আদর্শিক বিচ্যুতি ও রাজনৈতিক সংকট

আপডেট : ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ২১:৩৪
কোন জাতি বা গোষ্ঠীর আদর্শিক ও মতবাদের দৃঢ়তা (Ideological and Doctrinal Firmness) সেই নির্দিষ্ট জাতি বা গোষ্ঠীর অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার মূল নিয়ামক। আদর্শিক ও মতবাদের দৃঢ়তার সংকট কোন জাতি বা গোষ্ঠীকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে দিতে পারে। এমনকি স্বাধীন কোন জাতিকে পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ করতে পারে। বর্তমান বিশ্বের মোড়ল রাষ্ট্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আজকের বিশ্বকে নেতৃত্ব দিচ্ছে তাদের আদর্শিক দৃঢ়তার উপর ভিত্তি করে। অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করেন, ‘মুনেরা ডকট্রিন’ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক উন্নয়নকে আজকের এই পরাশক্তির আসনে উন্নীত করেছে। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট জেমস মুনেরা ১৮২৩ সালের ২রা ডিসেম্বর কংগ্রেসে তার সপ্তম বার্ষিক ‘স্টেট অব দ্যা ইউনিয়ন এডড্রেস’-এ তিনি এই ডকট্রিন উপস্থাপন করেন। যার মূল উপপাদ্য ছিল ‘ইউরোপীয় ক্ষমতাকে আর কোন আমেরিকান রাষ্ট্রকে উপনিবেশিকরণের বা এ সকল রাষ্ট্রের উপর হস্তক্ষেপের সুযোগ দেয়া যাবে না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপীয় ক্ষমতা ও অন্যান্য উপনিবেশিক শক্তির মধ্যকার যুদ্ধ পরিস্থিতিতে নিরপেক্ষ থাকবে। আর যদি এই যুদ্ধ আমেরিকান কোন রাষ্ট্রকে যুক্ত করে সে ক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আক্রমণকারী রাষ্ট্রের এই ধ্বংসাত্মক পদক্ষেপকে শত্রুভাবাপন্ন বলে চিহ্নিত করবে।’ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রেসিডেন্ট মুনেরা প্রবর্তিত ডকট্রিনকে আদর্শ জ্ঞান করেছে এবং তারা তাদের অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক উভয় রাজনৈতিক পরিসর গড়ে তুলেছেন এই ডকট্রিন’র উপর ভিত্তি করে। পরবর্তী সময়ে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত শাসকবর্গ বিশেষ করে আমেরিকার প্রেসিডেন্টগণ কর্তৃক এই ডকট্রিনের বিস্তার ঘটানো তার প্রমাণ বহন করে। চাইনিজরা বর্তমানকালে একমাত্র শক্তি যারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে প্রতিযোগিতা করে বিশ্বব্যবস্থায় তাদের শক্তিশালী অবস্থানকে টিকিয়ে রেখেছে। চাইনিজদের রাজনৈতিক গুরু নামে স্বীকৃত মাও সেতুং-এর বিপ্লবী আদর্শকে আঁঁকড়ে ধরে চাইনিজরা বর্তমানকালে স্থিতিশীল রাজনৈতিক ব্যবস্থার এক আদর্শ হিসেবে পরিগণিত। ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসে মুসলমানরা আদর্শ, ঐতিহ্য ও মূল্যবোধের দিক দিয়ে সর্বাগ্রে অবস্থান করলেও ১৯৪৭ সালে ভারত-বিভাগ’র পর পাকিস্তান নামক মুসলিম রাষ্ট্রে অনৈক্য, সংঘাত ইত্যাদি বাসা বেঁধেছিল। এর একমাত্র কারণ ছিল আদর্শিক বিচ্যুতি। পাকিস্তান রাষ্ট্রের নাম ‘ইসলামিক প্রজাতন্ত্র’ হলেও ইসলামের মৌলনীতিসমূহ যেমন- ন্যায়বোধ, সমতা, সুবিচার ইত্যাদি প্রতিষ্ঠিত হয়নি; বরং শাসকেরা প্রতিষ্ঠিত করেছিল ‘ডিভাইড এ্যান্ড রুল পলিসি’ যার মাধ্যমে পূর্ব বাংলার জনগণ পতিত হয়েছিল সীমাহীন দুর্ভোগে। ফলাফল স্বরূপ পাকিস্তান ভেঙে বাংলাদেশ নামক স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র জন্ম লাভ করে। বাংলাদেশ রাষ্ট্র যে আদর্শ নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল সংবিধানসহ ও অন্যান্য রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থায় তার প্রয়োগ না হওয়ায় রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, রাজনৈতিক সংকট ইত্যাদি হয়েছে এদেশের মানুষের নিত্যদিনের সঙ্গী। মুক্তিযুদ্ধের মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ধর্মনিরপেক্ষ ও সমাজতান্ত্রিক বাংলাদেশ গঠনের চিন্তা থেকে ১৯৭২ সালের সংবিধানে রাষ্ট্র পরিচালনার মৌলনীতিতে গণতন্ত্র ও জাতীয়তাবাদ’র সাথে ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্র’র সন্নিবেশন ঘটালেও এই দুইটি মতবাদের একটিরও সফল বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। কারণ বাংলাদেশ সৃষ্টির খুব অল্প সময়ের মধ্যে ঘাতকের রোষানলে পড়ে তাঁকে পরপারে পাড়ি জমাতে হলো। পরবর্তীতে আমরা দেখি যে, ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের যে স্পৃহা নিয়ে বাংলাদেশের জন্ম হয়েছিল, সেই নীতির বিলোপ সাধন করা হয় পঞ্চম সংশোধনী প্রণয়নের মাধ্যমে। আর সমাজতন্ত্রেরও ভিন্ন ব্যাখ্যা প্রদান করা হয়। বলা হলো অর্থনৈতিক ও সামাজিক ন্যায়বিচার-এই অর্থে সমাজতন্ত্র। বঙ্গবন্ধুর অনুসারীরা একটি দীর্ঘ সময় অতিক্রান্ত হবার পর রাষ্ট্রপরিচালনার গুরু দায়িত্ব গ্রহণ করলেও ধর্মনিরপেক্ষতার রঙে তারা রঙিন হতে পারেনি। বরং ধর্মভিত্তিক দলগুলোর সমর্থন পাওয়ার মাধ্যমে ক্ষমতালিপ্সু মানসিকতা তাদেরকে বার বার ক্ষত-বিক্ষত করেছে। এই তো সর্বশেষ ২০০৮ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের আগে বর্তমান ক্ষমতাসীনরা যারা ধর্মনিরপেক্ষতাকে ধারণ করেন, তারাই ধর্মভিত্তিক দলগুলোর সমর্থন পাওয়ার আশায় শরীয়াহ্ আইনকে রাষ্ট্র ব্যবস্থায় বলবত্ করার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছিল। বাংলাদেশের অন্যান্য রাজনৈতিক দলসমূহ বিভিন্ন সময়ে ক্ষমতায় আসীন হয়েছে। কিন্তু তাদের প্রবর্তিত মৌল আদর্শের প্রতিও তারা একাগ্র থেকে রাষ্ট্র পরিচালনায় ব্যর্থ হয়েছে। যা রাজনৈতিক সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে। বিএনপি জাতীয়তাবাদী আদর্শকে ধারণ করলেও ধর্মীয় আদর্শকে তারা রাষ্ট্র পরিচালনার মৌলনীতিতে অন্তর্ভুক্ত করে জাতীয়তাবাদী ধারণাকে ম্লান করেছে। জাতীয়তাবাদ’র নীতি ইসলাম কর্তৃক সমর্থিত হয় না। সুতরাং ক্ষমতার প্রতি অবিরল টান তাদেরকে গোঁজামিল মার্কা জাতীয়তাবাদ তৈরীতে প্রেরণা দান করে। বাংলাদেশের রাজনীতির ধারক-বাহকেরা কি তাদের প্রণীত ডকট্রিন বা মতবাদের উপর পুরোপুরি শামিল থেকে জনকল্যাণের দিকে মনোনিবেশ করবেন? আদর্শিক চেতনায় উদ্বেলিত হয়ে রাজনৈতিক সংকট দূরীকরণের পথ খোঁজার এখনই সময়। বিঃ-দ্রঃ- বর্তমান বাংলাদেশের রাজনীতিতে জোট বা মোর্চা গঠনই আদর্শিক বিচ্যুতির অন্যতম কারণ। লেখক: সহকারী অধ্যাপক, পলিটিক্যাল সায়েন্স, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা Email: [email protected]

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন