মঞ্জু, মাহবুবুল আলম, মাহফুজ আনাম, মতিউর রহমান, গোলাম সারওয়ারসহ আরও অনেকে এবং পেশাজীবী সংস্থাগুলোর নেতারাও সম্মিলিতভাবে উদ্যোগ নিতে পারেন।
এই ব্যাপারে সমঝোতার সূত্র হবে, নির্বাচন অনুষ্ঠানের পদ্ধতি নয়, নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু করা এবং নির্বাচন কমিশনকে আরও স্বাধীন ও শক্তিশালী করার নিশ্চিত পন্থা উদ্ভাবন। এক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ সরকারকে বর্তমান সংসদ বহাল রেখে নির্বাচন অনুষ্ঠানের গোঁ ত্যাগ করতে হবে এবং বিএনপি’কেও কেবল তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনেই নির্বাচন করতে হবে এই জেদ থেকে সরে এসে সমঝোতার ভিত্তিতে গঠিত একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে নির্বাচন মেনে নিতে সম্মতি জানাতে হবে।
এই ব্যাপারে গোলটেবিল বৈঠকে একটি নয় একাধিক প্রস্তাব উত্থাপিত হতে পারে এবং তা নিয়ে আলোচনাও হতে পারে। এক মাথার বুদ্ধিতে যে সমস্যার সমাধান দুরূহ মনে হয়, বহু মাথার বুদ্ধিতে তার সমাধান সহজ হয়ে দাঁড়ায়। দেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের কথা ভেবে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দু’দলেরই যেমন বিপজ্জনক গোঁ ত্যাগ করা উচিত, তেমনি দেশের বড় এলিট ক্লাবটির নেতাদেরও উচিত সংলাপের নামে হুজুগে না মেতে, রুদ্ধদ্বার ভোজসভায় বিদেশি কূটনীতিকদের সাথে গোপন শলাপরামর্শে না মেতে দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে একটি সর্বদলীয় এবং সর্ব পেশার মানুষের গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করা এবং খোলামেলা ও প্রকাশ্য বহুমুখী আলোচনার মাধ্যমে দেশে সমঝোতার রাজনীতি ফিরিয়ে আনার আশু উদ্যোগ গ্রহণ করা।
লন্ডন ১৪ সেপ্টেম্বর, শনিবার, ২০১৩
