প্রকৃতিতে চলছে শরত্কাল। আগের দিনে রাজা-রাজড়ারা শরতে মৃগয়ায় বের হতেন। একালের মানুষ ঋতুবৈচিত্র্য খুব একটা টের পায় না। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঋতু পরিবর্তন তেমনভাবে ঠাহরও করা যায় না। অথচ আমরা ছোটবেলায় দেখেছি, শরতে হঠাত্ কমে যাওয়া পুকুর-খালের পানিতে শাপলা ফুল। আকাশে সাদা মেঘের ওড়াউড়ি। হঠাত্ হঠাত্ বৃষ্টি। বাড়ির পাশে, পথের ধারে, নদীর পাড়ে শিউলি ফুল, কাশফুল। আকাশের সাদা মেঘের সঙ্গে শিউলি-কাশের সাদার মিতালী মনটাকেও সাদা করে দিত।
শিউলি প্রসঙ্গে মনে পড়ছে এক উপকথা। একবার এক রাজকন্যা সূর্যের প্রভায় মুগ্ধ হয়ে প্রেমে পড়ল তার। কিন্তু সূর্য প্রত্যাখ্যান করল মর্ত্যবাসিনীর হূদয়াবেগ। বঞ্চনায় আত্মহনন করল অভিমানিনী। তার চিতাভস্ম থেকে জন্ম নিল একটি গাছ। দিনে দিনে সেটি পরিণত হলো। শিশিরভেজা এক মৌসুমে তার শাখায় শাখায় ফুটল মিষ্টি সৌরভ ছড়ানো শুভ্র ফুলের রাশি। কিন্তু ফুলগুলো ফুটল রাতের নিভৃতে আর ঝরে পড়ল দিনের আলো ফোটার আগেই। যেন সূর্যের আলো তাকে স্পর্শ করতে না পারে। নিশুতির এই ফুলটিই হলো শিউলি বা শেফালি। উপকথানুযায়ী, শিউলির জন্মবৃত্তান্ত এ রকমই।
শিউলি না ফুটলে শরতের শুভ্রতা যেন অপূর্ণই থেকে যায়। তার সুবাসে সৌন্দর্যে মুগ্ধ রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, ‘শরত্ প্রাতের প্রথম শিশির প্রথম শিউলি ফুলে।’ শুধু কি এই? ‘ওগো শেফালি বনের মনের কামনা’, ‘হূদয় কুঞ্জবনে মঞ্জুরির মধুর শেফালিকা’, আমরা বেঁধেছি কাশের গুচ্ছ/আমরা গেঁথেছি শেফালি মালা’, ‘শিউলি-সুরভিত রাতে, বিকশিত জ্যোত্স্নাতে’, ‘সকল বন আকুল করে শুভ্র শেফালিকা’—কবিগুরুর এমন অজস্র পঙক্তি বাংলা সাহিত্যকেও সুবাসিত করে রেখেছে।
কিন্তু আমাদের মনের আকাশ জুড়ে কেবলই অস্থিরতা। আমাদের শরতের শোভা দেখার অবকাশ নেই। নেই কাশফুল আর শিউলি নিয়ে কাব্য করার অবসর। আমরা মেতে আছি আমাদের চিরাচরিত ঝগড়া-বিবাদ আর সংঘাতমুখর রাজনীতি নিয়ে। আমাদের রাজনীতিতে বিরোধ মীমাংসার কোনো লক্ষণ নেই। উত্তাপ কমার কোনো আভাষ নেই। বরং ‘কী হয়’ ‘কী হয়’ পরিস্থিতি প্রলম্বিত হতেই থাকে। দিগন্তের কোনো এক কোণে যদি একটু সম্ভাবনার রেখা ফুটে উঠে তো তিনদিক থেকে গাঢ়-ঘন মেঘ আমাদের চরাচরকে অন্ধকারে ঢেকে দেয়। দিনের পর দিন বছরের পর বছর এমন ধারাই চলছে। রাজনীতিতে সুবাতাস বওয়ার আশায় আমরা প্রতিদিন অপেক্ষা করি। কিন্তু ঝড়ো হাওয়া ছাড়া তেমন কিছুর সন্ধান আমরা তেমন পাই না।
বর্তমান সরকারের ক্ষমতার মেয়াদ যত কমছে, দেশে নির্বাচনী আমেজ ততই বেড়ে চলছে। এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে সংঘাতের আশঙ্কা। প্রধানমন্ত্রী এবং বিরোধী দলীয় নেত্রী বিভিন্ন স্থানে সভা-সমাবেশ করছেন। একে-অপরের সমালোচনা করছেন। সাধারণ মানুষের কাছে নিজ নিজ দল ও জোটের পক্ষে ভোট চাইছেন। ক্ষমতায় গেলে তারা কী কী করবেন, তেমন ফিরিস্তিও তুলে ধরছেন। সব মিলিয়ে একটা ইতিবাচক রাজনৈতিক আবহই আমরা দেখতে পাচ্ছিলাম। কিন্তু আগামী নির্বাচনটা কীভাবে, কোন ব্যবস্থাপনায় অনুষ্ঠিত হবে—এ নিয়ে দলগুলোর মধ্যে বিরোধ প্রায়ই কটূ গালাগালে পরিণত হচ্ছে। পারস্পরিক এই বাকযুদ্ধের পরিণতিতে একটা রক্তক্ষয়ী পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।
ইতিমধ্যে বিরোধী দলের নেতা জয়নুল আবেদীন এমপি আগামী ঈদের পর সর্বাত্মক যুদ্ধ হবে বলে সরকারি দলের বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। বিরোধী দলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়াও বিভিন্ন সভা-সমাবেশ থেকে ‘উস্কানিমূলক’ বক্তব্য দিয়ে চলেছেন। তাঁর গলা ক্রমেই চড়া হচ্ছে। রংপুরের এক সমাবেশে তিনি বলেছেন, ‘আমি ভোট চাইতে আসিনি। ভোট রুখতে এসেছি। আওয়ামী লীগের পাতানো ভোট রুখতে হবে।’ তিনি আরও বলেছেন, ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া দেশে কোনো নির্বাচন হতে দেয়া হবে না’। অথচ রংপুরসহ উত্তরবঙ্গ সফরের আগে বেগম জিয়ার কণ্ঠ ছিল যথেষ্টই নমনীয়। রংপুর রওনা দেয়ার আগে তিনি বলেছিলেন, ‘আমাদের চাওয়া খুব সাধারণ। নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তর।’ বিরোধী দলের নেত্রীর সুর এমন পালটে গেল কেন? রংপুরের বক্তব্যের মধ্য দিয়েই কী তিনি তবে ‘নতুন ধারা রাজনীতি’র বক্তৃতা শুরু করলেন?
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে উদ্দেশ করে খালেদা জিয়া বলেছেন, ‘আপনাকে মানার প্রশ্ন আসে না। আপনি দলীয় প্রধান। আপনার অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন হবে না। আপনাকে বিদায় নিতে হবে। মানে মানে সরে পড়ুন, না হলে পালাবার পথ পাবেন না।’
বেগম জিয়ার এধরনের বক্তব্য তার দল ও জোটের কর্মী সমর্থকদের চাঙ্গা করতে পারে, কিন্তু দেশের ভবিষ্যত্ গণতান্ত্রিক সমাজ বিনির্মাণের পক্ষে মোটেও সহায়ক হবে বলে মনে হয় না। দেশের মানুষ আমাদের নেতানেত্রীদের কাছ থেকে মার্জিত-দায়িত্বশীল বক্তব্যই আশা করেন। আর বেগম খালেদা জিয়ার তো সাধারণ জনগণের মধ্যে ‘বাহুল্য এবং কটূ কথা না বলা’র একটা ইমেজ রয়েছে। কাজেই তাঁর কাছে মানুষের প্রত্যাশা আরও বেশি। তিনি শুধু দুইবারের প্রধানমন্ত্রীই নন, জাতীয় সংসদের বিরোধী দলীয় নেত্রীও বটে। সংসদীয় গণতন্ত্রে সংসদ নেত্রী এবং বিরোধী দলীয় নেত্রী সমান গুরুত্বপূর্ণ। দু’জনেই সরকারের অংশ। ‘সরকারের অংশ’ হয়ে সরকারের বিরুদ্ধে হুঙ্কার ছাড়া কী শোভন? রাজনীতি-বিশ্লেষকদের মতে, তিনি যেভাবে হুমকি-ধমকি দিচ্ছেন, ধমকের সুরে কথা বলছেন, তা কোনো মতেই সংসদীয় গণতন্ত্রের রীতি-ঐতিহ্যের সঙ্গে মানানসই নয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতির দাবি তিনি তুলতেই পারেন। কিন্তু ‘নির্বাচন হবে না, নির্বাচন হতে দেয়া হবে না’—এ ধরনের কথা তিনি বলতে পারেন না। বর্তমান সংবিধান মতে, নির্ধারিত সময়ে নির্বাচন আয়োজন করা, সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন পরিচালনা করা ক্ষমতাসীনদের দায়িত্ব। সেই সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনে বাধা দেয়া, হুমকি দেয়া, ‘প্রতিহত’ করার ঘোষণা দেয়া সংবিধান ও রাষ্ট্রের বিরোধিতা করার শামিল। একজন দায়িত্বশীল বিরোধী দলীয় নেত্রী কী এটা করতে পারেন?
নির্ধারিত সময়ে নির্বাচন আয়োজন করা ক্ষমতাসীনদের সাংবিধানিক দায়িত্ব। আর নির্বাচনে ভোট দেয়া নাগরিকদের সাংবিধানিক অধিকার। এই অধিকার প্রয়োগ নিশ্চিত করার দায়িত্ব ক্ষমতাসীনদের, যারা সংবিধানের নির্দেশ মতেই পরবর্তী নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্বে থাকবেন। আর সংবিধান অনুযায়ী দেশের প্রতিটি নাগরিকের অধিকার সমান। তাই যদি হয়, তাহলে বেগম খালেদা জিয়া যারা নির্বাচন করতে চাচ্ছেন, যারা ভোটাধিকার প্রয়োগে প্রস্তুত, তাদের নাগরিক অধিকারে কী বাধা সৃষ্টি করছেন না? এটা কী তিনি করতে পারেন? না তাই করা উচিত? ভোট ‘রুখতে’ চাওয়া কোনো মতেই সাংবিধানিক অধিকার নয়। যা সংবিধান সম্মত নয়, তা রাষ্ট্রবিরোধী, একই সঙ্গে আইন বিরোধীও বটে। দেশের প্রধান বিরোধী দলের নেত্রী কী এভাবে প্রকাশ্যে সংবিধান ও আইনবিরোধী বক্তৃতা দিতে পারেন? দায়িত্বশীলতা বলে কী আমাদের দেশে কিছুই থাকবে না। তিনি নির্বাচন বর্জন করতে পারেন, নাগরিকদের ভোট প্রত্যাখ্যানের আহবান জানাতে পারেন, কিন্তু কোনো মতেই অন্যের সাংবিধানিক অধিকারে বাধা সৃষ্টি করতে পারেন না। এ ধরনের নৈরাজ্যপ্রবণ বক্তব্য ফ্যাসিবাদী মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ নয় কী?
রাষ্ট্রের কর্মচারী ও পুলিশদেরও তিনি ‘ক্ষমতাসীনদের আদেশ-নির্দেশ পালন না করার’ কথা বলছেন। বিরোধী দলীয় নেত্রীর এই বক্তব্যও কতটা সংবিধানসম্মত তা ভেবে দেখার অবকাশ রয়েছে। সংবিধান মতে, সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনকারীরা সরকার গঠন করবে। সরকারের মেয়াদ শেষ না হওয়া পর্যন্ত রাষ্ট্রের কর্মচারী ও পুলিশরা সরকারের আদেশ-নির্দেশ মেনে চলতে বাধ্য। বিরোধী দলের কথামত যদি রাষ্ট্রের কর্মচারী ও পুলিশরা ক্ষমতাসীনদের কথা না শোনে, দেশে যদি ব্যাপক গোলযোগ ও নৈরাজ্য দেখা দেয়, এতে যদি নাগরিকদের জানমালের ব্যাপক ক্ষয়-ক্ষতি হয়, তাহলে তার দায়িত্ব কে নেবেন? বিরোধী দলীয় নেত্রী এমন অপরিণামদর্শী মন্তব্য কী করে করলেন? আমরা সরকারের জবাবদিহিতার ব্যাপারে সোচ্চার হই, কিন্তু বিরোধী দল এবং বিরোধী দলীয় নেত্রীর কথা আর কাজের কী কোনো রকম জবাবদিহিতা থাকবে না? তাহলে আমরা কীভাবে গণতান্ত্রিক সমাজ নির্মাণ করবো?
বর্তমান ক্ষমতাসীনদের নিশ্চয়ই অনেক অনেক খারাপ কাজ, ব্যর্থতা, অনেক ‘পাপ’ রয়েছে। সেগুলোর সমালোচনা করা, খারাপ উদ্যোগের প্রতিবাদ করা বিরোধী দলের দায়িত্ব। কিন্তু বিরোধিতার নামে যদি অসাংবিধানিক, অগণতান্ত্রিক, অসংযত বাক্য ব্যবহার করা হয়, নৈরাজ্যকে উস্কে দেয়া হয়, তাহলে সেই বিরোধী দলের মূল্যায়ন আমরা কীভাবে করবো? নাকি বিরোধী দল বলে তাদের ‘সাত খুন মাফ’ করে দেয়া হবে?
যে কোনো মূল্যে ক্ষমতায় যাওয়া, হানাহানি, প্রতিশোধ ও প্রতিহিংসার রাজনীতিকে আমন্ত্রণ জানানো, অন্যদিকে যে কোনো উপায়ে ক্ষমতা আঁকড়ে থাকার অশুভ প্রবণতা গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রাকেই শুধু ব্যাহত করছে না, আমাদের ভবিষ্যেক অন্ধকারের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের বীরভূমে এক শ্রাদ্ধের কাহিনী প্রচলিত আছে। আমাদের অবস্থাটা যেন সেই শ্রাদ্ধের মতো। বীরভূমের এক কৃষক-পিতা পরলোকে গেলেন। তার শ্রাদ্ধ হবে। পুরোহিত কৃষকবধূকে বলে গেলেন, উঠোনের কিছুটা জায়গা পরিষ্কার করে রাখবে, কাল সকালে শ্রাদ্ধ হবে। কৃষকবধূ পুরোহিতের নির্দেশমতো বাড়ির সামনের কিছুটা জায়গা নিকিয়ে, পরিষ্কার করে রাখলেন। সেখানেই শ্রাদ্ধ হবে। যথাসময়ে পুরোহিত এলেন। নিখুঁত আয়োজন। সামনে কাছাগলায় যজমান কৃষক। পূজো-আচার নিয়ম-কানুন কিছুই তার জানা নেই। পুরোহিত যেমন বলবেন, তেমনই বলতে হবে। এইটুকুই শুধু তার জানা। কিন্তু এই জানায় একটা মহা-বিপত্তি দেখা দিল। পুরোহিত ভদ্রলোক ছিলেন তোতলা। তিনি প্রথমেই বললেন, ব ব বল ব্যা ব্যাটা তো তোর বা বাপের না নাম বল। কৃষক অমনি বললে, ব ব বল ব্যা ব্যাটা তো তোর বা বাপের না নাম বল। পুরোহিত বললেন, উ উ উ লয়, বা বা বা পের নাম। কৃষকও বললেন, উ উ উ লয়, বা বা বা পের নাম। পুরোহিত ভাবলেন, কৃষক যজমান হয়তো তাকে ব্যঙ্গ করছে। কাজেই মারলেন এক চড়। আকস্মিক চড় খেয়ে হতচকিত কৃষক কিছুটা ধাতস্থ হয়ে পুরোহিতের গালেও পাল্টা এক চড় কষিয়ে দিল। আর যায় কোথা! দু’জনের মধ্যে শুরু হয়ে গেল ধস্তাধস্তি। চড়াচড়ি, মারামারি। দুইজন ঝটাপটি করতে করতে, গড়াতে গড়াতে পাশের নর্দমায় গিয়ে পড়ে।
কৃষকবধূ দাওয়ায় বসে সব দেখছিল। শ্বশুরের শ্রাদ্ধ বেশ জমেছে! দু’জনকে নর্দমায় গড়িয়ে পড়তে দেখে আপন মনে বলে উঠল, আই বাপ, শ্রাদ্ধ অ্যাদদূর গড়াবে জানলে আর একটু লিকিয়ে রাখতুম!
বীরভূমের ওই শ্রাদ্ধের মতো আমাদের গণতন্ত্রের ভবিষ্যত্ বা ‘নির্বাচন-শ্রাদ্ধ’ কতদূর গড়াবে কে জানে?
লেখক :কলামিস্ট
