বর্তমানে বাংলাদেশে ইলেকট্রনিক মিডিয়া যথেষ্ট বিকশিত হয়েছে। ডিসএন্টেনার কল্যাণে প্রত্যন্ত গ্রাম-গঞ্জেও এখন চ্যানেলগুলি দেখতে পাওয়া যায় পরিষ্কারভাবে। বিশেষত বেসরকারি টেলিভিশনগুলি বৈচিত্র্যপূর্ণ অনুষ্ঠান নির্মাণ ও প্রচারে এক বিপ্লব সৃষ্টি করেছে। এই ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার অন্যতম জনপ্রিয় অনুষ্ঠান হচ্ছে টকশো। অনেকে গভীর রাত পর্যন্ত এই টকশো দেখার জন্য ব্যাকুল থাকেন তাদের রাতের ঘুম হারাম করে হলেও। বাংলাদেশ যে বদলে যাচ্ছে এই হলো তার অন্যতম নজির।
সমপ্রতি এরকমই এক টকশো অনুষ্ঠানে একজন বিদগ্ধ আইনজ্ঞ ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা বলেছেন যে, বর্তমানে আমাদের যে সংবিধান রয়েছে তার নজির পৃথিবীর আর কোন দেশে নেই। কোন গণতান্ত্রিক দেশে সংসদ বহাল রেখে নির্বাচন হয় না। এরপরই তিনি বলেছেন যে, বাংলাদেশে এখন যে রাজনৈতিক ব্যবস্থা বিদ্যমান তাকে গণতন্ত্র বলা যায় না। এর নাম রাজতন্ত্র। কিন্তু আমাদের জানা উচিত রাজারা কখনো নির্বাচিত হন না। তারা উত্তরাধিকার সূত্রে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসীন হন। সুতরাং তিনি সঠিক বলেছেন এমনটি মনে করার কোন কারণ নেই।
ঊনবিংশ শতাব্দীর দিকে পৃথিবীতে রাজনৈতিক পদ্ধতি হিসেবে রাজতন্ত্রই অধিক প্রচলিত ছিল। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ও যুগের পর যুগ একটি পরিবারই দেশ শাসন করতো। তবে বর্তমান আধুনিক পৃথিবীতে সর্বত্র গণতন্ত্রের জয়জয়কার। এরচেয়ে ভাল শাসন পদ্ধতি আজও আবিষ্কৃত হয়নি। রাজতন্ত্র বর্তমান জামানায় বলতে গেলে জাদুঘরে চলে গেছে। ইউরোপসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এখন যে রাজতন্ত্র নামকাওয়াস্তে চালু আছে তার আসল নাম কনসটিটিউশনাল মোনার্কি বা সাংবিধানিক রাজতন্ত্র। এই ব্যবস্থায় রাজার ক্ষমতা খুবই সীমিত। এমনকি কোন কোন রাজার ক্ষমতা বলতে কিছুই নেই। কমনওয়েলথভুক্ত ১৬টি দেশসহ বর্তমানে ৪৪টি দেশে এই ধরনের সীমিত আকারের রাজতন্ত্র আছে। তন্মধ্যে কম্বোডিয়া, জাপান, জর্ডান, মালয়েশিয়া ও মরোক্কোর রাজারা শাসনই করেন না (not rul)। তবে ব্রুনাই, ওমান, কাতার, সৌদি আরব ও সুইজারল্যান্ডের রাজারা অধিক রাজনৈতিক প্রভাব রাখেন। এখন প্রশ্ন হল, বাংলাদেশে কি এরকমও কোন রাজতন্ত্র আছে?
আসলে যিনি বলেছেন বাংলাদেশে রাজতন্ত্র আছে, তার কথাকে সংশোধন করে বলতে চাই, এই দেশে কোন রকমের রাজতন্ত্র থাকলে তার নাম নির্বাচিত রাজতন্ত্র। ভারতীয় উপ-মহাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাজনীতিতে কোন কোন পরিবারের প্রভাব ও প্রতিপত্তি রয়েছে। এর মানে এই নয় যে, এর নাম রাজতন্ত্র। ভারতে গান্ধী, পাকিস্তানে ভুট্টো এবং বাংলাদেশে শেখ ও জিয়া পরিবারের রাজনীতিতে ব্যাপক জনসমর্থনকে আর যাই হোক রাজতন্ত্র বলার কোন অবকাশই নেই। কেননা এসব পরিবারের সদস্যরা নির্বাচনে জয়লাভ করেই সরকার গঠন করেন। এখন জনগণ কেন তাদেরকে বারবার ভোট দেয় সেই প্রশ্ন উঠতে পারে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে যারা এই প্রশ্ন করছেন তারা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করলে লাল্লু-ফাল্লুর কাছেও হেরে যান। জামানত বাজেয়াপ্ত হয় বারবার। তাই আমরা তাদের মনের ক্ষেদটা ভালমতই বুঝি।
২০০৭-০৮ সালে যারা বাংলাদেশের শাসন ক্ষমতায় ছিলেন, তারা তথাকথিত সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারে কাজ করেছেন। এই সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কোন দৃষ্টান্ত কি আফ্রিকা, ল্যাটিন আমেরিকাসহ এই দুনিয়ায় আরেকটি আছে? তিন মাসের জন্য ক্ষমতায় এসে দিব্যি দুই বছর থাকা কি গণতন্ত্র ও আইনসম্মত ছিল? তত্কালীন প্রেসিডেন্ট ইয়াজ উদ্দিন আহমেদ এক পর্যায়ে নিজেই প্রেসিডেন্ট ও তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধানের পদ অলংকৃত করলেন। এমন ঘটনা আর কোথাও কি ঘটেছে? দেখা গেল মাঝির চাইতে মাঝির নৌকার দাপটই বেশি। ফলে ফল যা হওয়ার তাই হলো। একটি অনুষ্ঠান থেকে ডেকে এনে পদত্যাগ করতে বাধ্য করা হল। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের এজেন্ডা যে ভিন্ন ছিল, তা এই দেশের ‘ব্লাডি সিভিলিয়ান’ রা যথাসময়ে বুঝতে পারেন নি।
বর্তমানে টেলিভিশনের টকশোতে তিনি বা তারা যা বলতে পারছেন অবলিলায়, তা সেই সময় বলা দুষ্কর ছিল। বরং টকারদের একটি লিস্ট বা তালিকা ধরিয়ে দেয়া হতো। এখন বড় বড় কথা বলা সম্ভব হচ্ছে। এটাই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। সামরিক সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক ও গণতান্ত্রিক সরকারের মধ্যে গুণগত পার্থক্য। একে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদারতাও বলা যায়। যদিও তিনি মাঝেমধ্যে ওয়ান ইলেভেনের সমালোচনায় মুখর হন অথচ ঐ দুই বছরের সুশাসন বা কুশাসন নিয়ে সংসদে আলাপ-আলোচনা করতে দেন না। রূপকথার ন্যায় বলা হয় যে, সে আমলে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ছিল। অথচ রায় যাতে পক্ষে যায় এজন্য মেজর-কর্ণেলরা কোর্ট-কাছারিতে বসে থাকতেন। একজন স্বনামধন্য রাজনীতিকের চরিত্রে কালিমা লেপনের জন্য হাস্যকরভাবে মদের মামলা দায়ের করা হয়। বিচারক যখন সেই মামলায় খালাস দিতে যাবেন এমন সময় ক্রিং ক্রিং করে বেজে ওঠে তার টেলিফোন। তিনি খাস কামরা থেকে বের হয়ে মুখ কালো করে পাঁচ বছরের জেল দিয়ে দিলেন। তখন কারা তাকে ফোন করেছিলেন? এরপরও কি আমরা বলবো সেসময় বিচার বিভাগ স্বাধীন ছিল? তখন আয়-ব্যয়ের হিসাব মিলে নাই। এখন মিলছে কিভাবে?
যারা ডাণ্ডা দিয়ে দেশ শাসন করেছেন, তাদের মুখে গণতন্ত্রের মধুর বাণীও শোভা পায় না। সেই কুংফু কারাতের পর যেদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানিত শিক্ষকদের চোখ বেঁধে গ্রেফতার করে নিয়ে যাওয়া হয়, সেদিন এসব কোর্ট-টাই (গলায় দড়ি) পরা গণতন্ত্রপ্রেমিরা কোথায় ছিলেন? যারা গতানুগতিকভাবে চিন্তা করেন, তারা হয়তো বলবেন খারাপ সময় যাচ্ছে, সামনে আরো খারাপ দিন আসছে ইত্যাদি। তার অর্থ এই নয় যে, তারা যথার্থ ছিলেন। তার অর্থ এই নয় যে, আমাদের কোন ভূত-ভবিষ্যত্ নেই। তবে ঐ রকম টকশোঅলাদের আর কোন ভবিষ্যত্ যে নেই সে সম্পর্কে আমাদের কোন সন্দেহ নেই। কেননা তৃতীয় বিশ্বে মহাশক্তিধররা কাউকে একবারের জায়গায় দুবার ব্যবহার করেন না।
সুতরাং বাংলাদেশে কোন রাজতন্ত্র নেই । এখানে আছে নির্বাচিত রাজা। আজ যিনি প্রধানমন্ত্রী বা এর আগে যিনি একই পদে সমাসীন ছিলেন তাদের হওয়ার কথা ছিল রাণী। রাজতন্ত্রের এটাই নিয়ম। কিন্তু তারা ভাগ্যগুণে রাজা হয়ে গেছেন এই তো। এজন্য তকদির লাগে। অতএব, এখানে আফসোসের কিছু নেই।
লেখক : সাংবাদিক
[email protected]
