রাজনীতি এক মহান ও পবিত্র পেশা। মান, মর্যাদা,পদবী ও জনপরিচিতির দিক থেকে শুধু দেশে নয়, বিশ্বব্যাপী রাজনীতির পেশা রাজনীতিবিদকে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ও মান-মর্যাদা এনে দেয়। দেশ ও জনগণের মঙ্গল অথবা গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়ার চাইতে ক্ষমতা ও অর্থ-বিত্তের লালসা তাদের নিকট শ্রেয় বলে মনে হচ্ছে। হরতাল-অবরোধ,সংঘাত, সহিংসতা, ভাঙচুর দ্বারা দেশের মানুষের বা অর্থনীতির যত বড় ক্ষতিই হোক তাদের কিছু আসে যায় না, তাদের ক্ষমতা আঁকড়ে থাকা চাই অথবা ক্ষমতায় যাওয়া চাই। কিন্তু অন্য দেশের দিকে তাকালে দেখা যাবে যুক্তরাষ্ট্রের ১৬তম প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন নির্বাচিত হওয়ার পর তার বিরোধী দলের তিন চরম প্রতিদ্বন্দ্বীকে মন্ত্রী হিসাবে নিয়োগ দেন। তার মন্ত্রীসভাকে দি টিম অব রাইভেলস বলা হতো। ব্রিটেনের প্র্রধান মন্ত্রী টনি ব্লেয়ারও নির্বাচিত হওয়ার পর তার চরম প্রতিদ্বন্দ্বী ও বিরোধী দলের নেতা গর্ডন ব্রাউনকে সবচে গুরুত্বপূর্ণ অর্থমন্ত্রীর পদে নিযুক্ত করেন। শেতাঙ্গদের আদেশে পঁচিশ বছর জেল খেটেও দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট নেলসন ম্যান্ডেলা নির্বচিত হওয়ার পর ১৯৯৪ সালে শেতাঙ্গ নেতা ও পূর্ববর্তী প্রেসিডেন্ট ক্লার্ককে উপ-রাষ্ট্রপতি হিসাবে নিয়োগ দেন। এই বিশ্ব বরেণ্য রাজনীতিবিদগণ কেন তাদের বিরোধী ও প্রতিদ্বন্দ্বীদেরকে মন্ত্রিত্ব দিয়েছিলেন, তার পেছনে ছিল হিংসা ও প্রতিশোধ বর্জিত মহত্ রাজনীতি এবং অভিজ্ঞ লোকদের প্রজ্ঞা ও মূল্যবান অভিজ্ঞতাকে দেশের ও জনগণের কল্যাণে কাজে লাগানো। রাজনীতিতে এ রকম অহিংসা ও মহত্বের পরাকাষ্ঠা তাঁদেরকে ইতিহাসের পাতায় ও মানুষের মনে প্রাত:স্মরণীয়, অমর করে রাখবে। তাঁরা এমন কোন কাজ করেননি যা জনগণ পছন্দ করবে না, এমন কোন সিদ্বান্ত নেননি বা কর্মসূচি দেননি যা দেশের, জনগণের বা অর্থনীতির ক্ষতি করবে। আমাদের দেশের রাজনীতিবিদগণ কি তাদের কাছ থেকে সামান্য শিক্ষা নিতে পারেন না। সংসদীয় গণতন্ত্রে বিরোধী দল ছাড়া সংসদের কোন তাত্পর্য নেই। এক দলীয় কর্মকাণ্ড পক্ষপাতদুষ্ট বা জনবিরোধী হলেও প্রতিবাদ করার কেউ থাকে না। তাই বিরোধী দল যাতে ওজর দেখিয়ে সংসদে অনুপস্থিত না থাকে সে পরিবেশ বজায় রাখার দায়িত্ব সরকারের। বিরোধী দলের নেতা ও ক্ষমতাসীন প্রধানমন্ত্রীর মর্যাদা প্রায় সমান। সে জন্য উভয়ে উভয়ের প্রতি সম্মান ও শ্রদ্ধা দেখানো উচিত। কিন্তু আমাদের দেশে পরিস্থিতি বিপরীত। কেউ কারুর সংগে দেখা বা আলোচনা করা তো দূরের কথা, একজন অন্যের নামই শুনতে চান না। হিংসা, প্রতিহিংসা, প্রতিশোধের ইচ্ছা কখনও সুস্থ চিন্তার জন্ম দিতে পারে না। নির্বাচনকালীন সরকার কি ধরনের হবে সে বিতর্ক, একগুঁয়েমি যুক্তি, স্নায়ুযুদ্ধ ও আন্দোলন আজ তিন বছর যাবত চলছে। হরতাল, ভাংচুর, সহিংসতায় প্রাণহানি, সম্পদ ধ্বংস, অর্থনীতির অনেক ক্ষতি হয়েছে, কিন্তু বিরোধী জোটের সামান্যতম দাবিও সরকার মানছে না। এখন জাতিসংঘসহ আরও বন্ধু রাষ্ট্র সংলাপের তাগাদা দিয়েছে। এ অবস্থায় সরকার রাষ্ট্রের আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর বলে হয়তো একতরফা নির্বাচন ঘটিয়ে ফেলতে পারে। কিন্তু বি এন পির সেই ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের মতো সেটা গ্রহণযোগ্য হবে কি। তাছাড়া বিরোধী জোট এই একতরফা নির্বাচন প্রতিহত করলে সহিংসতা, ভাংচুর, প্রাণহানি ঘটতেই পারে। একটি স্বচ্ছ, নির্বিঘ্ন, নিরপেক্ষ, ঝুঁকিবিহীন ও উত্সবমুখর জাতীয় নির্বাচন উপহার দেয়ার দায়িত্ব সরকারের অর্থাত্ ক্ষমতা্সীন দলের। রাজনীতিবিদদের ব্যক্তি ও দলীয় স্বার্থের খেলার জন্যই আজ এ অচল অবস্থার সৃষ্টি। আগামী চার মাস সময় এক ক্রান্তিকাল। জনমানুষ উদ্বিগ্ন, আতংকিত, দুশ্চিন্তাগ্রস্ত। নির্বাচন হবে কি হবে না, হলে শান্তিপূর্ণ না সহিংস হবে। জনগণকে আতংকের মধ্যে রাখা কি সরকারের উচিত। দু’দলই কিছুটা ছাড় দিয়ে সমঝোতায় আসুক,দু দলের নেতা-নেত্রীদের মনে পবিত্র বিবেক জেগে উঠুক এটাই মানুষের একান্ত কাম্য।
লেখক :এফসিএ ও কথাশিল্পী
