রাজনীতি

রাজনীতির ভাষা ও ছন্দ

আপডেট : ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ২০:৫০
এখন অনেক কিছুই মনের মতো হয় না। আগে যে ধরনের গান শুনে মানুষের প্রাণে দোলা দিত, সে ধরনের গান এখন তেমন একটা সৃষ্টি হচ্ছে না। একজন গীতিকারকেও যে কবির মতো ছন্দ জানতে হয়, সাহিত্য জানতে হয় তা কেউ অনুধাবন করতে পারছেন না। একজন সুরকারকে কতটা দূরদর্শী বা পারদর্শী হতে হয় তার প্রয়োজন পড়ছে না। আর শিল্পীর কণ্ঠ তো মিউজিক দিয়ে বিকৃত করে ফেলা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে গান শুনতে বাজনা আর নৃত্যের আধিক্যে বাণীটা পর্যন্ত বোঝার সাধ্য থাকে না। ফলেই পুরনো গানগুলো এখনো হূদয়ে ছন্দ তোলে, নতুন অনেক গানের কথাই মনে থাকে না। কবিতার ক্ষেত্রেও একই কথা। ‘শুধু বিঘা দুই ছিল মোর ভুঁই/ আর সবই গেছে ঋণে’ অথবা ‘চল চল চল/ ঊর্ধ্ব গগনে বাজে মাদল’ অথবা ‘এইখানে তোর দাদীর কবর ডালিম গাছের তলে’ এখনো গড়গড় করে মুখস্থ বলা যায় অথচ এই সময়ের লেখা কবিতাগুলোর অধিকাংশই মনে রাখা বা পাঠোদ্ধার করা কষ্টকর। এসব কথা বলতে চাচ্ছি এজন্য যে, যোগ্য স্থানে যোগ্য লোকের সংখ্যা যথেষ্ট নয়। এর মধ্যে যারা তার কাজে যত্ন নিবেন ও গুরুত্ব দিবেন তারা ঠিকই টিকে থাকবেন। বাকিরা হারিয়ে যাবেন। যেমন জীবনানন্দ দাশকে তত্কালীন অনেক প্রসিদ্ধ কবি স্বীকার করে নিতে চাননি কবি হিসেবে। শেষ পর্যন্ত দেখা গেল তারাই হারিয়ে গেছেন। তাদের অনেকের নামও অনেকে ভুলে গেছেন কিন্তু জীবনানন্দ দাশ এখনো টিকে আছে। আমাদের রাজনীতিতেও তদ্রূপ গুরুত্বহীন কবি-শিল্পী-গীতিকার-সুরকারের মতো বৃদ্ধি পেয়েছে। তারা কে কখন কী বচন (ভাষণ) শোনান, তার সাথে কে কীভাবে তাল (সুর) দেন, কে বা কারা উত্সুক হয়ে লাফালাফি (নৃত্য) করেন তা বুঝা দুঃসাধ্য। সুতরাং সাহিত্য-সংস্কৃতির মধ্যে যেমন ‘অপ’ নামক তত্সম উপসর্গ যুক্ত হয়ে অপসংস্কৃতি হয়ে গেছে, তেমনই রাজনীতির সাথেও ‘অপ’ যুক্ত হয়েছে। এই অপরাজনীতির কলাকৌশল (অপকৌশল) পুরোটা বুঝা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। কদিন আগেই একটি জাতীয় দৈনিকের লিড নিউজ হয়েছে এভাবে যে, নৌপরিবহন মন্ত্রীর হাতে জিম্মি সড়ক। এরকম একটি সংবাদ প্রকাশের পর হয় মন্ত্রী মহোদয় পদত্যাগ করবেন অথবা ঐ পত্রিকাটির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে মিথ্যা সংবাদ পরিবেশনের দায়ে। কিন্তু আমরা কোনটাই দেখতে পাচ্ছি না। তার মানে মন্ত্রী ঠিকই সড়ক জিম্মি রাখছেন এবং পত্রিকাও সঠিক সংবাদ পরিবেশন করছে। বিরোধীদলীয় নেতারাও একের পর এক চমকের কথা বলছেন ধমকের সুরে। ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, ড. খোন্দকার মোশারফ হোসেন, ব্রিগেডিয়ার আ.স.ম. হান্নান শাহ থেকে শুরু করে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর পর্যন্ত সবাই কঠিন ও কঠোর কর্মসূচির কথা বলছেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে। কেউ বলছেন তত্ত্বাবধায়ক সরকার মেনে নেয়া না হলে নির্বাচনে যাবেন না। কেউ বলছেন দেশ অচল করে দেয়া হবে। কেউ বলছেন এমন আন্দোলন করা হবে যে সরকার পালাবার পথ খুঁজে পাবে না। আমরা আসলে এরকম ভাষা শুনে শুনে এতই অভ্যস্ত হয়ে গেছি যে, এখন আর এগুলো আমলে নিতে পারছি না। নতুন ভাষায় নতুন সুরে নমনীয় কণ্ঠে যদি ঐ কথাগুলোই ঘুরিয়ে বলা যায়, আমাদের কাছে অধিক গ্রহণীয় হতে পারে। অনেকেই বলছেন সংলাপের কথা। সংলাপ ছাড়া নাকি সমঝোতা সম্ভব নয়। সংলাপের মাধ্যমেই যে সমঝোতা হতে হবে তা কিন্তু নয়। উদার মন-মানসিকতাই যথেষ্ট। প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়ে অধিক গুরুত্ব দিয়ে নিজের আসন ছেড়ে দিয়ে এমন একটি মহত্ত্বের পরিচয় দিলেন বা এমন একটি নির্বাচন পরিচালনার ব্যবস্থা করলেন যেটা বিরোধীদল একবাক্যে মেনে নিল। অথবা বিরোধীদল নমনীয় হয়ে এমন একটি প্রস্তাব করলেন যা সরকার মেনে নিতে পারলো আনন্দিত হয়ে। দেশ ও জাতির স্বার্থে ঐক্যমত হলে আমরা কি সেই হারানো ছন্দ ফিরে পাবো না? লেখক : কবি ও শিশুসাহিত্যিক

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন