সংবিধান বেচারা বড় বিপদে আছে। সরকারি দলের সাফ কথা—যা হবে সংবিধান অনুযায়ী হবে। বিরোধী দলও নাছোড়বান্দা। তাদের দাবি তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নিদেনপক্ষে নির্দলীয় ও নিরপেক্ষ অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে নির্বাচন। সংবিধান সংশোধন করে হলেও তাদের দাবি মানতে হবে বলে তারা প্রতিদিন হুংকার দিচ্ছেন। সরকারি দলের সিংহনাদ ও বিরোধী দলের পাল্টা গর্জনে চারিদিকে সাজ সাজ রব রব। দাতাগোষ্ঠী, প্রভাবশালী বিদেশি রাষ্ট্র ও জাতিসংঘ সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে শান্তিপূর্ণ সমাধানের জন্য তত্পর হয়ে উঠেছে। সুশীল সমাজ, ব্যবসায়ী সম্প্রদায় ও সচেতন নাগরিকেরা সক্রিয় হয়ে উঠেছেন সমঝোতার গ্রহণযোগ্য একটি রূপরেখার অনুসন্ধানে। যারাই আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন, নির্বাচন নিয়ে সৃষ্ট জটিলতা ও তা নিরসনের কথা বলছেন, তাদের কথায় উদ্ধৃতি হিসেবে চলে আসছে সংবিধান। সরকারি দল পুরো সংবিধানকে আগলে রেখেছে, বিরোধী দল পঞ্চদশ সংশোধনীর মুণ্ডুপাত করছে, কেউ বা সংবিধানের আঁচল ধরে টানছে, বিশেষজ্ঞরা ব্যস্ত হয়ে উঠেছেন সংবিধানের চুলচেরা বিশ্লেষণে। বেচারা সংবিধান!
গণতন্ত্রের জন্য প্রয়োজনীয় পূর্বশর্তগুলো না থাকায় আমাদের নানা ঝুট-ঝামেলা পোহাতে হয়, কখনো কখনো সহিংসতা দাবানলের মত ছড়িয়ে পড়ে। আমরা শক্তিশালী স্থানীয় সরকার গড়ে তুলতে পারিনি, সুষ্ঠু ও স্বাধীন নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য নির্বাচন কমিশন সক্ষমতা অর্জন করতে পারেনি অথবা অন্যভাবে বলা যায় যে, আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচন কমিশনকে ওই সক্ষমতা অর্জন করতে দেয়নি। আমাদের দুর্নীতি দমন কমিশন সরকারের আজ্ঞাবহ। আমাদের নিম্ন আদালতগুলো থেকে ন্যায়বিচার পাওয়া বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অসম্ভব। আমরা গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি ও রীতি-নীতি গড়ে তুলতে পারিনি। রাজনৈতিক দলগুলো একদল আরেক দলকে বিশ্বাস করে না। রাজনীতিকরা একজন আরেকজনের চরিত্র হননে ব্যস্ত। তত্ত্বাবধায়ক সরকার তো সর্বরোগহর কোন বটিকা নয় যে দেশের সকল সমস্যার সমাধানে এটি দাওয়াই হিসেবে কাজ করবে। তবুও গত দুই দশকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ঠেকার কাজ চালিয়েছে। কিন্তু আর কত দিন?
মাগুরা নির্বাচনের পর নব্বই এর দশকে যখন তখনকার বিরোধী দল আওয়ামী লীগ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার দাবিতে আন্দোলন শুরু করল, তখন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া বললেন, যা হবে সংবিধান অনুযায়ী হবে। ২০০৬ সালেও তিনি সাংবিধানিক বাধ্য-বাধকতার কথা বললেন। সংবিধানের দোহাই দিয়ে তিনি বললেন, ৯০ দিনের মধ্যে জাতীয় সংসদ নির্বাচন করার বাধ্য-বাধকতা রয়েছে। কিন্তু বিচারপতি আজিজের নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশনের অধীনে নির্বাচনে অংশ নিতে আওয়ামী লীগ অস্বীকার করল। দেশে সৃষ্টি হল চরম অরাজক অবস্থা। বেচারা সংবিধান! সংবিধানকে ঠুঁটো জগন্নাথ বানিয়ে খালেদা জিয়া বার বার ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থেকে যেতে চেয়েছেন। তার স্বামী মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান সংবিধানকে ময়লার ঝুড়িতে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা করেছিলেন সামরিক ফরমান বলে। কয়েক মাস আগে বেগম খালেদা জিয়া সংবিধান ও গণতন্ত্রকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে বলেছিলেন, দেশের বর্তমান অবস্থা চলতে থাকলে সেনাবাহিনী নীরব দর্শক হয়ে থাকবে না। সংবিধান ও গণতন্ত্রের প্রতি কী অবিচল আস্থা বেগম জিয়ার? ক্ষমতার প্রয়োজনে সংবিধানকে ছুঁড়ে ফেলতে বা অসাংবিধানিক সেনাশাসনকে স্বাগত জানাতে তাদের বিলম্ব বা কুণ্ঠা কোনটাই হয় না।
দেশের অন্য বৃহত্ দল আওয়ামী লীগের মধ্যে সংবিধান ও গণতন্ত্রের প্রতি সবসময়ই আস্থা লক্ষ্য করা গেছে। পাকিস্তান ও বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ যতবারই ক্ষমতায় এসেছে, সেটি এসেছে সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের রায় নিয়ে। পেছন দরজা দিয়ে বা সেনাবাহিনীর সঙ্গে আঁতাত করে আওয়ামী লীগ কখনো ক্ষমতায় আসেনি বা বিরোধী রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতৃবৃন্দকে হত্যার জন্যও কোন ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়নি। এবার যখন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংবিধান অনুযায়ী সকল কিছু করার কথা বলছেন, তখন দেখতে পাচ্ছি যে, তার সরকারের সময়ে যে উপ-নির্বাচন ও সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনগুলো হয়েছে সেগুলো ছিল সুষ্ঠু ও বিশ্বাসযোগ্য। তাহলে তার প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে নির্বাচন কমিশনের অধীনে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাধা কোথায়? বাধা হচ্ছে— বিরোধী দলীয় নেত্রী খালেদা জিয়া এবং তার দল তা মানবে না। তাহলে মূল সমস্যা হচ্ছে আস্থার সংকট। ওদিকে বর্তমান নির্বাচন কমিশনের প্রতি কৌশলগত কারণে বিএনপি অনাস্থা জানিয়ে রেখেছে। তবে সরকারকে যেটি অবশ্যই আমলে নেয়া উচিত সেটি হচ্ছে—জাতীয় সংসদ বহাল রেখে নির্বাচন করার বিষয়টি। উন্নত ও শক্তিশালী গণতন্ত্রের দেশ যেমন—বৃটেন, ভারত, নিউজিল্যান্ড, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়াতে যদি সংসদ ভেঙ্গে যাওয়ার পর জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, তাহলে বাংলাদেশে সংসদ বহাল রেখে নির্বাচন করাটা খারাপ নজির তৈরি করবে। এতে করে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের ব্যাপারে বর্তমান সরকারের আন্তরিকতাও প্রশ্নবিদ্ধ হবে।
সরকারের নীতি-নির্ধারকেরা আরেকটি বিষয় ভেবে দেখেছেন কি না জানি না। ধরা যাক, অলৌকিক কোন কারণে বিএনপি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের অধীনে যে জাতীয় নির্বাচন হবে সেই নির্বাচনে অংশ নিল এবং তাদের প্রার্থীরা সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে জয়ী হলেন, বেগম খালেদা জিয়া হলেন নতুন সরকারের প্রধানমন্ত্রী। নতুন সরকারের মেয়াদকালে অনুষ্ঠিত নানা নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা যদি প্রশ্নবিদ্ধ হয় এবং পরবর্তী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের নিরপেক্ষতা নিয়ে যদি আশংকা দেখা দেয়, তাহলে কি আওয়ামী লীগকে আবার তত্ত্বাবধায়ক সরকার অথবা নির্দলীয় অন্তর্বর্তী সরকারের দাবিতে আন্দোলনে নামতে হবে?
১৯৭২ সালে আমরা একটি উত্কৃষ্ট সংবিধান পেয়েছিলাম। তারপর অনেকবার সংবিধানকে কাটাছেঁড়া করা হয়েছে। প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে গজ-ব্যান্ডেজ, ছুরি-কাঁচি নিয়ে ক্ষত-বিক্ষত করা হয়েছে দেশের সর্বোচ্চ আইনকে। সামরিক শাসকেরা সংবিধানকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে সেনা আইন দিয়ে দেশ চালিয়েছেন, সামরিক ফরমান দিয়ে সংশোধন করেছেন সংবিধান। গণতান্ত্রিক শাসনামলেও সংবিধানের দুর্দশা ঘোচেনি। যার যার সুবিধা অনুযায়ী সংবিধানের দোহাই দিচ্ছেন এবং সংবিধানের চুলচেরা বিশ্লেষণ করে নানা ব্যাখ্যা হাজির করছেন। কিন্তু সংবিধানকে যদি সবাই যথার্থভাবে মেনে চলতেন, যদি সাংবিধানিকতার বিকাশ ঘটত, নির্বাচন কমিশন যদি স্বাধীন হত, স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা যদি শক্তিশালী ভিত্তি পেত, রাজনীতিবিদরা যদি পরস্পরকে আস্থায় নিয়ে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির বিকাশ ঘটাতেন, তাহলে আমরা হানাহানি ও অরাজকতা থেকে মুক্ত হয়ে বাংলাদেশের অমিত সম্ভাবনা বিকাশের দিকে এগিয়ে যেতে পারতাম।
লেখক :সহযোগী অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]
