সমপ্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক সেমিনারে বিশিষ্টজনেরা বলিয়াছেন যে, দেশে নির্বাচন লইয়া যেই সংশয় তৈরি হইয়াছে রাজনীতিকরা তাহার দায় এড়াইতে পারিবেন না। শুধু এইটুকু বলিয়াই তাহারা ক্ষান্ত হন নাই, বরং রাজনীতিকদের এই মর্মে সতর্ক করিয়া দিয়াছেন যে, এই সংকট নিরসনে তাহারা ব্যর্থ হইলে অন্যরা ইহার সুযোগ গ্রহণ করিবে। দখল করিয়া লইবে তাহাদের স্থান। এই ‘অন্যরা’ কাহারা তাহা স্পষ্ট করিয়া বলা না হইলেও সমাজের এই বিদগ্ধ ব্যক্তিরা কী ইঙ্গিত করিতেছেন— তাহা মোটেও অস্পষ্ট নহে। সভা-সেমিনার ও টেলিভিশনের টকশোগুলিতে প্রতিনিয়ত যেইভাবে রাজনীতি ও রাজনীতিকদের হেয়প্রতিপন্ন করা হইতেছে তাহাতে অস্পষ্টতার এই আবরণটুকুও বাহুল্য হইয়া পড়িয়াছে। গণতন্ত্রের জন্য গুণীজনদের উদ্বেগ থাকা খুবই স্বাভাবিক। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে উদ্বেগকেও ছাপাইয়া উঠিতেছে বিদ্বেষমূলক এক মানসিকতা— যাহা দুর্বিনীত শুধু নহে, আত্মঘাতীও বটে। আর এই বিদ্বেষের বিষে শুধু যে নির্বাচিত রাজনীতিকরাই জর্জরিত হইতেছেন এমন নহে, বরং গোটা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করিয়া তোলা হইতেছে সুকৌশলে। একই সাথে প্ররোচিত করা হইতেছে অগণতান্ত্রিক শক্তিকে। কথিত একশ্রেণির গুণীজনের এই প্রবণতা যে আকস্মিক নহে— বিগত সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উত্থান ও উত্থান-পরবর্তী দিনগুলিতে তাহাদের তত্পরতাই ইহার অকাট্য প্রমাণ হিসাবে উত্থাপিত হইতে পারে। বস্তুত সুযোগ পাইলেই গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে হেয় করা তাহাদের মজ্জাগত অভ্যাসে পরিণত হইয়াছে। উদ্বেগের বিষয় হইল, অতীতের মতো এইবারও নির্বাচন যতো নিকটবর্তী হইতেছে, এই অসুস্থ প্রবণতাও যেন ততো বৃদ্ধি পাইতেছে।
সচেতন ও দায়িত্বশীল নাগরিক সমাজ যে গণতন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক শক্তি— তাহা বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত। তাহাদের গঠনমূলক সমালোচনা ও মতামত যে গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করে, তাহা লইয়াও দ্বিমত নাই। কিন্তু বিদ্যমান রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি ঢালাওভাবে অবজ্ঞা প্রকাশের পাশাপাশি প্রতিনিয়ত ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দলের দুই শীর্ষ নেত্রী সম্পর্কে যেইসব মন্তব্য করা হইতেছে তাহাতে সেই গঠনমূলক সমালোচনা ও দায়িত্বশীলতার লেশমাত্রও খুঁজিয়া পাওয়া কঠিন। আর সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সেই দুঃসহ দিনগুলিতে তাহারা যাহা বলিয়াছেন এবং করিয়াছেন, সেইসব তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা নাইবা বলিলাম। ভুলিয়া গেলে চলিবে না যে, আমরা স্বাধীনতা পাইয়াছি মাত্র চারদশক আগে। তন্মধ্যে প্রায় অর্ধেক সময়ই অতিক্রান্ত হইয়াছে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ স্বৈরশাসনের থাবার নীচে। আমাদের গণতন্ত্র শুধু যে বয়সে ও অভিজ্ঞতায় নবীন তাহাই নহে, সামগ্রিক পরিস্থিতিও গণতন্ত্রের জন্য খুব একটা অনুকূল বলা যাইবে না। তাহা সত্ত্বেও দুঃসহ দারিদ্র্য, নিরক্ষরতা এবং চরম অসহিষ্ণুতার মতো কঠিন সব বাধা অতিক্রম করিয়া গণতন্ত্র আগাইয়া যাইতেছে। পরপর একাধিক নির্বাচিত সরকার মেয়াদ পূর্ণ করিয়াছে। গুণীজনরা যাহা ইচ্ছা তাহা বলিবার সুযোগও পাইতেছেন। অতএব, তাহাদের এতো অধৈর্য হইবার কী আছে— তাহা আমরা বুঝিতে অক্ষম। তাহারা যেই ধরনের গণতন্ত্রের জন্য মায়াকান্না করিতেছেন, পৃথিবীর কোথায় রাতারাতি তদ্রূপ গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হইয়াছে সেই প্রশ্নও তোলা যায়। এখন কথায় কথায় যেইসব গণতন্ত্রের উদাহরণ তুলিয়া ধরা হয়, বর্তমান অবস্থায় আসিবার জন্য তাহাদের কতো দীর্ঘ রক্তাক্ত পথ পাড়ি দিতে হইয়াছে— তাহা কাহারো অজানা নহে। জানা কথা যে, গণতন্ত্র একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া এবং সেই প্রক্রিয়াকে সফল করিতে হইলে ধৈর্য ও সহিষ্ণুতার কোনো বিকল্প নাই।
