সীমান্ত হত্যা প্রসঙ্গে

আপডেট : ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ২২:৪৬
ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে সীমান্ত হত্যাকাণ্ড প্রসঙ্গটি। এটা নতুন কোন বাস্তবতা নয়। যেদিন থেকে কাঁটাতারে ঘিরে ধরেছে দুই দেশের সীমান্ত, সেদিন থেকে সীমান্তের করিডোরে খরচ হচ্ছে মানবিকতা। যে প্রসঙ্গটি নতুনত্বের জন্ম দিয়েছে তা হলো ফেলানী হত্যা মামলার বিচার প্রক্রিয়া। ফেলানী হত্যা মামলার বিচার শেষ হলো। কি পেল ফেলানীর পরিবার কিংবা বাংলাদেশ? জাতীয় ও আন্তর্জাতিক চাপের কারণে ভারতীয় সেনাবাহিনীর কোর্ট মার্শালের সমতুল্য বিএসএফ-এর নিজস্ব আদালত ‘জেনারেল সিকিউরিটি ফোর্সেস কোর্ট’ ১৩ আগষ্ট ২০১৩ শুরু হওয়া বিচারের রায়ে ৬ সেপ্টেম্বর বিএসএফ সদস্য অমিয় ঘোষকে নির্দোষ ঘোষণা করে। যদিও অমিয় ঘোষ দোষ স্বীকার করেছিল। রায়ে বলা হয়েছে অমিয় ঘোষ হত্যার উদ্দেশ্যে গুলি করেনি। উভয়দেশের বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন এবং বাংলাদেশ সরকারের দু’জন দায়িত্বশীল মন্ত্রী রায়ের বিষয়ে অসন্তুষ্টি প্রকাশ করে বিবৃতি দিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং গণমাধ্যম জুড়ে তীব্র সমালোচনার পর কিশোরী ফেলানী হত্যা মামলার রায় পুনর্বিবেচনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএসএফ। বিএসএফ-এর এমন সিদ্ধান্ত নতুন করে আশার সঞ্চয় করে না বরং চিন্তার খোরাক যোগায় এটি এক ধরনের সময়ক্ষেপণ নয়তো? ১৯৭১ সালে মানবিক বোধের জাগরণে বন্ধুপ্রতীম যে রাষ্ট্রটি সীমান্ত খুলে দিয়েছিল, বন্ধু হয়ে পাশে দাঁড়িয়েছিল, যে রাষ্ট্রের সীমান্তে বিষাক্ত কাঁটাতারে আজ অনায়াসে ঝুলে থাকে অসহায় ফেলানীদের গুলিবিদ্ধ লাশ, জনগণের মনস্তত্ত্বে বাংলাদশ আজও ভারতের বন্ধুপ্রতীম রাষ্ট্র। সিএনএন, আইবিএন ও দ্য হিন্দুর এক জরিপে প্রকাশিত হয়েছে, প্রতিবেশী দেশের মধ্যে ভারতীয়রা সবচেয়ে বিশ্বাস করে বাংলাদেশকে এবং সবচেয়ে অবিশ্বাস করে পাকিস্তানকে। অথচ বিরোধপূর্ণ অন্য কোন সীমান্তে নয়, এমনকি ‘ইসরাইল-ফিলিস্তিন’ সীমান্তেও নয়, পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি সীমান্ত হত্যাকাণ্ড হয় ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে। মানবাধিকার সংগঠন অধিকারের তথ্যমতে, ২০১১ সালে বিএসএফ-এর গুলিতে ৩১ জন নিহত হয়। ২০১২ সালে এ সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে ৩৮ জন। ২০১৩ সালের শুধু মার্চ থেকে জুলাই পর্যন্ত ১৫ জন বাংলাদেশি বিএসএফের গুলিতে নিহত হয়েছে। বিজিবি-র তথ্য অনুযায়ী ২০০৯ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১৩ সালের জুন পর্যন্ত সীমান্তে কাঁটাতার আধিপত্য আর মুনাফার করিডোরে খরচ হয়েছে ২১৪ জন মানুষ। কেন এত হত্যাকাণ্ড? যখনই সীমান্ত হত্যা হয় বিএসএফ বলে থাকে ‘আত্মরক্ষার্থে’ কিংবা ‘নিরাপত্তার’ স্বার্থে গুলি করা হয়েছে। প্রশ্ন হলো ফেলানীতো কোন অস্ত্র, মাদক কিংবা চোরাচালানের সাথে জড়িত ছিল না। তাহলে সেখানে ‘আত্মরক্ষা’ কিংবা ‘নিরাপত্তা’ স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়টি আসা কতটুকু প্রাসঙ্গিক? ভারতের ‘কোড অব ক্রিমিনাল প্রসিডিউর’-এর অনুচ্ছেদ ৪৬ অনুযায়ী অপরাধীকে গ্রেফতার করার সকল প্রচেষ্টা বৈধ হলেও মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন সাজা হওয়ার মতো অপরাধে অপরাধী না হলে কোনভাবেই হত্যা কিংবা হত্যার চেষ্টা প্রতীয়মান হয় এমন প্রদক্ষেপ নেয়া যাবে না। একইভাবে জাতিসংঘের Basic Principles on the Use of Force and Firearms by Law Enforcement Officials অনুসারে আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে মানুষের জীবন রক্ষার বিষয়টিকে (Preserving human life) সর্বোচ্চ গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। সুতরাং ভারতীয় কিংবা আন্তর্জাতিক কোন আইনই বিএসএফের সীমান্ত হত্যাকাণ্ডকে বৈধতা দেয় না। সীমান্তে বিএসএফের গুলি চালানো ‘আত্মরক্ষা’ কিংবা ‘নিরাপত্তা’ ধারণার চেয়ে আর্থিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় অধিকতর জড়িত। গরু চোরাচালানের সময় সবচেয়ে বেশি গুলির খবর শোনা যায়, অন্যান্য অপরাধ যেমন ফেনসিডিল, অস্ত্র, সাইকেল, মসলা, কাপড় ইত্যাদি চোরাচালানের সময় গুলি করা হয় না। কারণ এগুলো বিএসএফের সাথে আর্থিক যোগসাজশে করা হয়। গরু চোরাচালানের ক্ষেত্রে সবসময় আর্থিক লেনদেন সম্ভব হয় না। যখনই ‘লাইন না করে’ অর্থাত্ গরু প্রতি ১০০০-২০০০ টাকা না দিয়ে গরু পাচারের চেষ্টা করা হয় তখনই গুলি চালানো হয়। তাই সীমান্ত নিরাপত্তা কিংবা মানবিকতা নয়, বরং আর্থিক যোগসূত্র মুখ্য। অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ তাঁর গবেষণায় দেখিয়েছেন বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে গরু ব্যবসা বৈধ করা হলেই অনেক সমস্যার সমাধান হতে পারে। কিন্তু গরু ব্যবসা বৈধ করা সহজসাধ্য নয়। গরু ব্যবসা ভারতের অনেক জনগণের মনে ‘ধর্মীয় অনুভূতি’ সংশ্লিষ্ট বিষয়, অন্যদিকে রয়েছে বিএসএফের ‘আর্থিক দুষ্টচক্রের প্রসঙ্গ’। ভারত তাঁর বিখ্যাত ‘ইন্ডিয়া ডকট্রিন’ (India Doctrine) -এর ভিত্তিতে দক্ষিণ এশিয়ায় নিজেকে একটি আঞ্চলিক পরাশক্তি রূপে দেখতে চায়। আঞ্চলিক পরাশক্তি হিসেবে প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখা অত্যাবশ্যকীয়। কিন্তু ভারত আজও ‘কৌটিল্যের নীতি’ (প্রতিবেশী কখনো বন্ধু হতে পারে না; শত্রুর শত্রু আমার বন্ধু) থেকে বের হয়ে আসতে পারেনি। ভারত মানবিক সীমান্ত ধারণায় বিশ্বাসী না হলে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের পুনর্মূল্যায়ন সময়ের দাবি হয়ে উঠবে। তখন হয়তো সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষার্থে ‘পূর্বমুখী কূটনীতি’ বিশেষ করে চীনের সাথে অধিকতর সম্পর্ক জোরদার করা ব্যতীত বাংলাদেশের কোন বিকল্প থাকবে না। লেখক :এমএসএস,আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং রিসার্চ ইনটার্ন, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অফ ল’ এন্ড ইন্টারন্যাশনাল এফেয়াসর্্ (বিলিয়া) [email protected]

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন