সব আছে, শুধু সংকটের সময় সমাধান নেই

আপডেট : ১৪ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ২২:১২
রানা প্লাজার দুর্ঘটনার পর বাংলাদেশের পোশাক শিল্প এবং ঐ শিল্পে কর্মরত শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিয়ে ব্যাপকভাবে আলোচনা হয় সারাবিশ্বে। হাজার শ্রমিকের দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুতে সারাবিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টি হবে তা খুবই স্বাভাবিক ঘটনা। কিন্তু সেই স্বাভাবিক ঘটনার মধ্যে যে অংশটুকু ছিল অস্বাভাবিক তা হলো বাংলাদেশের পোশাক কারখানায় শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিয়ে বিদেশি ক্রেতাদের নানাবিধ শর্ত আরোপ করার মধ্যে। বিদেশি ক্রেতাদের অনধিকারযুক্ত অধিকারকে আরও ব্যাপক করেছিল যখন বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের মালিকপক্ষ, সরকার এবং সুধীজনেরা বিদেশি ক্রেতাদের কাছে বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের শ্রমিকের স্বার্থ রক্ষার জন্য বাড়তি অর্থ সাহায্য চেয়েছিল। এরই প্রেক্ষিতে যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানী ওয়ালমার্ট বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের উন্নয়নে ৫০ মিলিয়ন ডলার ঋণ প্রদানের অঙ্গীকার করেছে। বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের মালিক বাংলাদেশিরাই। এখানে কাজ করে বাংলাদেশের শ্রমিক অর্থাত্ মালিক নিয়ন্ত্রিত এবং বেতনভুক্ত শ্রমিকরা। পোশাক শিল্পের রপ্তানিকারকরাও ঐ মালিকপক্ষই। বিদেশি ক্রেতারা এক্ষেত্রে শুধু আমদানিকারক। আমার মাথায় কখনও এই বক্তব্য সহজভাবে ঢুকেনি যে, নিজেদের শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষা করার জন্য বিদেশি আমদানিকারকদের শরণাপন্ন হওয়ার যুক্তিটি কোথায়? সেখানে শ্রমিকদের কথা বলে বাড়তি অর্থ না চেয়ে রপ্তানিকৃত দ্রব্যের মূল্য বৃদ্ধি করে সেই বর্ধিত মূল্য দিয়ে নিজেদের শ্রমিকের সুবিধা বৃদ্ধি করার মধ্যে সমস্যাটি কোথায়? দাম বাড়ালে বিদেশি ক্রেতারা নেবে না? তাই যদি হয়, তবে বাড়তি অর্থ তারা কেন সাহায্য করবে? পোশাক শিল্পের অন্যান্য রপ্তানিকারক দেশ চীন, শ্রীলংকা, ভারত, কম্বোডিয়া, তাইওয়ান এসব দেশ কি তাদের শ্রমিকের জন্য বাড়তি সাহায্য চায় আমদানিকারকদের কাছে? শ্রমিক আপনার কিন্তু সাহায্য করবে তৃতীয় পক্ষ! তবে তো বাড়তি সুবিধা নিতেই চাইবে তৃতীয় পক্ষ; আপনার উপর খবরদারি তো করতেই চাইবে তৃতীয়পক্ষ। যাই হোক, আমার লেখার মূল বিষয়বস্তু পোশাক শিল্পের শ্রমিকের জন্য সাহায্য চাওয়া নয়। বাংলাদেশের মানুষ ঠিক কিছুদিন ধরে বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে বিদেশিদের নাক গলানোর বিষয়টি নিশ্চয়ই লক্ষ্য করছে। মার্কিন রাষ্ট্রদূত তো রীতিমত বাংলাদেশের খবরা-খবরের কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করছেন। যখন-তখন তিনি সভা-সমিতিতে যোগদান করছেন, বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে মতামত দিচ্ছেন। এমনকি দুই নেত্রীর যে সংলাপে বসা উচিত এমন জোরালো মন্তব্যও তার কাছ থেকে আসছে। কূটনৈতিক কর্মকর্তাদের দৌড়-ঝাঁপের বাইরে জাতিসংঘকেও বাংলাদেশের নির্বাচন এবং রাজনীতি নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করতে দেখা যাচ্ছে। ইতিমধ্যে জাতিসংঘের প্রধান মি. বান কি মুন আগামী নির্বাচন নিয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এবং মাননীয় বিরোধী নেত্রীর সঙ্গে টেলিফোনেও কথা বলেছেন। বাংলাদেশের রাজনীতি এবং নির্বাচন নিয়ে জাতিসংঘের মাথাব্যথার কারণ রয়েছে এসব কার্যকলাপের ফলে তা-ই প্রমাণিত হয়। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য এবং ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের বক্তব্য থেকে এটিও প্রমাণ হয় যে, এই দেশগুলোও বাংলাদেশের ভবিষ্যত্ নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা-ভাবনা করে। এতে বাংলাদেশের মানুষের হয়তো সুখানুভূতিই হতো, যদি বাংলাদেশের স্বাভাবিক রাজনৈতিক অবস্থায় এসব দেশ ও জাতিসংঘের বাংলাদেশ নিয়ে মাথাব্যথা থাকত। কিন্তু তারা ও আমরা সকলেই জানি, বাংলাদেশের দু’টি রাজনৈতিক দলের বৈরী সম্পর্কের কারণে এবং একটি অস্বাভাবিক রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে এসব দেশ ও বিশ্বসংস্থা বাংলাদেশের জন্য তাদের মতামত চাপিয়ে দিতে চায়। নিজেদের মধ্যে মীমাংসা করতে ব্যর্থ হচ্ছে সরকার এবং বিরোধী দল। তাই জাতিসংঘের প্রধান দুই নেত্রীর সঙ্গে কথা বলে অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে একটি সমঝোতা করিয়ে দিতে চাচ্ছেন। বিদেশি দেশ বা জাতিসংঘ কারো দোষ ধরার উপায় নেই এখানে। ভাই-ভাই লড়াইটি এমন পর্যায়ে যে, বাইরের লোকের উপদেশ চাই না এমন বলার মুখ দু’জনের একজনেরও নেই। হয় বাইরের চাপে নমনীয় হবে, না হয় রাষ্ট্রে চরম বিশৃংখলা সৃষ্টি হবে এমন ধরনের পরিস্থিতিই সৃষ্টি করেছে সরকার এবং বিরোধী দল। সুতরাং বাইরের চাপকে শ্রদ্ধা বা গ্রহণ না করার পরিবেশ নেই আমাদের দেশের রাজনীতিতে। রাজনীতির এই দীনতা, রাজনীতির এই দুর্বলতা গত কয়েক দশক ধরেই চলছে এবং এর জন্য দায়ী থাকছে আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি। আরও স্পষ্টভাবে বললে এভাবেও বলা যায়, রাজনীতির সংঘাতময় জায়গাটির দায় এড়াতে পারবেন না দুই নেত্রী। রাজনীতি করবেন তারা নিজের দেশের মানুষের মধ্যে, আর সমস্যা সমাধানের আশায় তাকিয়ে থাকবেন বিদেশি বন্ধুদের দিকে! এমন পরিস্থিতিতে বিদেশি বন্ধুদের কাছ থেকে কি আর কূটনীতিক রীতি-নীতির আশা করা যায়? [ লেখক: সাবেক সেনা কর্মকর্তা ]

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন