আহা পেঁয়াজ! কাঁদালে তুমি, হাসালেও। কিনিতে গিয়া যাহার ঝাঁজ চক্ষে জ্বালা ধরায়, তাহারই রঙ্গ-কার্টুন বিষাদে হরষ আনে বটে—একখানি আংটির শীর্ষে হীরক পাথরের পরিবর্তে আসন পাতিয়াছে ছোট্ট একটুকরো পেঁয়াজ। কিংবা, গহনার ছোট্ট বাক্সে স্বর্ণের অলংকারের স্থান লইয়াছে আধখানি পেঁয়াজ। এমন চিত্র দেখিয়া নয়নভরা জলে হাসিতে হয় বৈকি!
পেঁয়াজের দাম কেজিপ্রতি সর্বশেষ দর অনুযায়ী টাকার অঙ্কে সেঞ্চুরি করিয়াছে। তাহাতে অবাক হইবার কি আছে? সব কিছুরই তো জোয়ার ভাটার মতো দাম বাড়ে-কমে। মুশকিল হইল, জোয়ারের পরে ভাটা আসে, কিন্তু ভাটা না আসিয়া যদি বারবার শুধু একপেশে জোয়ারের সয়লাব ঘটে, তবে তাহা বিস্ময়ের কারণ বটে। সেই জোয়ার যদি একসময় স্থিতিশীল হয়, তবে কিছুদিন পর তাহাই গা সওয়া হইয়া ‘স্বাভাবিক’ তকমা পাইয়া যায়। তবে পেঁয়াজের সমস্যা ভিন্ন। বাংলাদেশে বত্সরে ১৮-১৯ লাখ টন পেঁয়াজ উত্পাদনের বিপরীতে দুই-তিন লাখ টন আমদানি করিতে হয়। ফি বত্সর জুলাই মাসের পর হইতে দেশি পেঁয়াজের সরবরাহ হ্রাস পাইলে ভারতীয় পেঁয়াজের চাহিদা বাড়িতে থাকে। কিন্তু এইবার ভারতে অতিবৃষ্টিসহ বিবিধ কারণে পেঁয়াজের বাজার অস্থিতিশীল হইয়াছে, তাহার ঢেউ লাগিয়াছে আমাদের বাজারেও। ভারতের কোনো কোনো রাজ্যে ৮০ হইতে ১০০ রুপীতে বিক্রি হইতেছে প্রতিকেজি পেঁয়াজ। ফলে ভারত পেঁয়াজের রফতানি কমাইয়াছে ৮০ শতাংশের উপরে।
পেঁয়াজ যে শুধুই চোখে জল আনে না, গদিও উল্টাইয়া দিতে পারে—তাহার সাক্ষী ভারতের রাজধানী স্বয়ং। ১৯৯৮ সালে যখন সুষমা স্বরাজ দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী, তখন বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শীলা দীক্ষিতই পেঁয়াজের দাম লইয়া আমজনতার ক্ষোভকে কাজে লাগাইয়াছিলেন। বলা হইয়া থাকে যে, পেঁয়াজের দামের ধাক্কাতেই নাকি সেইসময় দিল্লির রাজ্যসভার গদি হারাইয়াছিল বিজেপি তথা সুষমা স্বরাজ। আর এখন বাংলাদেশে কোরবানির ঈদকে সামনে রাখিয়া চীন হইতেও পেঁয়াজ আমদানির উদ্যোগ লইয়াছে সরকার। পাশাপাশি তুরস্ক এবং পাকিস্তান হইতে পেঁয়াজ আমদানির কথাও ভাবা হইতেছে। তবে প্রতিবেশী মিয়ানমার হইতে পেঁয়াজ আমদানী করিবার উদ্যোগ হালে পানি পায় নাই। কেননা, ট্রেড পলিসি সংক্রান্ত জটিলতায় মিয়ানমার হইতে এলসি (ঋণপত্র) করিয়া কোনো পণ্য আমদানি করা যায় না। টিটি টেলিগ্রাফিক ট্রান্সফার কিংবা বর্ডার ট্রেডের মাধ্যমে মিয়ানমার হইতে কিছু পেঁয়াজ আসিলেও তাহা পর্যাপ্ত নহে।
কিন্তু মুশকিল হইল, কোনো পণ্যের মূল্য একবার ঊর্ধ্বমুখী হইতে শুরু করিলে তাহা লইয়া ফটকাবাজারির পাঁয়তারা চলে। এই সুযোগে প্রায়শই দেখা যায়, নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ মধ্যস্বত্বভোগীদের এই ফটকাবাজারির পথে কাঁটা না বিছাইয়া ফুল ছড়াইয়া দেয়। কোনো উত্সব সামনে থাকিলে পণ্যের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করিয়া অযৌক্তিকভাবে দাম বৃদ্ধির প্রতিযোগিতা সোত্সাহে চলিতে থাকে। আমরা বুঝি যে, যেকোনো পণ্যের হঠাত্ হঠাত্ মূল্যবৃদ্ধি নানা যৌক্তিক কারণেই ঘটিতে পারে। প্রায় বত্সর দশেক পূর্বে চালের সংকটের পাশাপাশি মূল্যবৃদ্ধি ঘটিলে সরকার প্রচারণা চালাইত—‘ভাতের বদলে আলু খান, ভাতের ওপর চাপ কমান।’ সেইসময় আলুর দাম তুলনামূলক অনেক কম ছিল। আবার কয়েক বত্সর পূর্বে হঠাত্ আলুর দাম বাড়িয়া গেল মাত্রাতিরিক্ত হারে, যাহা পরবর্তীতে আবার স্বাভাবিক হইয়া আসে। এইরূপ অবস্থা যে কোনো পণ্যের ক্ষেত্রেই হইতে পারে। আমাদের চাহিদার সিংহভাগ পেঁয়াজ দেশেই উত্পাদন হয়। তাহার পরও যেইটুকু আমদানি করিতে হয়, তাহার সুযোগ লইয়াই অনেক সময় কৃত্রিম সংকটের আবহ সৃষ্টি করে ফটকাবাজারিরা। দেশে পেঁয়াজের বার্ষিক চাহিদা ২৩ লাখ টন। কৃষি মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, বাজারে পেঁয়াজের সরবরাহে কোনো সঙ্কট থাকিবার কথা নহে। সংবাদের জোয়ারেও মূল্যের দামবৃদ্ধি ঘটে, সংকটের বানোয়াট চিত্র প্রকটভাবে প্রকাশ করা হয়। তাহাও মাথায় রাখিতে হইবে।
নেশার ঘোর কাটাইতে নাকি পেঁয়াজের রস বড়ই উপকারী। পেঁয়াজ লইয়া কোনো গোষ্ঠী অতিমুনাফার নেশায় বুঁদ হইতে চাহিলে তাহার উচিত কয়েক ফোঁটা পেঁয়াজের রস নিজ রসনায় ছোঁয়ানো। সরকারের সজাগ দৃষ্টি রাখা দরকার সকল প্রকার ফটকাবাজারির দিকে। পাশাপাশি নিশ্চিত করা দরকার অব্যাহত সরবরাহ।
