আজ দু’জনার দু’টি পথ, দু’দিকে গেছে বেঁকে। এ জাতীয় কথার গান শুনতে এক সময়ের বাঙালি মধ্যবিত্তরা খুবই পছন্দ করত। বিরহ মিশ্রিত প্রেমের গান এটি। প্রকৃত অর্থে দু’জনের পথ কি দু’টিই? যদি চূড়ান্ত লক্ষ্য হয় সুখ, তবে কেন দু’দিকে বেঁকে যাবে? রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছিলেন, ‘যাও সুখের সন্ধানে যাও, আমি যত দুখ পাই গো’ তিনি ব্যক্তিগত দুঃখকে প্রেমকে সুখের সন্ধানে পাঠিয়েছিলেন। এতে কি যথেষ্ট সুখ ছিল? মিছে কথা। সুখ বিরহে নয়, দূরত্বে নয়, মিলনেই। যে কারণে সমান্তরাল সরল রেখাকেও অংকবিদরা মিলিয়ে দিয়েছেন। সাধারণ জ্যামিতিক অংকে বলা হয়েছে, সমান্তরাল সরল রেখা কখনই পরস্পরকে ছেদ করে না। অর্থাত্ মিলিত হয় না কখনই। কিন্তু এখন সবাই জানে যে, নতুন ধরনের অংকেই বলা হয়েছে যে, তারা অনন্তে গিয়ে মিলবে। অনন্তের ধারণা মানুষকে চিন্তাজগতের বাইরের জগতে নিয়ে গেছে। সাধারণ মানুষ কখনই অনন্ত বোঝে না। তারা তাত্ক্ষণিক অবস্থায় নিজেদেরকে খুঁজে ফেরে। বর্তমানই তাদের অস্তিত্ব। এমন অনেকেই আছে, যারা ভবিষ্যত্ও বোঝে না। বাংলাদেশের এই সব সাধারণ মানুষের জন্য যে রাজনীতি তাকেও তাত্ক্ষণিক কল্যাণকর চরিত্রের হতে হবে। প্রকৃত সুখ অনন্তে গিয়ে দেখা মিলবে, এমন ধরনের কথায় তারা কিছুই বুঝবে না। অহেতুক প্রতিক্রিয়া প্রদর্শন করবে। যা এক পর্যায়ে রাষ্ট্রীয় অকল্যাণই প্রদর্শন করবে।
বাংলাদেশের রাজনীতি এখন যে সাংঘর্ষিক পর্যায়ে পৌঁছে গেছে, তা দেখে একথাগুলো মনে হলো। গণকল্যাণই যদি তাদের আরাধ্য হয়, তবে একস্থানে তাদের মিলিত হতেই হবে। দুটি বড় দলের দু’দিকে বেঁকে যাওয়া পথে সাধারণ মানুষের কল্যাণ কিংবা রাষ্ট্রীয় কল্যাণ আসবে না। মনে হয় তারা অনন্ত বেগে বিপরীত দিকে ছুটছে, অনন্তে মিলিত হওয়ার পরিবর্তে। কেন এই বিপরীতমুখিতা? প্রশ্নের জবাব যাই হোক না এই মুহূর্তের রাজনৈতিক সমাধান তার মধ্যে নেই। সমাধান অবশ্যই মিললে। দু’টি প্রধান দলের একস্থানে মিলতেই হবে। কিন্তু কেবলমাত্র গোঁয়ার্তুমির কারণেই তাদের মিলন হচ্ছে না।
কোথায় মিলবে তারা, কোন সিদ্ধান্তে মিলবে? প্রশ্নটি হতেই পারে। সহজ সমাধান হলো সংসদেই তাদের মিলতে হবে। এটিই প্রাতিষ্ঠানিক মিলনস্থল। অন্য যে কোন স্থানই অপ্রাতিষ্ঠানিক। কিন্তু জেদের কারণে যদি সংসদে তাদের মিলন না হয় তবে তাদেরকে অপ্রাতিষ্ঠানিকতা তৈরি হবে, এক পর্যায়ে তাই তাদেরকে পরিত্যাগ করবে। যে কোন অপ্রাতিষ্ঠানিকতা নৈরাজ্যের গোপন উত্স। আর যে কোন গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল নৈরাজ্যের শিকার হলে, তার রাজনীতি তাকেই পরিত্যাগ করে। দীর্ঘদিন রাজনীতি করে যদি রাজনীতি ছেড়ে পালাতে হয় তবে লোকে কী হাসাহাসি করবে না?
দু’জনে দুটি পথ দু’দিকে বাঁকিয়ে না নিয়ে উচিত হবে গণকল্যাণের কথা চিন্তা করে একস্থানে মিলিত হওয়া। বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রাজনীতির বিলুপ্তি দেশের জন্য মারাত্মক অকল্যাণ বয়ে আনবে। আওয়ামী লীগ যেহেতু সুবিধাজনক অবস্থানে আছে, সেহেতু কোন ছাড় দেবেই না। বিএনপিকেই ছাড় দিতে হবে এবং গণতান্ত্রিক ধারায় তার অবস্থানকেও পাকা পোক্ত করতে হবে। তাদের মনে করা ঠিক নয় যে, সামরিক বাহিনী ক্ষমতা গ্রহণ করে তাদেরকে আবার ক্ষমতায় বসাবে। এটিও মনে করা ঠিক নয় যে, সামরিক বাহিনী ক্ষমতায় গিয়ে আওয়ামী লীগকে ধ্বংস করবে। কুফল ফলবে একটাই। তা হচ্ছে, গণতান্ত্রিক ধারা বিনষ্ট হবে।
নির্বাচনী পরিস্থিতি কি চমত্কার? সবাই তারস্বরে বলছে— রাজনৈতিক পরিস্থিতি সংঘাতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এটি বাড়তে বাড়তে নৈরাজ্যিক হবে। নৈরাজ্য অকল্যাণকর হবে এবং গণতান্ত্রিক রাজনীতির কবরও রচিত হতে পারে। তাই সবারই উচিত হবে সংঘাতের দিকে না গিয়ে আপোষের দিকে যাওয়া। ভদ্রভাবে সংবিধান সম্মতভাবে নির্বাচন করা।
লেখক : জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক
