[ নি র্বা চ ন ]

নির্বাচনী দৌড়ে দুই নেত্রীর কে হিরো, কে চিকেন?

আপডেট : ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ২১:৫৩
আসন্ন নির্বাচনকে ঘিরে বাংলাদেশের রাজনীতি ক্রমশ উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। দেশ-বিদেশের বহুমুখী চাপ সত্ত্বেও সংবিধান সমুন্নত রেখে বর্তমান সরকারের অধীনেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত করতে চাচ্ছে শাসক দল। আর বিরোধী দল নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের বাইরে কোন নির্বাচনে যাবে না বলে দ্ব্যর্থহীনতাভাবে জানিয়ে আসছে। সরকারি জোট ও বিরোধী জোটসহ দেশের সাধারণ মানুষ তাকিয়ে আছেন দুই নেত্রীর দিকে। সর্বত্র প্রশ্ন উঠছে, আমাদের এ শ্বাসরুদ্ধকর রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার ক্রীড়াঙ্গনে দুই নেত্রীর কে হচ্ছেন হিরো। আর কে চিকেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতিসংঘের মহাসচিবের প্রস্তাবিত সংলাপ নাকচ করেছেন গত ১০ সেপ্টেম্বর। ১২ সেপ্টেম্বর নবম জাতীয় সংসদের সর্বশেষ সেশনের গতি-প্রকৃতি থেকে মনে হচ্ছে- নির্বাচনকে ঘিরে সৃষ্ট দ্বন্দ্বের কোন সমাধান হবে না। কয়েকদিন আগে বিরোধী জোটনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া নরসিংদীর সম্মেলনে স্পষ্ট করে বলেছেন, নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকার ছাড়া কখনোই তারা নির্বাচনে যাবেন না এবং এ ক্ষেত্রে নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকার প্রতিষ্ঠার এক দফা আন্দোলনের দ্ব্যর্থ ঘোষণা দেন তিনি। দেশ জাতি ও জনগণের স্বার্থের অগ্রাধিকার বিস্মৃত হয়ে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ স্বীয় অবস্থানে এমনভাবে অনড় থাকছেন যে, কেউই একটু ছাড় দিতে চাচ্ছেন না। নির্দলীয় নিরপেক্ষ নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থাকে ঘিরে দুই নেত্রীর দ্বন্দ্বের নিরন্তর লড়াইয়ে উভয়ে হিরো হওয়ার চিন্তায় বিভোর; কিন্তু রাজনীতির তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক বিশ্লেষণে একই সাথে উভয়ের হিরো হওয়ার ইতিহাস নেই বললেই চলে। বিষয়টি একটু খুলে বলি। মার্কিন পৌরাণিকীতে একটি জনপ্রিয় খেলার প্রচলন লক্ষ্য করা যায়। যা থেকে রাজনৈতিক তাত্ত্বিকগণ ক্রীড়াতত্ত্বের চিকেন মডেল (chicken model) উপস্থাপন করেছেন। মূলত রাজনীতিতে দ্বন্দ্ব পরিস্থিতির চমত্কার তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায় ক্রীড়াতত্ত্বের মাধ্যমে। লিবার, নিউম্যান, মরগেনস্টার্ন, মিলার প্রমুখ রাজনৈতিক তাত্ত্বিকগণ বলেছেন, দ্বন্দ্ব-সংঘাতের বিস্ফোরণোন্মুখ পরিস্থিতিতে রাজনীতিবিদগণ নিজেদের ক্ষতির পরিমাণ কমিয়ে লাভের পরিমাণ বৃদ্ধি করতে ক্রীড়াতত্ত্বের প্রয়োগ করতে পারেন। মনে রাখতে হবে, রাজনৈতিক লড়াইয়ে একক কর্তৃত্ব ও প্রাধান্য রাখার স্বৈরতান্ত্রিক মানসিকতা নিয়ে কখনো হিরো হওয়া যায় না। বরং তখন মনো-কাঠামো রাজনৈতিক ভবিষ্যেক চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেয়। ক্রীড়াতত্ত্বের চিকেন মডেলের ধারণা অনুযায়ী দুই জন কিশোর গাড়ীচালক সরু রাস্তার দুই দিক থেকে গাড়ী চালিয়ে আসে। যদি একজন চালক দ্রুতবেগে গাড়ী চালায় সে হিরোতে (Hero) পরিণত হয়, অপরজন হয় চিকেন (chicken); কিন্তু দুই জন অবুঝ কিশোরের কেউই প্রতিপক্ষের পরিকল্পনা সম্পর্কে কোন পূর্ব ধারণা লাভ করতে পারে না। ক্রীড়াতাত্ত্বিকগণ এমন দ্বন্দ্ব-অবস্থায় ঐ খেলোয়াড়দ্বয়ের যৌক্তিক পছন্দ (minimax strategy) হিসেবে এমন এক সমাধান উপস্থাপন করেছেন যাতে উভয় কিশোরই দীর্ঘমেয়াদে লাভবান হতে পারে, যদিও বাহ্যত তাদের দুই জনের ফলাফলই শূন্য (Zero sum game)। অর্থাত্ তারা দুই জনেই বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিয়ে ধীরে ধীরে গাড়ী চালিয়ে একে অপরকে অতিক্রম করবে। অর্থাত্ দুই জনেই এমন সম্মানজনক চিকেনে পরিণত হবে, যা ভবিষ্যতে তাদের কাউকে না কাউকে হিরোতে পরিণত করতে সক্ষম হবে; কিন্তু দূরদর্শী দুই জন কিশোরই যদি বাছ-বিচারের তোয়াক্কা না করে হিরো হওয়ার অদম্য স্পৃহায় সজোরে গাড়ী চালায় তাহলে উভয়েই মারাত্মক দুর্ঘটনায় পতিত হতে বাধ্য। এক্ষেত্রে তাদের উভয়ের ফলাফল মাইনাস ১০০ অর্থাত্ দুই জনেরই রাজনীতিক মৃত্যু। বাংলাদেশের সুশীল সমাজ, রাজনৈতিক বিশ্লেষক, সমাজ চিন্তক আজ অনেকটা একমত হয়েছে যে, শাসক দল ও বিরোধী দল নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থায় যে কোন মডেল গ্রহণ করুক এবং সকলের অংশগ্রহণে সাধারণ নির্বাচন সম্পন্ন করুক। এ পর্যন্ত নানা মডেলও দেয়া হয়েছে। ব্যারিস্টার রফিকুল হক, শাহদীন মালিক, টিআইবি, ডক্টর আকবর আলী খান প্রমুখ জাতীয় মুরুব্বিগণ বিভিন্ন মডেলের বিস্তারিত তুলে ধরেছিলেন। একটি জরিপে ৯০ ভাগ মানুষই কেয়ারটেকার সরকার চায় বলে প্রতিবেদন পেশ করেছিল; কিন্তু আমাদের সকল উদ্যোগ বুড়ি আংগুল দিয়ে ভূ-লুণ্ঠিত করে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ বিশেষ করে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি বিশেষ করে দুই নেত্রী মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও মাননীয় বিরোধী নেত্রী স্ব স্ব অবস্থানে অনড় থাকলেন। রেডিও, টিভি ও সামাজিক মাধ্যমসমূহের দিকে দৃষ্টিপাত করলে আমাদের বিদ্যমান রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের ভয়াবহ ভবিষ্যত্ চোখে পড়ে। যাতে দুই নেত্রী তাদের দলসহ গোটা জাতিই সমূহ ক্ষতির সম্মুখীন হতে যাচ্ছে বলে দৃশ্যমান হচ্ছে। আমাদের মতো দরিদ্র দেশের নেতৃবৃন্দের দলাদলির সুযোগে বিদেশি প্রভুরা সজাগ হয়ে উঠেন এবং বিভিন্নভাবে আমাদের আভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করে থাকেন। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনীতিতে বহিঃ হস্তক্ষেপের নজিরবিহীন ঘটনাসমূহ প্রতিদিনের শীর্ষ খবরে স্থান পাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইইউসহ জাতিসংঘের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ ইতিমধ্যে অত্যন্ত নিবিড়ভাবে আমাদের আভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক মহাস্পর্শকাতর বিষয়গুলোতে জড়িয়ে পড়েছেন। তাদের এ ভূমিকাকে অনেকে বহিঃহস্তক্ষেপ বলে অভিহিত করলেও এ ভূমিকায় অনিবার্যতাকে অস্বীকার করা যায় না। আমাদের চরম ব্যর্থতাই বিদেশিদেরকে এখন সরাসরি সংশ্লিষ্টতার অবারিত সুযোগ করে দিয়েছে। সাহায্যগ্রহণকারী দেশ হিসেবে দাতাদের এতটুকু অধিকার সাহায্য নির্ভরশীলতা (aid dependency) তত্ত্বে স্বীকৃত হয়েছে। অবশ্য বিরোধী দল কেয়ারটেকার দাবি থেকে সরে এসে নিরপেক্ষ নির্দলীয় সরকার ব্যবস্থা গঠনে সরকারের ভূমিকা প্রত্যাশা করছে। কিন্তু সরকারি দল সংবিধান সমুন্নত রাখায় প্রত্যয় ঘোষণা করলেও এ পর্যন্ত কোন যৌক্তিক মডেল উপস্থাপন করে বিরোধী শিবিরের আস্থা অর্জন করতে সক্ষম হয়নি বা বিরোধীদলকে তারা আদৌ বিবেচনায় নিচ্ছে না। দুদলই এমন সজোরে আমাদের রাজনীতির সরু রাস্তায় গাড়ী চালাচ্ছে, যাতে এ ভয় অমূলক নয় যে, আমাদের রাজনীতিতে কোন অশুভ অধ্যায় রচিত হয়ে গণতন্ত্রের শিশু চারা গাছটির সমূহ ক্ষতিসাধন করবে। কি চাচ্ছে সরকার? বিএনপিকে বাদ দিয়ে একটি নির্বাচন? সরকারের জোটভুক্ত বামদল, জাতীয় পার্টির এরশাদসহ অনেক দল ইতিমধ্যে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে না যাওয়ার কথা বলেছে। ইইউ প্রতিনিধি দল, যারা বর্তমানে ঢাকা অবস্থান করে সরকার, বিরোধী দল, স্পীকার, ইসিসহ সর্বত্র বিচরণ করেছেন, তারাও স্পষ্ট করে বলেছেন যে, সকল দলের অংশগ্রহণে নির্বাচন অনুষ্ঠিত না হলে ইইউ কোন নির্বাচন পরিদর্শক পাঠাবে না। যুক্তরাষ্ট্র ও ড. ইউনূসসহ নানা ইস্যুতে সরকারের প্রতি বিরক্ত। জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুন সরকার ও বিরোধী দলকে চিঠি দিয়ে ব্যর্থ হয়ে শেষ পর্যন্ত জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ চলাকালে অধিবেশনের পার্শ্বস্থানে (Side line) সরকার ও বিরোধী দলের সাথে আলোচনার আমন্ত্রণ জানালেও প্রধানমন্ত্রীর নাকচে তা ব্যর্থ হয়ে যায়। বিএনপি এক্ষেত্রে সহযোগিতার প্রতীক্ষা করলেও প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্তে জাতিসংঘ-প্রণীত সমাধান প্রস্তাবও ব্যর্থ হয়। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জনকেরির পত্রের জবাবে সরকার তার অবস্থানে অনড় থাকবে বলে উল্লেখ করবে, এমন আভাস পত্রিকায় দেখেছি। সকল মডেল, প্রস্তাব, অনুরোধ, উপদেশ অবজ্ঞা করে সরকার সকলের অংশগ্রহণের বাইরে কেমন নির্বাচন করতে চাচ্ছে তা এখনো স্পষ্ট নয়। বিরোধী দল ১২/৯ তারিখে সংসদ সেশন চলাকালে গুলশান অফিসে অনুষ্ঠিত মিটিং এ মন্ত্রী পরিষদ ও সংসদ ভেঙ্গে দিয়ে ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। মনে হচ্ছে সরকার ও বিরোধী দল আবারো সজোরে তাদের গাড়ী চালানোর স্টিয়ারিং হাতে নিয়েছে। আমাদের নেতৃবৃন্দ কি জানেন, এ আত্মবিধ্বংসী রাজনৈতিক লড়াই এর পরিণতি কত ভয়ংকর। তাঁরা কি জানেন, এ লড়াইয়ে কে হবেন হিরো, আর কে চিকেন? ১৯৬২ সনে দুটি পরাশক্তি কিউবায় সোভিয়েত ইউনিয়নের ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েনের ইস্যুকে কেন্দ্র করে প্রায় পরমাণু যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গিয়েছিলেন। পরে উভয়ে তাদের অবস্থান থেকে সরে গিয়ে ‘চিকেন’ হওয়ার গৌরব অর্জন করে এমন বৈশ্বিক মর্যাদা অর্জন করেছিলেন যে, আজ সিরিয়া ইস্যুকেও তারা একই দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে সক্ষম হলো। আমার অনুরোধ দুনেত্রীর কাছে, দুদলের কাছে, আপনারা ‘চিকেন’ হওয়ার সত্ সাহস সঞ্চয় করুন। দেশ ও জাতির মুক্তির জন্য উভয়ে এতটুকু আত্মত্যাগ করুন। নিশ্চয়ই ভবিষ্যতে আপনারাই ‘হিরো’ হিসেবে আবির্ভূত হবেন। লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়