গতকাল হইতে রাজধানী ঢাকায় ছয়দিনব্যাপী সার্ক হস্তশিল্প প্রদর্শনী শুরু হইয়াছে। স্থান বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী। একাডেমীর চিত্রশালা মিলনায়তনে সংস্কৃতি মন্ত্রী প্রধান অতিথি হিসাবে উপস্থিত থাকিয়া প্রদর্শনী উদ্বোধন করেন। এই প্রদর্শনী শেষ হইবে আগামী ২৭ সেপ্টেম্বর। ইহার যৌথ আয়োজক সার্ক কালচারাল সেন্টার, শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশ সরকারের সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়। এই প্রদর্শনীতে বাংলাদেশ ছাড়াও সার্কভুক্ত আরও চারটি দেশ অংশগ্রহণ করিয়াছে। দেশগুলি হইল- ভারত, পাকিস্তান, ভুটান ও অন্যতম আয়োজক দেশ শ্রীলঙ্কা।
বর্তমানে পৃথিবীতে হাতের তৈরি বিভিন্ন জিনিসপত্রের চাহিদা ও কদর বাড়িতেছে। মানুষের রুচির পরিবর্তন ও সৌখিন মনোভাবের পুনর্জাগরণই ইহার মূল কারণ। তাহাছাড়া দেশীয় ঐতিহ্যের অংশ হিসাবে অনেকের নিকট ইহার সমাদর বৃদ্ধি পাইতেছে। উল্লেখ্য, হস্তশিল্প বলিতে বোঝায় হাতের তৈরি নানাবিধ পণ্য উত্পাদনের ক্ষুদ্রায়তন ইউনিট। সাধারণত গৃহের মালিক নিজে এবং পরিবারের সদস্যদের সহায়তায় বা ১০ জন পর্যন্ত বেতনভুক্ত কর্মচারী নিয়া হালকা যন্ত্র বা কোন যন্ত্রপাতি ছাড়াই এসব পণ্য প্রস্তুত করিয়া থাকেন। এই শিল্প আদি ও মধ্যযুগীয় বাংলার অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তখন প্রসিদ্ধ ছিল বয়ন, ধাতব পদার্থের কাজ, জুয়েলারি, বিশেষ করিয়া রূপার তৈরি অলঙ্কার, কাঠের কাজ, বেত ও বাঁশের কাজ, মাটি ও মৃত্পাত্র। পরবর্তীতে এই শিল্পে পাট ও চামড়া প্রধান কাঁচামাল হিসাবে ব্যবহূত হইতে থাকে। হস্তশিল্পপণ্যে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য, সৌন্দর্য ও নৈপুণ্য বিদ্যমান। ইতিহাস হইতে জানা যায়, গাঙ্গেয় অববাহিকার মসলিন বস্ত্র রোমান এবং গ্রিক সাম্রাজ্য পর্যন্ত পৌঁছাইয়া গিয়াছিল। বর্তমানে চীন হজ্ব মৌসুমে সৌদি আরবে তসবিহ, টুপিসহ বিভিন্ন হস্তশিল্পের পণ্য বাজারজাত করিয়া ব্যাপকভাবে লাভবান হইতেছে। তাই ব্যবসা-বাণিজ্য হয় এমন কিছুতে সংরক্ষণবাদিতার কোন অবকাশ নাই। যেহেতু হস্তশিল্পে আমাদের গৌরবময় ঐতিহ্য আছে, তাই ইহার বিকাশে আরও যত্নবান হওয়া উচিত।
হস্তশিল্প ঘরে ও বাহিরে নানা কাজে ব্যবহূত হয়। ইহা টিকসই ও পরিবেশবান্ধব। কারুশিল্পদের হাতের ছোঁয়ায় তাহা দৃষ্টিনন্দন হইয়া ওঠে। অনেক কুটির শিল্প ও অপ্রচলিত পণ্য হস্তশিল্পেরই অন্তর্ভুক্ত। এজন্য এই শিল্প বিকশিত হইলে রফতানির বাজারও সমপ্রসারিত হইবে। ইহা কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং কোন কোন ক্ষেত্রে অর্থনীতিতে সম্মুখ ও পশ্চাত্-অন্বয়ী সংযোগ শিল্প হিসাবে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখিতেছে। যাহা হউক, চলমান সার্ক হস্তশিল্প প্রদর্শনীতে স্থান পাইয়াছে সিরামিক, পাটজাত পণ্য, জামদানি, কাঁসা-পিতল, টেরাকোটা, বেনারসি, সিল্ক, শোলা, বাঁশ, নকশিকাঁথা, শতরঞ্জি, মৃিশল্প ও কাঠশিল্প ইত্যাদি। সার্ক দেশসমূহের মধ্যে ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিগত মেলবন্ধন সৃষ্টিতে এই ধরনের প্রদর্শনী ব্যাপক ভূমিকা পালন করিবে। সার্ক দেশসমূহের পারস্পরিক উন্নয়নে সামপ্রতিক বত্সরগুলিতে তেমন কার্যকরি কর্মসূচী পরিলক্ষিত হয় না। সার্ক সংগঠনেও এক ধরনের স্থবিরতা বিদ্যমান। তাহার পরও এই প্রদর্শনী এইসব দেশের মধ্যে সহযোগিতা ও সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখিতে অনুঘটক হিসাবে কাজ করিবে বলিয়া আশা করা যায়।
