ইতিহাসের চাকা ঘুরিয়া আসে বারে বার, মধ্যিখান দিয়া আমরা শুধু পাত্রপাত্রীর পরিবর্তন দেখিতে পাই। কখনও সখনও তাহা একই কুশীলবের ভাইসি-ভার্সা রূপেও আর্বিভূত হয়। ইহাকে ইতিহাসের ট্রাজেডি নাকি পরিহাস বলিব? বর্তমান বিরোধীদলীয় প্রধান সমপ্রতি এক জনসভায় চলতি অধিবেশনেই নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের বিল আনিয়া তাহা পাস করিয়া প্রধান উপদেষ্টা কে হইবেন তাহা লইয়া আলোচনার আহ্বান জানাইয়াছেন। তিনি বলিয়াছেন, তত্ত্বাবধায়ক বিল পাসের পূর্বে কোনো আলোচনা হইবে না। বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর অধীনে কোনো নির্বাচন হইবে না। বর্তমান সরকারের পাতানো নির্বাচন তথা অবৈধ ভোট রুখিয়া দিবার কথা বলিয়াছেন তিনি। তিনি এও স্বীকার করিয়াছেন, তত্ত্বাবধায়কের দাবি তাহার নহে, বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর। যেহেতু বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ২০০৭ সালে বিচারপতি কেএম হাসানকে মানেন নাই সুতরাং তাহাকেও এখন মানিয়া লইবার প্রশ্নই আসে না।
ইতিহাস যদি একখানি দর্পণ তাহাদের সম্মুখে বসাইয়া দিতেন তাহা হইলে দেখিতেন, স্বকণ্ঠ দিয়া তাহারা তাহাদের প্রতিপক্ষের হইয়া কথা বলিতেছেন সম্পূর্ণ এক সুরে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী প্রায় উনিশ বত্সর পূর্বে দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে দাবি তুলিয়াছিলেন—‘তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন চাই, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যতীত অন্য কোনো ফর্মুলা মানিবো না।’ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের এই দাবিকে হাস্যকর বিবেচনা করিয়া বর্তমান বিরোধীদলীয় প্রধান সেই সময় বলিয়াছিলেন, ‘পাগল ও শিশু ছাড়া কাহারও পক্ষে নিরপেক্ষ হওয়া সম্ভব নহে।’ ১৯৯৪ সালের ১ অক্টোবর ঢাকার মানিক মিয়া এভিনিউতে এক সমাবেশে তিনি বলিয়াছিলেন, ‘গণতান্ত্রিক সরকারের অধীনেই নির্বাচন হবে এবং হতে হবে।’ কারণ? কারণ, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সংবিধান পরিপন্থী। কিন্তু তত্কালীন সময়ে মাগুরা ও ঢাকার একটি উপনির্বাচনে সরকার ব্যাপক কারচুপি করিয়াছে মর্মে অভিযোগ করিয়া সেই সময়ের বিরোধীদল স্পষ্টতই অনড় অবস্থান গ্রহণ করেন একটি দল নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের ব্যবস্থা চালু করিতে। সেই সময় উদভূত রাজনৈতিক সমঝোতার লক্ষ্যে তত্কালীন প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে ১১ সদস্যের একটি সর্বদলীয় মন্ত্রিসভা গঠনের প্রস্তাব ওঠে, যেই সরকারে প্রধানমন্ত্রীসহ সরকারি দলের পাঁচজন এবং বিরোধী দলের পাঁচজন মন্ত্রী থাকিবে। তত্কালীন বিরোধীদল এই দাবি নাকচ করিয়া দেয়।
কিমাশ্চর্যম! আমরা এক্ষণে একই ঘটনা ও প্রস্তাবেরই পুনরাবৃত্তি দেখিতেছি। ইতিহাস এইখানে অবিকল জ্যোতিষগ্রন্থ হইয়া গিয়াছে যেন! কিন্তু টুইস্ট রহিয়াছে অন্যখানে। তাহা স্পষ্ট করিয়া আমরা হয়তো এখনই কিছু বলিতে পারি না। যদিও ২০০৭ সালে ১/১১ না ঘটিলে তত্ত্বাবধায়ক লইয়া বর্তমান প্রধানমন্ত্রী একচুল না নড়িবার অবস্থানে থাকিতেন না হয়তো।
কিন্তু আমাদের মর্মবেদনা হইল মানুষের অন্তস্থ দ্বন্দ্ব লইয়া। তাহা প্রগাঢ় বৈপরীত্যে পরিপূর্ণ। আমরা সাধারণ নৈতিকতায় স্পষ্টতই উপলব্ধি করিতে পারি—যাহা আমি অন্তরে বিশ্বাস করি না, তাহা আমার চাওয়া উচিত নহে। কেহ যদি তত্ত্বাবধায়কে বিশ্বাস না করিয়াই থাকেন, তাহা হইলে তাহা চাহিবার নৈতিকতা কি বিসর্জিত হয় না? এই নৈতিকতার বিসর্জন ও দ্বান্দ্বিক মনোভাবের কারণেই আমাদের দেশে সকল অস্থিরতা সৃষ্টি হইতেছে। নিজের সঙ্গে নিজের এই নিরন্তর বিরোধ, এই টানাপোড়েন আমাদের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলের অশনি দুর্যোগ আনিতেছে অবিরাম। দেখিয়া শুনিয়া তাহাদের মনোভাব যেন এইরূপে প্রতিভাত হইতেছে—‘যাহা চাই তাহা ভুল করে চাই, যাহা পাই তাহা চাই না।’
বুর্জোয়া সমাজের প্রতিনিধিত্বকারী কুশীলবেরা নিজেদের সুবিধার জন্য যেই ভাবে পানি ঘোলা করিলে মাছ ধরিতে সুবিধে হইবে, তাহারা তাহাই করিয়া থাকেন। তাহাতে স্ববিরোধিতা থাকিলে কি-ই বা আসে যায় তাহাদের! বাসনা সফল না হইলে হয়তো রবীন্দ্রনাথের উত্সর্গ হইতে নিজের মনকে প্রবোধ দেন—‘বক্ষ হইতে বাহির হইয়া, আপন বাসনা মম, ফিরে মরীচিকাসম। বাহু মেলি তারে বক্ষে লইতে, বক্ষে ফিরিয়া পাই না।’
