ট্রেনযাত্রীদের ক্রমবর্ধমান নিরাপত্তাহীনতা

আপডেট : ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ২১:৫৯
প্রকৌশলী প্রীতি দাশের মর্মান্তিক মৃত্যুর ক্ষত শুকাইবার আগেই মাত্র একমাসের ব্যবধানে একই স্থানে আবারও ট্রেনে ঢিল ছোঁড়ার ঘটনা ঘটিয়াছে গত বৃহস্পতিবার। তবে এইবার আক্রান্ত হইয়াছেন ঢাকার একজন ব্যবসায়ী। ভাগ্যক্রমে তিনি প্রাণে বাঁচিয়া গেলেও তাহার আঘাতটিও ছিল গুরুতর। সুবর্ণ এক্সপ্রেস নামক আন্তঃনগর ট্রেনে করিয়া ঢাকা হইতে চট্টগ্রাম যাইবার পথে সীতাকুণ্ডে ঢিলটি সরাসরি তাহার বুকে আঘাত করে। প্রীতি দাশ আক্রান্ত হইয়াছিলেন গত ১০ আগস্ট। আন্তঃনগর তূর্ণা নিশীথায় চট্টগ্রাম হইতে ঢাকা আসিবার পথে এই সীতাকুণ্ডেই নিক্ষিপ্ত ঢিলের আঘাতে প্রাণ হারাইয়াছিলেন তিনি। সদ্যবিবাহিতা এই তরুণ প্রকৌশলীর অপঘাত মৃত্যু দেশবাসীকে প্রবলভাবে নাড়া দিয়াছিল। থানায় মামলা হইয়াছিল। রেল কর্তৃপক্ষ নড়িয়াচড়িয়া বসিয়াছিল। জনসচেতনতামূলক প্রচারণাও চালানো হইয়াছিল রেলপথ-সংলগ্ন ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলগুলিতে। সহযোগিতা চাওয়া হইয়াছিল সংশ্লিষ্ট এলাকার সর্বস্তরের মানুষের। সব মিলাইয়া, আশা করা হইয়াছিল যে এমন বেদনাদায়ক ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে স্ব স্ব অবস্থান হইতে সকলেই সক্রিয় ভূমিকা রাখিবেন। কিন্তু সেই আশায় গুড়ে বালি। চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের ঘটনা বরং বাড়িয়াই চলিয়াছে। গত একমাসে পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চলে এই ধরনের কমপক্ষে আরও তিনটি ঘটনা ঘটিয়াছে। আরও উদ্বেগের বিষয় হইল, নিক্ষিপ্ত ঢিলে দায়িত্বরত অবস্থায় গুরুতরভাবে আহত হইয়াছেন ট্রেনের দুইজন চালকও। অতএব, বড় ধরনের দুর্ঘটনার হাত হইতে যাত্রীসাধারণ এই যাত্রায় রক্ষা পাইলেও বিষয়টিকে হালকা করিয়া দেখিবার কোনো অবকাশ নাই। তুলনামূলকভাবে ট্রেনকে নিরাপদ গণপরিবহন বলিয়া বিবেচনা করা হয় সারা বিশ্বব্যাপী। কিন্তু আমাদের দেশে ট্রেনযাত্রীদের নিরাপত্তা কতোখানি নাজুক তাহা ভুক্তভোগী মাত্রই জানেন। বাস্তবতা হইল, পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চলে শত শত কিলোমিটার ট্রেন লাইনের প্রায় পুরোটাই অরক্ষিত ও অনিরাপদ। দেশের প্রায় সর্বত্রই ট্রেন লাইনের পাশ ঘেষিয়া শুধু যে বিপজ্জনকভাবে অসংখ্য বস্তি গড়িয়া উঠিয়াছে তাহাই নহে, লাইনের উপর নিয়মিত হাটবাজারও বসিতেছে। গরুছাগল চড়িতেছে। খেলা করিতেছে শিশুকিশোরের দল। আর ট্রেনলাইনের উপর দিয়া যত্রতত্র পথচারী ও যানবাহন পারাপারের ঘটনা তো আছেই। বৈধ লেবেলক্রসিংয়েই যেইখানে দুর্ঘটনা ঠেকানা যাইতেছে না, সেইখানে রেললাইনের উপর অবৈধভাবে নির্মিত সড়ক ও লেবেলক্রসিংয়ের সংখ্যা দিনদিন বাড়িয়া চলিয়াছে। রেলওয়ের নাজুক নিরাপত্তা ব্যবস্থার এইখানেই শেষ নহে। রেললাইন উপড়াইয়া ফেলা কিংবা ক্লিফ চুরির মতো বিপজ্জনক ঘটনাও ঘটিতেছে হরহামেশাই। চলন্ত ট্রেনে ছিনতাই ও ডাকাতির শিকার হইয়া নির্মমভাবে নিহত হওয়া যাত্রীর সংখ্যাও উপেক্ষা করিবার মতো নহে। ট্রেনের ছাদ হইতে পড়িয়াও নিয়মিত প্রাণহানির ঘটনা ঘটিতেছে। ট্রেনযাত্রীদের সামগ্রিক এই নিরাপত্তাহীনতার প্রেক্ষাপটে চলন্ত ট্রেনে ঢিল নিক্ষেপের বিষয়টিকে গোদের উপর বিষফোঁড়ার সাথে তুলনা করা যাইতে পারে। ট্রেনের সর্বাঙ্গেই এখন ব্যথা। অতএব, প্রতিকারের পথও অত্যন্ত জটিল। সর্বোপরি, সরকারের সামর্থ্যের সীমাবদ্ধতাও সর্বজনবিদিত। শত শত মাইল রেললাইন পাহারা দেওয়ার মতো জনবল রেলওয়ের নাই। থাকিবার কথাও নহে। আবার লাইনের দুইপাশে নিরাপত্তা বেষ্টনি নির্মাণ করাও আমাদের সাধ্যাতীত। এমতাবস্থায়, ব্যাপকভাবে জনসচেতনতা সৃষ্টি এবং বিদ্যমান আইনের কঠোর প্রয়োগ ছাড়া গত্যন্তর আছে বলিয়া তো মনে হয় না। চলন্ত ট্রেনে ঢিল নিক্ষেপের ব্যাপারটি যে বিচ্ছিন্ন ঘটনা তাহাতে সন্দেহ নাই। অপরিণত কিশোর-তরুণ কিংবা মানসিকভাবে অসুস্থ কোনো ব্যক্তিও এই ধরনের ঘটনা ঘটাইতে পারে। দুর্ঘটনাপ্রবণ অঞ্চলসমূহের প্রশাসন ও জনগণ আরেকটু সতর্ক হইলে অনুরূপ ঘটনার পুনরাবৃত্তি অনেকাংশে রোধ করা সম্ভব বলিয়া আমরা মনে করি।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন