দিনাজপুর মেডিক্যাল কলেজে শিক্ষকের অনুমোদিত পদের সংখ্যা ১৫১টি। এর মধ্যে ৫০টি পদই শূন্য। অর্থাত্ ওইসব পদে কোনো শিক্ষক নাই। একেতো শিক্ষক পর্যাপ্ত নাই, তার উপর যাহারা আছেন তাহাদের অনেকেই থাকিয়াও যেন নাই। বেশিরভাগ সময়ই তাহারা কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকেন। কলেজে আসেন কালেভদ্রে। পরিতাপ; এই কলেজের অধ্যক্ষ মহোদয় নিজেও কর্মস্থলে গরহাজির থাকিতে কুণ্ঠিতবোধ করেন না। জানা যায়, তিনি থাকেন রংপুরে সপরিবারে। গত মঙ্গলবার এতদসংক্রান্ত একটি রিপোর্ট প্রকাশিত হইয়াছে পত্রিকান্তরে। ওই রিপোর্ট হইতে জানিতে পারা যায় যে, অনুপস্থিত শিক্ষকগণের কেউ থাকেন ময়মনসিংহে, কেউবা থাকেন রাজশাহীতে। রাজধানী ঢাকায় বসবাস করিয়াও কেহ কেহ দিব্যি চাকরি করিয়া যাইতেছেন দিনাজপুর মেডিক্যাল কলেজে। মাস শেষে তাহাদের কাহারো বেতন-ভাতা পাইতে কোনোই অসুবিধা হইতেছে না। তবে অধ্যক্ষ মহোদয় জানাইয়াছেন, অনুপস্থিত ১২ জন শিক্ষককে কারণ দর্শানোর নোটিস দেওয়া হইয়াছে। কিন্তু কোনো সাড়া মিলে নাই। এই সাড়া না মিলিবার মানে কী তাহা অবশ্য পরিষ্কার নহে। অনুপস্থিতগণ মনেহয় গরহাজির প্রিন্সিপালের শোকজ নোটিসে তেমন গা করেন নাই। উল্টো মনেমনে হয়তো তাহারা বলিয়াছেন, আপনি আচরি ধর্ম পরকে শেখাও।
কর্মস্থলে অনুপস্থিতি এইদেশে মোটেও নূতন কোনো ঘটনা নহে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে এমন অনেক সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী আছেন, যাহারা নিয়মিতই অনুপস্থিত থাকেন, মাঝেমধ্যে স্টেশনে তশরিফ আনিয়া তাহারা সরকারবাহাদুরকে ধন্য করিয়া থাকেন। খোদ রাজধানীতেও সরকারের এমন অনেক অফিস আছে যেখানে হাজিরা নৈমিত্তিক ব্যাপার মাত্র। ঢাকার বাহিরের সরকারি স্কুল ও কলেজে শিক্ষক অনুপস্থিতির ঘটনা হামেশাই ঘটিয়া থাকে। তবে স্টেশনে নিত্য অনুপস্থিত থাকিয়া নিয়মিত বেতন তুলিয়া নিবার ক্ষেত্রে অন্য সবার চাইতে একশ্রেণীর চিকিত্সক যে ইতিমধ্যে বিশেষ পারদর্শিতা অর্জন করিয়া লইয়াছেন, তাহা ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করিয়া বলিবার দরকার পড়ে না। এইকালে আসিয়া এইসব অনিয়ম যেন বা আমাদের গা সওয়া হইয়া গিয়াছে।
তাই বলিয়া মেডিক্যাল কলেজে গণহারে মাসের পর মাস শিক্ষক অনুপস্থিত থাকিবেন, এমনটি ভাবিয়া বিচলিতবোধ না করিয়া পারা যায় না। চিকিত্সা বিজ্ঞান শিক্ষার প্রসারকল্পে গত দেড়-দুই দশকের মধ্যে সরকারিখাতে সারাদেশে, বিভিন্ন জেলা সদরে মেডিক্যাল কলেজ স্থাপিত হইয়াছে প্রায় দুই ডজন। বেসরকারি খাতেও প্রতিষ্ঠিত হইয়াছে মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল। ইহা একটি বড় ধরনের অগ্রগতি নিঃসন্দেহে। দেশে মেডিক্যাল শিক্ষার চাহিদাও রহিয়াছে। ১৮৭৫ সালে ঢাকায় স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ (মিটফোর্ড) প্রতিষ্ঠিত হইবার ৭১ বত্সর পর ১৯৪৬ সালে স্থাপিত হয় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ। পরে আরও কয়েকটি কলেজ প্রতিষ্ঠা করা হইলেও মেডিক্যাল শিক্ষায় আগ্রহী শিক্ষার্থীর সংখ্যা বিবেচনায় তাহা যথেষ্ট ছিল না। এখন সেই অবস্থার অনেকটাই পরিবর্তন হইয়াছে। অতীতের তুলনায় অনেক বেশি সংখ্যক মেধাবী ছেলেমেয়ে চিকিত্সা শাস্ত্রে অধ্যয়নের সুযোগ পাইতেছেন। কিন্তু দিনাজপুর মেডিক্যালের হালফিল সংবাদ পাঠ করিয়া যে কেহ ভাবিতে পারেন যে, এই ধরনের প্রতিষ্ঠান থাকিবার কী প্রয়োজন! নিয়মিত ক্লাস না করিয়া, শিক্ষকের সাহচর্যে এবং তাহাদের নির্দেশনা অনুযায়ী হাতেকলমে পাঠ গ্রহণ না করিয়া চিকিত্সা শাস্ত্রের যথাযথ অধ্যয়ন যে সম্ভব নহে, তাহা সহজেই অনুমেয়। যে প্রতিষ্ঠানে প্রিন্সিপালসহ ডজনখানেক শিক্ষক প্রায় নিয়মিতই অনুপস্থিত; সেখানে শিক্ষার্থিগণের চিকিত্সাশাস্ত্র পাঠ কেমন চলিতেছে বা কেমন চলিতে পারে, তাহা কাহাকেও ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করিয়া বলিয়া বুঝাইবার দরকার পড়ে না। কার্যে অনুপস্থিত থাকিয়া কি প্রকারে চাকুরী বহাল রাখা যায় এবং অনায়াসে বেতন-ভাতা উত্তোলন করা যায়, সেই বিদ্যাটি অবশ্য তাহারা লাভ করিয়া চলিয়াছেন দস্তুরমত। ইহাই বা কম কিসে! আজকের এই শিক্ষার্থিগণ ভবিষ্যতে চিকিত্সকরূপে সরকারি চাকুরী পাইলে তাহাদের গুরুজনের (শিক্ষকগণের) পদাঙ্ক অনুসরণ করিতে ভুল করিবেন না নিশ্চয়ই।
