শান্তি ও দুনিয়া জোড়া বাংলাদেশের ইমেজ

আপডেট : ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ২২:৪৮
বহির্বিশ্বে বাঙালিদের আচরণ ও উগ্রতা এখন দুশ্চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়াচ্ছে। কিছুদিন আগেও আমরা এত উগ্রতা বা মারমুখি হতে দেখিনি। গোড়াতেই বলে নেই, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আমাদের ভাবমূর্তি মন্দ কিছু নয়। দুর্নীতি বা অন্য যে কোন মন্দ বিষয়ে শিরোনাম হবার পরও সাধারণ বাংলাদেশীরা পৃথিবীতে শান্তি প্রিয় জাতি হিসেবেই পরিচিত। এটা তাঁদের অর্জন। পরিশ্রমী, নিয়ম নিষ্ঠ, কর্মী ও মেধাবী বাংলাদেশীরা তাঁদের রাষ্ট্র ও জাতির সম্মান ও মর্যাদা তুলে ধরতে সচেষ্টও বটে। পৃথিবীর হেন দেশ নেই, হেন ভূ-খন্ড নেই যেখানে লাল সবুজের পতাকা ওড়ে না। আমেরিকার কাছাকাছি বেলিস নায়ের ছোট্ট এক ভূ-খন্ডে ঘুরে এসেছে অর্ক, আমার যুবক পুত্রটির কাছ থেকে শোনা কাহিনী যেমনি বিস্ময়ের তেমনি পুলকেরও। সে দেশে এক নাগাড়ে বেশ কিছু সময় অতিবাহিত করলে বা কিছু শর্ত পূরণ করলে আমেরিকায় ঢোকা যায় এবং কাজ করার ও অনুমতি পাওয়া যায়, সে সখ আর সোনার হরিণের আশায় বেলিজে ভীড় জমানো বাংলাদেশীদের সাথে দেখা হয়েছিল অর্কের। যুবক বাংলাদেশীরা দূর দেশে কষ্ট করে থাকার পরও আতিথেয়তায় ভুৃল করেনি। গুয়েতেমালার মত ছোট দেশেও একই অভিজ্ঞতা। বাংলাদেশের মানুষজন শান্তি প্রিয় এবং অন্যদের সাথে মানিয়ে চলতে জানে এটাই বাস্তবতা। উপ-মহাদেশের কয়েকটি দেশের তুলনায় আমাদের অবস্থান এ ব্যাপারে দৃঢ়। ভারত পাকিস্তানের যুব সম্প্রদায় নানা কারণে মারমুখি হয়ে ওঠে, কেউ ক্রিকেট কেউবা ধর্মীয় উগ্রতায়, বলা বাহুল্য পাকিস্তানের তুলনায় অনেক গুণে উজ্জ্বল হবার পরও ভারতীয়দের সুনাম অক্ষুণ্ন কিছু নয়। অষ্ট্রেলিয়ার সিডনি মেলবোর্ণসহ বড় কয়েকটি শহরেও তাদের সাথে দাঙ্গা হয়েছে। সে দাঙ্গা ফ্যাসাদ এক দিনে ঘুচে যায়নি, উভয় দেশের প্রধানমন্ত্রীও এ নিয়ে বাতচিত করেছেন। অন্য দিকে বাকিদের অবস্থা ভয়াবহ, তাদের নাম শুনলে বাড়ি ভাড়া দিতে নারাজ শ্বেতাঙ্গরা, তাদের সাথে ছেলেমেয়ের বন্ধুত্বেও ঘোর আপত্তি। অথচ সাধারণ পাকিস্তানীরা আমাদের মতই নীরিহ। কিন্তু এখানে ব্যক্তির চেয়ে গোষ্ঠী, গোষ্ঠীর চেয়ে জাতি ও রাষ্ট্র বড়। সে পরিচয়ই তার তকমা, পৃথিবীর একমাত্র হিন্দু দেশ ছিল নেপাল, সাধারণত ধরে নেয়া হয় নিরামিষ ভোজী গাঁধী বাদী সাধু সন্ডের অনুসারী হিন্দুরা শান্ত ও কোমল স্বভাবের। অন্য নরেন্দ্রমোদী ও তাঁর অনুসারীরা সে বদনাম ঘুচিয়ে হিন্দুদের উগ্র ও জঙ্গী করে তুলতে তত্পর। বলছিলাম নেপালের কথা, নেপালী তরুণ তরুণীরাও আমাদের সন্তানদের তুলনায় অনেক বেশী জেদী আর মারমুখো। পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধনে বাংলাদেশীদের মত পারস্পরিক নিবিড় বা ঘনীভূত নয় তারা। ক্লাব, নাইট ব্লাব, উম্মাদনা আর জীবন উপভোগে বেপরোয়া নেপালীদের পরিচয় ও গোলমেলে। সবার তুলনায় এগিয়ে থাকা এই আমরাই এখন ধিরে ধিরে অন্য ধরনের হয়ে উঠছি। এদ্দিন ধরে তিল তিল শ্রম আর নিষ্ঠায় গড়ে ওঠা শান্ত নিয়মনিষ্ঠ, আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ইমেজটিও আমরা ধরে রাখতে চাইছি না। দেশের রাজনীতি ও রাজনৈতিক দলের কারণে আমাদের ইমেজ এখন তোপের মুখে। বিদেশের মাটিতে মন্ত্রীকে হেনস্থা করার দুঃসাহস এক দিকে যেমন আতঙ্কের অন্যদিকে উদ্বেগেরও বটে। উদ্বেগ এই কারণে, আমাদের রাজনৈতিক তৈরীতার মূল সূত্রই হচ্ছে “হে কারে নাহি চিনে, সমানে সমান’, তার মানে সামনে যারা ক্ষমতায় আসবেন বা যদি আসতে পারেন তাঁদের কপালেও দূর্ভোগ আছে, লাঞ্ছনা আর অপমান অপেক্ষা করছে। এটা অনাকাঙ্ক্ষিত ও অপ্রত্যাশিত। প্রতিবেশী যে দেশগুলোর কথা উল্লেখ করলাম তাঁরাও কিন্তু এক বিষয়ে এগিয়ে আছে। তাঁদের মারামারি হানাহানি বা উগ্রতার সাথে দেশের রাজনীতির যোগ নেই। যে কারণে তা সমাজ ও রাষ্ট্রকে চিন্তিত করলেও উদ্বেগাকূল বা ভয়ার্ত করে না। রাজনৈতিক কলহ ও তার আন্তর্জাতিক বিস্তৃতি সভ্য দেশগুলোর অপছন্দ। তারা এ দায়িত্ব বা সামলানোর কাজটি গোয়েন্দা সংস্থা সেনা পুলিশ ও নিরাপত্তা কর্মীদের দিয়ে রাষ্ট্র ও সমাজকে নিশ্চিত রাখতে আগ্রহী। ফরে এ জাতীয় যে কোন ঘটনাই অন্য দেশগুলোর আইন-শৃঙ্খলা আর নিরাপত্তাজনিত কারণে সর্বোচ্চ মনযোগ চাইবে। সে চাওয়া থেকেই জন্ম নেবে বাংলাদেশ-বিদ্বেষ। আমরা কি তা চাই? রাজনৈতিক দলের ক্ষমতারোহণ বা সিংহাসন ত্যাগ তো আদলে একটি প্রক্রিয়া, যুগ যুগ থেকে কালান্তরে চলে আসা এই প্রক্রিয়ার আধুনিক নামই গণতন্ত্র। সভ্য মানুষ তাঁর মেধায় এই পন্থা আবিষ্কার করে গ্রহণযোগ্য করে তুলেছে। মানবতা ও সভ্যতার সাথে চলার মন্ত্রও চাই। সে জায়গাটিতে অবোধ বা বেপরোয়া হবার কারণে আজ আমরা দেশের পাশাপাশি বিদেশেও উগ্র হয়ে উঠছি। দেশের রাজনীতির কাজ রাজনীতি দেশেই করবে তার দায়িত্ব নয় পৃথিবীর সব দেশে শাখা ও ব্রাঞ্চ খুলে বসা, তার দরকার নেই ঘরের খেয়ে দুনিয়ার মেষে চড়ানো। আমাদের ইতিহাস মুক্তিযুদ্ধের গৌরব বঙ্গবন্ধুর ভাবমূর্তি যেমন সবার তেমনি শত্রু বা দুশমন ও পক্ষ বিপক্ষের নয়। এটা মেনে যার যার মত অবস্থান থেকে শান্তি ও সহিষ্ণুতার লক্ষে কাজ করলেই উগ্রতার আগুন নিভে আসবে। বাংলাদেশের মানুষ দেশের ভেতরে ও চাইরে জীবন পণ করে একটু একটু অর্জন করে। সে অর্জন জঙ্গী, উগ্র বা বেপরোয়া মনোভাবে বিনষ্ট করলে সময় ছেড়ে কথা বলবে না। আমাদের আসল বৈশিষ্ট্য, ইমেজ ও জীবন যাপন আমাদের দেশের মাটি ও প্রকৃতির মতই স্বচ্ছ, নরম ও নির্মল। আমরা জাতীয় সঙ্গীতে কাঁদি, ঈদে কোলাকুলি করি, পুজোয় নেচে গেয়ে একাত্ম হয়ে গাই “আমি তোমায় ভালোবাসি”। ভালোবাসার এই বন্ধন ও মায়া ভেঙ্গে আমাদের উগ্র না করে তোলার জন্য অন্ধ রাজনীতির কাছে প্রার্থনা জানাই।, আমরা আগের মতই শান্তিতে থাকতে চাই। (সিডনি থেকে)

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন