দক্ষিণাঞ্চলের নৌপথে নাব্যতা সঙ্কট

আপডেট : ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ২০:৪৯
দেশের দক্ষিণাঞ্চলের নদীগুলি নাব্যতা হারাইবার ফলে ঐ অঞ্চলের যাতায়াত ব্যবস্থা, কৃষি, নদীভিত্তিক পেশা ও প্রতিবেশে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হইয়াছে। নিয়মিত ড্রেজিং করিয়া নদীগুলিকে জীবন্ত রাখিবার যে দায়িত্ব কর্তৃপক্ষের ছিল, তাহা ঠিকঠাক মতো পালন হয় নাই। তাই দেশের অন্য সব অঞ্চলের ন্যায় দক্ষিণাঞ্চলের প্রধান কয়েকটি নদী ছাড়া বেশিরভাগ নদী মরিয়া গিয়াছে, বাকিগুলির অবস্থা মৃতপ্রায়। বরিশাল, ভোলা, পটুয়াখালী, বরগুনা, পিরোজপুর ও ঝালকাঠির ভূখণ্ডে জালের ন্যায় বিন্যস্ত নদীগুলির কথা গুরুত্বসহকারে ভাবিবার এখনই সময়। সারাদেশের তুলনায় দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ অভ্যন্তরীণ চলাচলের জন্য অনেকখানি নৌ-যানের উপর নির্ভর করিয়া থাকে। আশির দশকের মধ্যভাগে সারাদেশের ন্যায় দক্ষিণাঞ্চলেও সড়ক যোগাযোগের ব্যাপক উন্নতি হয়। ফলে দক্ষিণের অনেক এলাকায় এখন সড়কপথেই যাতায়াত করা সম্ভব। তাহা হইলেও এই অঞ্চলের যোগাযোগ ও পণ্য পরিবহনের প্রধান মাধ্যম এখন পর্যন্ত নৌপথ। এই পরিবহন ব্যবস্থা এতদাঞ্চলের জনজীবনের অংশ হইয়া পড়িয়াছে। সেই পরিবহন ব্যবস্থায় বিপর্যয় কেবল জনজীবনকে দুর্বিষহই করিয়া তুলিবে এই স্বাভাবিক। বিআইডব্লিউটিএ প্রদত্ত তথ্য অনুসারে সার্বক্ষণিক নৌ-যান চলাচলের জন্য মাত্র ২১২টি নদীতে প্রয়োজনীয় নাব্যতার সংকট রহিয়াছে। নদীর সঙ্গে বহিয়া আসা পলি জমিয়া এবং বহিঃস্থ ও অভ্যন্তরীণ নানান বাঁধের কারণে বাকি নদীগুলি শুকাইয়া গিয়াছে। বিশেষত দেশের উজানে বাঁধের প্রভাব এইক্ষেত্রে মারাত্মক হইয়াছে। অনেকে জলবায়ু পরিবর্তনকেও দায়ী করিতেছেন। এইসব অনিবার্য কারণের বিপরীতে নিয়মিত ড্রেজিং নদীগুলিকে বাঁচাইয়া রাখিবার অন্যতম উপায় হিসাবে বিবেচিত। নদী নাব্যতা হারাইবার ফলে মত্স্য সম্পদকে ঘিরিয়া যে ছয় লাখ পরিবার জীবননির্বাহ করিয়া থাকে তাহারা পড়িয়াছে বিপদে। ইলিশ মাছও লোনা পানি হইতে মিঠা পানিতে যে ডিম পাড়িতে আসিতো, নদীর নাব্যতা কমিয়া যাওয়ায় তাহারাও গতিপথ পরিবর্তন করিয়া মিয়ানমার সীমান্তের পথ বাছিয়া লইতেছে। যে বেদে সমপ্রদায়ের মানুষেরা নদীতেই বসবাস করিতো তাহারাও আবহমান কালের জীবন-যাপন পদ্ধতি বদলাইয়া স্থলে টিকিয়া থাকিবার সংগ্রাম করিতেছে। নদীগুলিতে পলি জমিবার কারণে সামান্য জোয়ারেই নদীর দুইকূল উপচাইয়া গ্রাম ও চরগুলি প্লাবিত হইয়া পড়ে। দক্ষিণাঞ্চলের যেই নদীগুলি একসময় পশ্চিমবঙ্গ ও চট্টগ্রাম বন্দরের মধ্যকার রুট হিসাবে ব্যবহূত হইতো, সেই নদীগুলি আজ স্থানীয় অধিবাসীদের চলাচলের সেবা দিতে ব্যর্থ। নদীর নাব্যতা রক্ষা করাই আজ নদীমাতৃক বাংলাদেশের অন্যতম চ্যালেঞ্জে পরিণত হইয়াছে। বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারেও নদীর নাব্যতা রক্ষা করিবার কথা উল্লেখ করা ছিল। শোনা গিয়াছিল ক্যাপিটাল ড্রেজিংয়ের কথাও। কিন্তু প্রতিশ্রুতি মোতাবেক কাজ হয় নাই। ড্রেজিং একটি অব্যাহত প্রক্রিয়া। নদীতে পলি জমিবেই এবং তাহাকে প্রয়োজন মাফিক নিয়মিত সরাইতে হইবে। বর্ষা মৌসুম প্রায় শেষ, আগামী শুকনো মৌসুমে নদীর বুকে চর জমিতে শুরু হইলে ফলাফল ভয়াবহ হইবে। তাই শুকনো মৌসুমের কথা মাথায় রাখিয়া এখনই ব্যবস্থা নিতে হইবে। ইহা ছাড়া নৌ-রুটের সিগন্যাল-সংক্রান্ত নিরাপত্তাও সুচারুভাবে করিতে হইবে। নৌ-রুটে যথাযথ চিহ্ন ও দিকনির্দেশনা না থাকায় প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটিয়া থাকে। সবচাইতে বড় কথা, অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দক্ষিণাঞ্চলের নদীগুলির নাব্যতা রক্ষা করিতে হইবে। ইহা ঐ অঞ্চলের লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবনযাত্রা ও মত্স্য সম্পদ রক্ষা এবং প্রতিবেশগত ভারসাম্য রক্ষার জন্য অত্যন্ত জরুরি।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন