দেশব্যাপী আয়কর মেলা চলিতেছে। খুব বেশিদিন হয় নাই এই ধরনের মেলা আয়োজনের। তবে ইহা অব্যাহতভাবে অনুষ্ঠিত হইতেছে দেখিয়া মনে হওয়াই স্বাভাবিক যে, মেলার উদ্দেশ্য পূরণ হইতেছে। মানুষের নিকট হইতে করের নামে টাকা আদায় করিবার একটি কৌশল হিসাবে রাজস্ব প্রশাসনের বিজ্ঞ ব্যক্তিরা এই মেলা আয়োজনের উদ্যোগ লইয়াছে। যেমনিভাবে আমরা দেখিতে পাই বিভিন্ন পণ্যের মেলা বসানো হইতেছে। মেলা করিয়া পণ্যের পসরা সাজাইয়া বেশি বিক্রি ও বেশি লাভ করিবার ফন্দি করিয়া থাকে ব্যবসায়ীরা। সাধারণ মানুষকে তথাকথিত ‘ছাড়ে’র নামে প্রলুব্ধ করিয়া থাকে। সেই ধারণা হইতেই সম্ভবত রাজস্ব প্রশাসনও কর মেলার আয়োজন করিবার উদ্যোগ নিয়াছে। ইহার ফলে মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়িবে। মানুষ কর দিবে। সেই করের টাকায় সরকার দেশ পরিচালনা করিবে। যদিও রাজস্ব আদায়ের সিংহভাগ অর্থই চলিয়া যায় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন দিতে গিয়া। তাহাদের উভয়ভাবেই লাভ। বেতনের বাহিরেও করদাতাদের নিকট হইতে তাহারা বাড়তি আয় করিয়া থাকেন- ইহা সকলেরই জানা।
রাজস্ব আদায়ের অন্যতম খাত আয়কর। প্রত্যক্ষ এই কর আদায় লইয়া বিভিন্ন মহলের মধ্যে নানান মতভেদ রহিয়াছে। উন্নয়ন সহযোগিতার নামে যাহারা আমাদেরকে ‘প্রেসক্রিপশন’ দিয়া থাকেন, তাহাদের প্রতিনিধিরা হরহামেশাই বলিয়া থাকেন যে, আমাদের কর জিডিপির অনুপাত খুবই সামান্য। কর জিডিপির অনুপাত হইতেছে মোট জাতীয় প্রবৃদ্ধির কত ভাগ কর আদায় হইতেছে তাহাই। ইহা দীর্ঘদিন ১০ শতাংশের নিচে ছিল। এখন ১২ শতাংশের বেশি হইয়াছে। আমাদের অর্থমন্ত্রী মহোদয়ের জন্য ইহা সুখপ্রদ যে, তিনি ঐসব উন্নয়ন সহযোগীদের বলিতে পারেন আমাদের কর জিডিপির অনুপাত বাড়িতেছে। যদিও কেহ কেহ বলিয়া থাকেন, এই হার আরও বাড়িত যদি না কর কর্মকর্তারা মাসোহারা না লইয়া পুরাটাই সঠিক হিসাবের মাধ্যমে সরকারের ঘরে জমা করিতেন। তদুপরি, বিশ্বায়নের যুগে পর্যায়ক্রমে আমাদেরকে প্রত্যক্ষ করের দিকে ঝুঁকিতে হইবে। সেই হিসাবে নাগরিক মাত্রই (যিনি আয় করেন) আয়কর দেয়া সমীচীন। কিন্তু আমাদের দেশে করভীতি এখনও কাটানো যায় নাই। কর দেওয়ার কথা উঠিলে কর কর্মকর্তাদের যেই চেহারা মানুষের সামনে ফুটিয়া উঠে তাহাই কর প্রদান হইতে মানুষকে পিছাইয়া রাখার মূল কারণ। তাহারা ভুলিয়া যায় যে, তাহারা এমন এক দেশের নাগরিক যেই দেশের সংবিধানে নাগরিকদের সকল মৌলিক সুবিধার কথা রাষ্ট্র কর্তৃক নিশ্চিত করিবার কথা রহিয়াছে। কিন্তু সেই সকল মৌলিক সুবিধাগুলি এই দেশের নাগরিকরা পান কি না, তাহা বলিবার অপেক্ষা রাখে না। উন্নত দেশের জনগণ আগ্রহ লইয়া কর দিয়া থাকে। কারণ সে জানে তাহার আয় না থাকিলে রাষ্ট্রই তাহার ব্যয়ভার নির্বাহ করিয়া চালাইয়া নিবে। কিন্তু আমাদের দেশে তাহা কল্পনাতীত।
এই দেশে ভ্যাট-ট্যাক্সের নামে জনগণকে যেইভাবে জিম্মি করিয়া টাকা নেওয়া হয়, বিশ্বের কোথাও এত উচ্চ হারে তাহা করা হয় না। এইখানে সর্বনিম্ন করের স্তর নির্ধারণ করা হইয়াছে ২ লাখ ২০ হাজার টাকা। এই শহরে বসবাসকারী একজন নাগরিক যত আয় করিলে সেই করস্তরে পড়িবে, তাহা কি তাহার জীবন ধারণের জন্য যথেষ্ট? শুধু শুধু করদাতার সংখ্যা বাড়াইয়া সময় ও কাগজের অপচয় করিবার দরকার কী? তাহা ছাড়া এই দেশে অগ্রিম আয়কর নেওয়া হয়। তাহাও যুক্তিযুক্ত নহে। একজন লোক তাহার ব্যবসায় লাভ করিবে নাকি লোকসান করিবে তাহার নিশ্চয়তা নাই। কিন্তু তাহাকে আগেই কর দিতে হইবে। এইখানেইতো পণ্যমূল্য একধাপ বাড়িয়া গেল। ঐ ব্যবসায়ী মুনাফা করিলেও ইহা কিন্তু জনগণের পকেট থেকেই যাইবে। সুতরাং করভারে পিষ্ট এই জনসাধারণকে বিনিময়ে মৌলিক সুবিধাগুলি ঠিকমত দেওয়া হইতেছে কি না, তাহাও ভাবিয়া দেখা দরকার।
