অনুমোদনহীন ক্লিনিকে গিয়া ভুয়া চিকিত্সকের ব্যবস্থাপত্র লইয়া লাইসেন্সবিহীন ঔষধের দোকান হইতে ভেজাল-নকল ঔষধ কিনিয়া রোগী ঘরে ফিরিলেন এবং অতপর তাহার প্রাণ সংহার ঘটিল কিংবা বিপন্ন হইয়া উঠিল— সারাদেশে এইরকম ঘটনা হামেশাই ঘটিতেছে। পত্রিকান্তরের খবর হইতে জানা গেল, দিন দুই আগেই চট্টগ্রাম মহানগরে অভিযান চালাইয়া র্যাব আটক করিয়াছে আট ভুয়া চিকিত্সক। তাহাদের সকলের নামের শেষে বড় বড় ডিগ্রি উল্লেখ করা আছে। তাহাদের কেহ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ফেলো, কেহবা বাত ব্যথা বিশেষজ্ঞ, কেহ এফসিপিএস, কেহবা মেডিসিন বা শিশু বিশেষজ্ঞ। নিজেদের যোগ্যতার সনদ দেখাইতে ব্যর্থ এই সকল ভুয়া চিকিত্সককে ভ্রাম্যমাণ আদালত কারা ও অর্থদণ্ড দিয়াছে। কিন্তু ইহাতে চিকিত্সা-প্রতারকদের দৌরাত্ম্য থামিবে বলিয়া মনে হয় না। বর্তমানে চট্টগ্রামে এমবিবিএস পাস না করিয়া নিয়মিত রোগী দেখিতেছেন সহস্রাধিক ভুয়া ডাক্তার। তাহাদের মধ্যে অন্তত ৩০ জনকে শনাক্ত করিয়া ইতোপূর্বে দণ্ড দিয়াছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত, জরিমানাও করিয়াছেন। কিন্তু জরিমানার টাকা পরিশোধ করিয়া তাহারা পুনরায় ডাক্তারগিরি ফলাইতেছেন, ফার্মেসি কিংবা ডায়াগনস্টিক সেন্টার বদল করিয়া রোগীও দেখিতেছেন হরদম। কেবল চট্টগ্রামে নহে, রাজধানী ঢাকাসহ সমগ্র দেশজুড়িয়াই এই চিত্র দেখা যাইবে। ভ্রাম্যমাণ আদালতের সীমিত অভিযান বিশেষ কাজে দিতেছে না, ভুয়া ডাক্তারদের কেহ কেহ ধরা পড়িলেও লঘু শাস্তিভোগ শেষে পুনরায় রোগী মারিয়া লক্ষপতি হইবার প্রতারণায় সক্রিয় হইয়া উঠিতেছে।
ঝাড়-ফুঁক বা তাক-তুক করিয়া লোক ঠকাইবার দিন শেষ হইয়াছে। এখন চলিতেছে বিজ্ঞানের যুগ। সুতরাং বিজ্ঞানের লেবাসই হইয়া উঠিয়াছে প্রতারকের ভূষণ। দেশে পাস করা প্রকৃত চিকিত্সকের সংখ্যা কম থাকায় দেশব্যাপী এই ধরনের প্রতারকরা নকল কাগজপত্র যোগাড় করিয়া বিশেষজ্ঞ চিকিত্সক বনিয়া যাইতেছে। তাহাদের কেহ কেহ আবার দেশের নানা অঞ্চলে ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারও খুলিয়া বসিয়াছে। যদিও বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল (বিএমডিসি) অ্যাক্ট-২০১০ অনুযায়ী ন্যূনতম এমবিবিএস কিংবা বিডিএস ডিগ্রিধারী ব্যতীত কেহ নামের পাশে ‘ডাক্তার’ লিখিতে পারিবেন না। নিয়মের ব্যত্যয় ঘটিলে সর্বোচ্চ তিন বত্সর কারাদণ্ড অথবা এক লক্ষ টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করা যাইবে। যদি কেহ একই অপরাধ বারংবার করেন তাহা হইলে আইন অনুযায়ী তাহাকে ৫০ হাজার টাকা বাড়তি অর্থদণ্ডে দণ্ডিত করা যাইবে। আইনে এমত বিধান থাকিলেও দেশজুড়িয়া ভুয়া ডাক্তার, ক্লিনিক ও ঔষধের কারণে হাজার হাজার চিকিত্সার্থী নিয়মিত প্রতারিত হইতেছেন। দেশের সরকারি হাসপাতালগুলিতে স্বাস্থ্যসেবার মান আশাব্যঞ্জক নহে। স্বাভাবিকভাবেই মানুষ প্রাইভেট ক্লিনিকের দিকে ঝুঁকিতেছে। আর প্রতারকেরা এই সুযোগই লইতেছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে অবৈধ ক্লিনিক গড়িয়া উঠিবার পাশাপাশি ভুয়া চিকিত্সকের সংখ্যাও বাড়িয়া চলিয়াছে। ভুয়া ডাক্তার শনাক্তকরণ বিষয়ে নিয়মিতই প্রতিবেদন প্রকাশিত হইতেছে। এই সকল সংবাদে উঠিয়া আসিয়াছে কিভাবে ভুয়া ডাক্তারদের দ্বারা প্রতারিত হইতেছে রোগীরা। ভেজাল ও নকল ঔষধ বাংলাদেশে দীর্ঘকাল ধরিয়াই স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে একটি বড় সমস্যা। কিন্তু ইহার পাশাপাশি ভুয়া বিশেষজ্ঞ ডাক্তাররা আমাদের জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি হইয়া দাঁড়াইয়াছে। তাহারা রাজধানীসহ দেশের নানা অঞ্চলে বত্সরের পর বত্সর চিকিত্সার নামে মানুষ হত্যা করিতেছে, সেইসঙ্গে রোগীদের নিকট হইতে হাতাইয়া লইতেছে বিপুল পরিমাণ টাকা। ফলে বিশেষজ্ঞ চিকিত্সক নামধারী এইসকল অপরাধী যে সামাজিকভাবে যথেষ্ট ক্ষমতাবান তাহা সহজেই উপলব্ধি করা যায়। কেবল ঝটিকা অভিযানের মাধ্যমে নামমাত্র শাস্তিবিধান নহে, শাস্তি কঠোরতর করা আবশ্যক। সেইসঙ্গে, প্রতিটি শহরে সরকার ও সমাজসেবা সংগঠনগুলির মাধ্যমে বিপুল প্রচার চালাইয়া জনগণকে প্রতারক ডাক্তার হইতে সতর্ক করা আবশ্যক। প্রয়োজনে, শহরের জনবহুল স্থানগুলিতে প্রতারক ডাক্তারদের ছবি ও নাম ফলাও করিয়া প্রকাশের মাধ্যমে রোগীদেরকে জীবন রক্ষা করা যাইতে পারে। সৃজনশীল প্রচার এবং কঠোর আইন ও বিচারিক ব্যবস্থার মাধ্যমে বিপন্ন চিকিত্সাপ্রার্থীদের পার্শ্বে সরকারকেই প্রথমত দাঁড়াইতে হইবে।
