পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান

আপডেট : ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ২১:৩৪
প্রতি বছরই বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা বিশ্বের বিশ্ববিদ্যালয়গুলির র্যাংকিং প্রকাশ করিয়া থাকে এবং সেই তালিকায় বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলির নাম খুঁজিয়া পাওয়া যায় না। এমনকি সেই তালিকায় দেশের শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম লজ্জাজনকভাবে নিচের দিকে থাকে। ফি বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান নিচের দিকে নামিতেছে। ইহা লইয়া দেশবাসীর দুঃখের সীমা থাকে না। শিক্ষাই যদি জাতির মেরুদণ্ড হইয়া থাকে, তবে আমাদের মেরুদণ্ডের অবস্থা বড়ই দুর্বল ও নড়বড়ে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে দেশের নীতিনির্ধারকদের ভ্রান্ত ধারণা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে প্রশাসকদের হীন দলীয় সংশ্লিষ্টতাকে ইহার জন্য দায়ী করা যাইতে পারে। নীতিনির্ধারকদের অনেকেই মনে করিয়া থাকেন যে, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়সমূহে বিপুল ভর্তুকি প্রদান করা অর্থ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা হওয়া রাজস্বের অপচয়। অন্যদিকে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলি হইতেই সরকারবিরোধী আন্দোলনগুলি শুরু হইয়া থাকে। ফলে সরকারের সঙ্গে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পর্ক অনেকক্ষেত্রে দ্বান্দ্বিক হইয়া পড়ে। কিন্তু এই কথা মনে রাখিতে হইবে যে, রাষ্ট্রযন্ত্র পরিচালনা করিবার জন্য সরকারের দক্ষ মানবসম্পদ প্রয়োজন। আবার গবেষণা ব্যতীত নূতন বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি যেমন হয় না, তেমনি নূতন অর্থনৈতিক-সাংস্কৃতিক বাস্তবতায় দেশ কীভাবে চলিবে তাহার দিক-নির্দেশনাও বিশ্ববিদ্যালয়ই সরকারকে দিতে পারে। অতএব, সরকার তাহার নিজস্ব প্রয়োজনেই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে বিনিয়োগ করিবে এবং ন্যূনতম বেতন-ফির মাধ্যমে সব শ্রেণি ও পেশার মানুষের সন্তানেরা এইখানে পড়ার সুযোগ যেন পায় তাহার ব্যবস্থা করিতে হইবে। কিন্তু তথাকথিত বিশ্বায়ন ও বাজার অর্থনীতির জয়যাত্রার গোলকধাঁধায় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলির পরিচর্যায় মনোযোগের ঘাটতি দেখা যাইতেছে। আমাদের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশ গণতান্ত্রিক চর্চার মাধ্যমেই কেবল অগ্রবর্তী হইতে পারে, আর পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলি হইতে পারে সেই গণতান্ত্রিক ভাবনা ও চর্চার সূতিকাগার। অতীতে ইহা বারবার প্রমাণিত হইয়াছে। বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালগুলির দুর্ভাগ্য যে, জাতির বৃহত্তর রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জগুলির ভার তাহাকে বারবার লইতে হইয়াছে। ফলে দেখা যায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যাবতীয় অর্জন হিসাবে যেইসব সাফল্যের কথা উল্লেখ করা হয়, উহার মধ্যে কোনো বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার কিংবা সামাজিক কোনো তত্ত্বের প্রবর্তন থাকে না, থাকে কিছু রাজনৈতিক সংগ্রামের বিজয়োপাখ্যান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এইসব ফসলে রাজনৈতিক দলগুলির গোলা ভরিয়াছে। একেকটি রাজনৈতিক আন্দোলন সমাপ্ত করিয়া বিশ্ববিদ্যালয় যখন শিক্ষায় মনোযোগী হইতে চাহিয়াছে তখন তাহার ঘাড়ে চাপাইয়া দেওয়া হইয়াছে একেকটি দলীয় প্রশাসনের বোঝা, যেই প্রশাসন কেবল দলীয় এবং ক্ষেত্রবিশেষে গোষ্ঠী বা ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করিতে ব্যস্ত থাকিয়াছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলির সার্বিক মানোন্নয়নে এইসকল প্রশাসনের কোনো পরিকল্পনা, ইচ্ছা ও উদ্যোগ দৃশ্যমান নাই। শিক্ষক রাজনীতির নামে জাতীয় দলীয় রাজনীতির চর্চা বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে সুবিধাবাদের আসর বসিয়াছে। একদিকে স্বল্প বেতন, অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ সম্পদগুলির বিতরণ সম্পূর্ণ দলীয় ভিত্তিতে হইবার কারণে শিক্ষকদের মধ্যেও বঞ্চনাবোধ দানা বাঁধিতেছে এবং গবেষণার সরকারি অনুদানের অনুপস্থিতিতে, ব্যক্তিগত উদ্যোগের শিক্ষা কার্যক্রম ও গবেষণা হইতে শিক্ষকের মনোযোগ সরিয়া যাইতেছে। যতদিন না সরকারগুলি বিশ্ববিদ্যালয়কে রাজনৈতিক বিবেচনার বাইরে আসিয়া স্বায়ত্তশাসিত ও সার্বভৌম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসাবে বিবেচনা না করিবে, বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য বরাদ্দ বাড়াইয়া শিক্ষা ও গবেষণার চারণভূমিতে পরিণত করিবে, ততদিন এইসকল সঙ্কট কাটিবার কোনো সম্ভাবনা থাকিবে না।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন