ফেসবুক লইয়া অনলাইনে হিতে-বিপরীত কাণ্ডের সংখ্যা উত্তরোত্তর বাড়িতেছে। এক্ষণে দেশে মোট ফেসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৫৬ লাখ। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, ইহার ভিতরে ১১ লাখই ভুয়া বা ফেক অ্যাকাউন্ট! তথ্য ও যোগাযোগ খাতে গবেষণা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ওপেন সোর্স নেটওয়ার্ক (বিডিওএসএন) সমপ্রতি এমন তথ্যই জানাইয়াছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম হিসাবে ফেসবুক সারা বিশ্বেই জনপ্রিয়। জনপ্রিয়তার এই সুযোগ লইতে তাই বেনামে বা প্রকৃত তথ্য গোপন করিয়া অ্যাকাউন্ট খোলা হইবে, তাহাতে বিস্ময়ের কিছু নাই। কিন্তু এই অসত্য অ্যাকাউন্ট খোলার প্রতিযোগিতায় আমরা যেন প্রথম হইতে কোমর বাঁধিয়া নামিয়াছি। কেননা, সর্বশেষ বার্ষিক হিসাব অনুযায়ী, সারা বিশ্বে ফেসবুকের মোট আইডির শতকরা ৭ ভাগ অর্থাত্ ৭ কোটি ৬০ লাখ অ্যাকাউন্ট ভুয়া। কিন্তু আমাদের দেশে ইহার শতকরা হার ২১ ভাগের বেশি। অর্থাত্ বিশ্বের গড় ভুয়া অ্যাকাউন্টের তুলনায় আমরা তিন গুণ অগ্রগামী!
অনলাইনের ভার্চুয়াল জগত্ আমাদের এত ধরনের ইতিবাচক কর্মে সহভূমিকা পালন করিয়া থাকে যে, ইহা ছাড়া এই বিশ্ব এখন কল্পনার বাহিরে। কল্পগল্পের বিষয়াদি বিজ্ঞানের ‘জাদু’তে একটিবার বাস্তবরূপ পাইলে মানুষের আর অতীতে ফিরিবার অবকাশ থাকে না। ইন্টারনেটের অসংখ্য অতি কার্যকর ইতিবাচক দিকগুলির পাশাপাশি অনেক ভয়ঙ্কর দিকও রহিয়াছে। পর্ণোগ্রাফি, বলা যায়, ডিজিটালরূপ পাইয়াই সর্বগ্রাসী হইতে পারিতেছে। ইহার পাশাপাশি নানাবিধ ঠগের কারবারি তো আছেই। তাহার যে কত রূপ আমরা বোধ করি তালিকার পর তালিকা প্রকাশ করিয়াও শেষ করিতে পারিব না। কিছু জনপ্রিয় প্রবঞ্চনার সহিত আমরা প্রায় সকলেই পরিচিত। যেমন—ইমেইলে কয়েক কোটি ডলারের লটারিতে জয়ী হওয়ার অতি লোভনীয় মেইল পাওয়া। প্রতারকরা সর্বগামী। ফেসবুক, টুইটার, জি-প্লাস, ইউটিউব বা লিঙ্কেডইন এখন সকল কিছু প্রচারের সর্বাধিক সহজ ও কার্যকরী উপায় বলিয়া এইসকল ক্ষেত্রে প্রতারকরাও বিভিন্ন সুযোগ লইতে চায়। বলা যায়, আন্তর্জালের যেকোনো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম হইল—আমরা সবাই রাজার জগত্। নিজের ভিন্নধর্মী ভাবনা, নিজের ব্যবসা বা পণ্যের তথ্য বা অন্য যেকোনো তথ্যগত কিছু খুব দ্রুত অসংখ্য মানুষের কাছে ছড়াইয়া দিতে ইহার জুড়ি মেলে না। সহজ ও তাত্ক্ষণিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায় বলিয়া ভার্চুয়াল জগতে হীন-উদ্দেশ্য চরিতার্থের মতো ঘটনাও বাড়িতেছে। ফেসবুক বা ইউটিউবে মিথ্যা তথ্য, ছবি বা ভিডিওর মাধ্যমে দাঙ্গা পুঞ্জিভূত করিবার ঘটনা আকছার দেখা যাইতেছে বিশ্ব জুড়েই। কয়েক বত্সর পূর্বে রামু বা সমপ্রতি ভারতের মুজাফফরবাদে যাহা ঘটিয়াছে, তাহার নেপথ্য রহিয়াছে ফেসবুক, ইউটিউবের মাধ্যমে বানোয়াট স্পর্শকাতর ফুটেজ ছবি আপলোড করিবার ঘটনা।
প্রতারকদের পাশাপাশি বিভিন্ন মতলববাজরা দারুণ সক্রিয় হইতেছে এই ভার্চুয়াল জগত্। ভার্চুয়াল জগতে বিশেষ মতলব কার্যসিদ্ধ করিবার পরিসর আরো ব্যাপক বলিয়া বিভিন্ন ধরনের মতলববাজরা নিজেদের ক্ষুদ্র-বৃহত্ হীন-উদ্দেশ্য চরিতার্থ করিতে অনলাইনের জনপ্রিয় মাধ্যমগুলোতে বিবিধ প্রপাগন্ডা চালাইতেছে নিরন্তর। এই সকল ভয়ঙ্কর কর্মকাণ্ড প্রতিহত করিতে সমপ্রতি সরকার কঠোর আইন প্রণয়নের পরিকল্পনা করিয়াছে। কিন্তু এই সংক্রান্ত খসড়া আইন দেখিয়া আমরা ভীত হইতেছি বটে। এই আইন যেন হইতেছে কড়া ডোজের অ্যান্টিব্যায়োটিক ড্রাগের মতোন, যাহার প্রয়োগে ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়ার পাশাপাশি ধ্বংস ঘটিবে অতি উপকারী ব্যাকটেরিয়ারও। অনলাইনের বিস্ময়কর সুবিধার দিকখানি এতটাই উঁচুতে যে, তাহার কিছু কিছু বন্ধ করা হইলে বলিতে হয়—‘দ্বার বন্ধ করে ভ্রমটারে রুখি, সত্য বলে আমি তবে কোথা দিয়া ঢুকি?’ সুতরাং, ইহার জন্য প্রথমেই দরকার ব্যবহারকারীর সচেতনতা। বলা যায়, এই সচেতনতা বৃদ্ধি করা যায় ফেসবুকের মাধ্যমেই সবচেয়ে কার্যকরভাবে। চিকিত্সকের ছুরি যাহাতে ডাকাতের হস্তে না পড়ে, তাহার তরিকা ওই ছুরির ভিতরে থাকিলে ভয় লাঘব হইতে পারে বৈকি।
