যখন বয়স কম ছিল তখন দেশ-বিদেশে ঘুরে বেড়ানোর একটা সখ ছিল, এখন আর সেই সখ নেই। পৃথিবীর নানা বিচিত্র দেশ থেকে নিজের সাদামাটা দেশটাকেই বেশি ভালো লাগে। তবে আমি কখনো বিষুব রেখা পার হইনি, তাই দক্ষিণ গোলার্ধের রাতের আকাশের নক্ষত্ররাজি দেখতে কেমন লাগে সেটা নিয়ে একটা সূক্ষ্ম কৌতূহল ছিল। আকাশের নক্ষত্রদের সাথে আমার পরিচয় হয়েছিল একাত্তরে। বিনিদ্র রাতে যখন আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতাম তখন মনে হতো সেগুলো বুঝি গভীর মমতা নিয়ে পৃথিবীর দিকে তাকিয়ে আছে। দক্ষিণ গোলার্ধে গিয়ে আকাশের দিকে তাকালে আরো নতুন নক্ষত্রের সাথে পরিচয় হবে। তাছাড়া রাতের আকাশের সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্রটি দক্ষিণ গোলার্ধে একটা ভিন্ন সৌন্দর্য নিয়ে দেখা দেয়; সেটা দেখারও আগ্রহ ছিল। তাই যখন অস্ট্রেলিয়ার বাংলা সাহিত্য সংসদ আমাকে মেলবোর্নে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল আমি যেতে রাজী হয়ে গিয়েছিলাম। আমি ভীতু ধরনের মানুষ, একা ভ্রমণ করতে সাহস পাই না, তাই যখন আমার স্ত্রী সাথে যেতে রাজী হল তখন শেষ পর্যন্ত প্লেনে চড়ে বসলাম।
মেলবোর্ন পৌঁছানোর পর একটি অত্যন্ত অভিজাত ধরনের বিশেষ ট্রেনিং পাওয়া কুকুর আমাদের সবকিছু শুঁকে যখন অনুমতি দিল যে আমরা অস্ট্রেলিয়ায় পা দিতে পারি; তখন আমরা বের হয়ে এলাম। আমাদের অভ্যর্থনা জানানোর জন্য মেলবোর্নের বাংলা সাহিত্য সংসদের প্রায় সব সদস্য এয়ারপোর্টে চলে এসেছেন, তারা আমার সাথে এমনভাবে কথা বলতে লাগলেন যেন আমি খুব বড় একজন সাহিত্যিক এবং আমার সন্দেহ হতে শুরু করল যে আমি ভুল জায়গায় চলে এসেছি কী না!
বাংলা সাহিত্য সংসদ বাংলাদেশ এবং পশ্চিম বাংলার বাঙালিদের একটা সংগঠন। বিদেশের মাটিতে যারা থাকেন দেশের জন্য তাদের ভিন্ন এক ধরনের মায়া থাকে। যারা কখনো দেশ ছেড়ে যাননি তারা আসলে কখনো দেশের জন্য এই বিচিত্র মায়াটি অনুভব করতে পারবেন না।
দেশের প্রতি এই মমত্ববোধ থেকে বাংলা সাহিত্য সংসদ মেলবোর্ন শহরে নানা কিছুর আয়োজন করে থাকে, তার একটি হচ্ছে বাংলাদেশ এবং পশ্চিম বাংলা থেকে সাহিত্যিকদের নিয়ে আসা। তাদের আয়োজনে সুনীল শীর্ষেন্দু সমরেশ মজুমদারের মত সাহিত্যিকরা এসেছেন এবং সেই একই আয়োজনে আমিও চলে এসেছি, নিজের সাহস দেখে আমি নিজেই অবাক হয়ে গেলাম!
দেশে আমাকে নানা অনুষ্ঠানে যেতে হয়, শিক্ষকতা করি তাই কথা বলাই আমার কাজ, সেজন্য বক্তৃতা দিতেও আমার কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু তাইবলে সাহিত্যিক হিসেবে শত শত মানুষের সামনে জ্ঞানগর্ভ বক্তব্য দেয়া? এটি আমার জন্য হবে পুরোপুরি নতুন অভিজ্ঞতা। বাচ্চাদের জন্য বানিয়ে বানিয়ে গালগল্প লিখি, সেটা তো আর সাহিত্য নয়, কিন্তু সেটা কাকে বোঝাব?
সাহিত্য সভাটি শেষ পর্যন্ত ভালোয় ভালোয় শেষ হয়েছিল। শিক্ষক হওয়ার কিছু বিশেষ সুবিধা আছে, সারা পৃথিবীতেই আমার ছাত্র-ছাত্রী। এখানেও তারা অনেকে দল বেঁধে চলে এল। বক্তব্যের শেষে একটা প্রশ্নোত্তর পর্ব ছিল, আয়োজকরা সেটা নিয়ে একটু দুর্ভাবনায় ছিলেন। এটি নতুন শুরু হয়েছে। রাজাকার টাইপের মানুষরা দেশে সুবিধা করতে পারে না, বিদেশে সভা-সমিতিতে এসে নাকী যা কিছু করে ফেলতে পারে। আমি আয়োজকদের অভয় দিলাম রাজাকার টাইপের মানুষদের কেমন করে সামলাতে হয় সেটি নিয়ে কবি রবীন্দ্রনাথ কবিতা পর্যন্ত লিখে গেছেন, ‘.....যখনি দাঁড়াবে তুমি সম্মুখে তাহার, তখনি সে / পথকুক্কুরের মত সংকোচে সত্রাসে যাবে মিশে।’
কিন্তু সেরকম কিছুই হল না। সাহিত্য থেকে দর্শক শ্রোতার বেশি আগ্রহ ছিল শিক্ষা নিয়ে, দেশ নিয়ে, দেশের ভবিষ্যত্ নিয়ে। এগুলো আমারও প্রিয় বিষয়, দেশ নিয়ে সব সময় স্বপ্ন দেখি, সেই স্বপ্নের কথা দশজনকে বলতে আমার কখনো সমস্যা হয় না। (তবে স্বীকার করতে দ্বিধা নেই যখন একজন দর্শক আমার কাছে জানতে চাইল আমি কেন গোঁফ রাখি; আমি পুরোপুরি হকচকিয়ে গিয়েছিলাম। (আমি কিছু বলার আগেই আমার স্ত্রী যখন হল ভরা মানুষকে এই প্রশ্নের উত্তর দিয়ে দিল তখন আমার মুখ দেখানোর উপায় নেই!)
বাংলা সাহিত্য সংসদের আনুষ্ঠানিক সাহিত্য সভাটি ছিল মাত্র কয়েক ঘণ্টার কিন্তু আমরা সংসদের সদস্যদের সাথে ঘরোয়া পরিবেশে নিরবচ্ছিন্নভাবে সময় কাটিয়েছি। প্রতি রাতেই কারো বাসায় সবাই একত্র হয়েছি এবং আমরা বাঙালিরা যে কাজগুলো খুব ভালো পারি—খাওয়া এবং চুটিয়ে আড্ডা দেয়া অত্যন্ত দক্ষতার সাথে সেগুলো করা হয়েছে। যে মানুষগুলোকে আগে কখনো দেখিনি তাদের থেকে বিদায় নেবার সময় সবার চোখে পানি—এরকম বিচিত্র ঘটনা বাঙালি ছাড়া অন্য কোনো মানুষের জীবনে ঘটেছে কীনা আমার জানা নেই। মাঝে মাঝেই মনে হয় ভাগ্যিস বাঙালি হয়ে জন্মেছিলাম, তা না হলে কতো কিছু যে অজানা থেকে যেতো!
২.
মেলবোর্ন শহর পৃথিবীর সবচেয়ে বাসযোগ্য শহর। আমি সেখানে গিয়েছি ঢাকা শহর থেকে, যারা বাসযোগ্য শহরের সার্টিফিকেট দেন তারা ঢাকা শহরকে পৃথিবীর সবচেয়ে বাসের অযোগ্য শহরের সার্টিফিকেট দিয়েছেন। (আসলে ঢাকা শহর দুই নম্বর, এক নম্বর বাসের অযোগ্য শহর হচ্ছে সিরিয়ার রাজধানী দামেস্কাস। সেখানে বিষাক্ত গ্যাস দিয়ে মানুষ মারা হয়, যুদ্ধে ক্ষত-বিক্ষত একটি শহর, এরকম একটা শহরের সাথে প্রতিযোগিতা করা সোজা কথা না। আমার ধারণা যারা বাসের অযোগ্যতার সার্টিফিকেট দেন তারা মে মাসের ৫ তারিখে ঢাকা শহরে হেফাজতে ইসলামের তাণ্ডব দেখার সুযোগ পেলে প্রথম পুরস্কারটা নির্ঘাত দামেস্কাসকে না দিয়ে ঢাকা শহরকে দিয়ে দিতেন।)
যে কয়দিন মেলবোর্নে ছিলাম তখন বোঝার চেষ্টা করেছি এই শহরটি কেন সবচেয়ে বাসযোগ্য শহরের পুরস্কার পেয়েছে। বাসযোগ্য শহর হতে হলে মানুষকে বাস করতে হবে কিন্তু মজার ব্যাপার হচ্ছে মেলবার্নে পথে-ঘাটে মানুষই চোখে পড়েনি! পুরো দেশেই মানুষ মাত্র দুই কোটি (এবং এটি শুধু দেশ নয়—মহাদেশও বটে), তাই চারিদিক ফাঁকা। শহরে উঁচু বিল্ডিং নেই ছোট ছোট খেলনার মতো বাসা। বাসাগুলো ক্যালেন্ডারের ছবির মতোন। বাসযোগ্য শহরের সার্টিফিকেট ঠিক কী কী কারণে পেয়েছে জানা নেই, তবে বৈচিত্র্যে এই শহরটি অভিনব। দক্ষিণ গোলার্ধ বলে এখানে সবকিছু উল্টো, আমাদের দেশে গ্রীষ্ম শেষ হয়ে শীত আসছে, সেখানে শীত শেষ হয়ে গ্রীষ্ম আসছে। তবে মনে হল গ্রীষ্ম আসার কোনো তাড়াহুড়ো নেই, এখনো প্রচুর শীত, রাতে লেপমুড়ি দিয়ে হিটার জ্বালিয়ে ঘুমাতে হয়। মেলবোর্ন শহরে একই দিনে কখনো প্রচণ্ড গরম, কখনো কনকনে শীত, কখনো বৃষ্টি, আবার কখনো উথাল-পাতাল হাওয়া। ঘর থেকে বের হওয়ার সময় মানুষজন নাকি চারটি ভিন্ন ভিন্ন আবহাওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়ে বের হয়।
পৃথিবীর সবচেয়ে বাসের অযোগ্য (প্রায়) শহর থেকে সবচেয়ে বাসযোগ্য শহরে পা দেয়া নিঃসন্দেহে একটা চমকপ্রদ অভিজ্ঞতা। তবে বলে রাখি ঢাকা ফিরে আসার পর যখন প্লেন থেকে নেমেছি, আগুনের বাষ্পের মতো দুঃসহ গরমের একটা ঝাপটা অনুভব করেছি। হরতালের মাঝে বাসায় ফিরে এসেছি, এসে দেখি বাসায় পানি নেই, এর মাঝে হঠাত্ করে ইলেকট্রিসিটি চলে গেল, অন্ধকারে মশাদের সে কী আনন্দ, আমাদের ঘিরে তাদের মহোত্সব! কিন্তু মজার ব্যাপার হলো আমার এতোটুকু বিরক্তি অনুভব হলো না বরং মনে হলো আহা, ঢাকার মতো এরকম ভালোবাসার শহর কয়টি আছে পৃথিবীতে?
৩.
আমেরিকা গেলে মানুষ যেরকম নায়েগ্রা ফলস না দেখে ফিরে আসে না ঠিক সেরকম অস্ট্রেলিয়া গেলে মানুষ ক্যাঙ্গারু না দেখে ফিরে আসে না। যখন অস্ট্রেলিয়া ছিলাম তখন আমাদের ক্যাঙ্গারু দেখার সখ পূরণ করিয়ে দিয়েছিল জীব বিজ্ঞানী আবেদ চৌধুরী। (আবেদ চৌধুরী আর তার স্ত্রী টিউলিপ আমাদের দীর্ঘদিনের পারিবারিক বন্ধু। আমরা আমেরিকাতে এক ইউনিভার্সিটিতে পিএইচ.ডি এর জন্য কাজ করেছিলাম। অস্ট্রেলিয়া এসে তার সাথে দেখা না করে ফিরে যাওয়া যে কোনো হিসেবেই অপরাধ!) ক্যানবেরা এয়ারপোর্ট থেকে বাসায় যেতে যেতে দেখলাম পথের দুই পাশে ক্যাঙ্গারু। রাতের অন্ধকারে গাড়ীর ধাক্কা খেয়ে মারা পড়েছে। জীবিত না হোক তবুও তো ক্যাঙ্গারু, আমি এতেই সন্তুষ্ট ছিলাম, কিন্তু আবেদ চৌধুরী আমাদের জীবিত ক্যাঙ্গারু না দেখিয়ে ছাড়বে না। তাই পরদিন কয়েক ঘণ্টা ড্রাইভ করে আমাদের নিয়ে এক জায়গায় হাজির হলো সেখানে পথের দুই পাশে অসংখ্য ক্যাঙ্গারু। আমাদের দেশের এমপিরা যখন তাদের এলাকায় যান তখন স্কুলের হেডমাস্টাররা যেভাবে ছাত্রছাত্রীদের ধরে এনে রাস্তার দুই পাশে রোদের মাঝে দাঁড় করিয়ে রাখেন, ক্যাঙারুরা ঠিক সেভাবে দাঁড়িয়ে ছিল। আমরা যেরকম বিস্ময় নিয়ে তাদের দিকে তাকিয়েছিলাম মনে হলো তারাও সেই একই রকম বিস্ময় নিয়ে আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে। ক্যাঙারুর চলাফেরা খুব মজার। তাদের মতো লেজে ভর দিয়ে জোড়া পায়ে লাফিয়ে আর কোনো প্রাণী ছুটতে পারে না। তার থেকেও মজার হচ্ছে ক্যাঙারু মায়ের পেটের থলেতে ক্যাঙারুর বাচ্চার বসে থাকা। বাচ্চাগুলোকে দেখে মনে হয় পৃথিবীতে বুঝি এর থেকে আরামের কোনো জায়গা নেই।
ক্যানবেরা অস্ট্রেলিয়ার রাজধানী, সবগুলো দেশের এম্বেসী কিংবা হাইকমিশন এখানে। এগুলোর পাশ দিয়ে যাবার সময় হঠাত্ চোখে পড়ল রাস্তার পাশে অপূর্ব একটা বিল্ডিং। চাঁদ তারা আঁকা লাল পতাকা দেখে বুঝতে পারলাম এটা তুরস্কের হাইকমিশন। টিউলিপ আমাদের বলল, এই জমিটুকু বাংলাদেশকে দেয়া হয়েছিল এবং শেখ হাসিনা এখানে বাংলাদেশ হাইকমিশন তৈরি করার জন্যে ভিত্তিপ্রস্তরও বসিয়ে গিয়েছিলেন। পরের বার বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এসে আওয়ামী লীগের আমলে বসানো ভিত্তি প্রস্তরে যেন বিল্ডিং তোলার অপমান সহ্য করতে না হয় সেজন্যে জমিটুকু হাতছাড়া হতে দিয়েছে। তথ্যটি বিচিত্র হলেও অবিশ্বাস্য নয়, দেশের তথ্য পাচার হয়ে বাইরে যেন চলে যেতে পারে সেজন্যে এই সরকার একবার বিনি পয়সায় সাবমেরিন ক্যাবলে যুক্ত হওয়ার সুযোগটি হাতছাড়া করে পুরো দেশের মানুষকে ইন্টারনেট থেকে বঞ্চিত করেছিল!
ক্যানবেরার অসংখ্য এম্বেসী এবং হাইকমিশনের মাঝে সবচেয়ে চমকপ্রদ এম্বেসীটি একটা তাঁবুর মাঝে। তাদের পুরনো পার্লামেন্ট ভবনের সামনে সেই দেশের আদিবাসীরা নিজেদের অধিকার আদায় করার জন্যে বিশাল একটা পতাকা উড়িয়ে তাঁবুর মাঝে এম্বেসী বসিয়ে রেখেছে। সরকার তাদের ঘাটায়নি। বছরের পর বছর সেভাবেই রয়ে গেছে। আমি তাদের দেখে আমার নিজের দেশের আদিবাসীর কথা স্মরণ করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। সেনাবাহিনী যেন জাতিসংঘের লোভনীয় চাকরি নিরবচ্ছিন্নভাবে উপভোগ করতে পারে সেজন্যে এই দেশের আওয়ামী লীগ সরকার ঘোষণা দিয়ে রেখেছে এই দেশে আদিবাসী বলে কিছু নেই। এরচাইতে মমত্বহীন কিছু হতে পারে বলে আমার জানা নেই।
অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসীরাও মমত্বহীনতার স্বাদ অনেকদিন থেকে পেয়ে এসেছে। সাদা চামড়ার মানুষেরা প্রথম যখন এই দেশ দখল করেছে তখন তারা ফূর্তি করার জন্যে, মানুষ যেভাবে পাখি শিকারে যায়, তারা সেভাবে আদিবাসী শিকারে যেতো। কেউ কোনো আদিবাসীর মাথা কেটে আনতে পারলে তাকে পুরস্কার দেয়া হতো। মাত্র কিছুদিন আগেও আদিবাসী মায়ের বুক খালি করে আদিবাসী সন্তানদের সরিয়ে নেয়া হয়েছিল। অতীতের এই নিষ্ঠুরতার জন্যে অস্ট্রেলিয়ার জনগণ আনুষ্ঠানিকভাবে পার্লামেন্টে আদিবাসীদের কাছ থেকে ক্ষমতা চেয়েছে। কিন্তু এতোদিনে যা হবার তা হয়ে গেছে, অস্ট্রেলিয়ার এই বিশাল ভূখণ্ডে সত্যিকার আদিবাসীদের কোনো চিহ্ন বলতে গেলে নেই—সারা পৃথিবীতে এরকম নিষ্ঠুরতার উদাহরণ এতো বেশি যে, মনে হয় এটাই বুঝি নিয়ম। সবকিছু কেড়ে নিয়ে কোনো এক সময়ে ক্ষমা চেয়ে নিজেদের পিঠে নিজেরাই নৈতিকতার একটা সীল মেরে দেয়া।
৪.
আমাদের অনেক ছাত্র-ছাত্রী অস্ট্রেলিয়া থাকে। আমরা মেলবোর্ন এসেছি শুনে অনেকেই দেখা করতে এসেছে। এক সময়ে তারা কমবয়সী ছাত্র কিংবা ছাত্রী ছিল। এখন তারা বড় হয়েছে, প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, স্বামী আছে স্ত্রী আছে ফুটফুটে ছেলেমেয়ে আছে, দেখে বড় ভালো লাগে। শুধু আমাদের সাথে দেখা করার জন্যে কেউ শত শত কিলোমিটার থেকে ড্রাইভ করে এসেছে, কেউ কেউ প্লেনে উড়ে এসেছে। তাদের নিয়ে হাজারো রকমের স্মৃতিচারণ করতে করতে রাত পার হয়ে যাবার অবস্থা! বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের ঘটনাগুলোর অনেক কিছুই ছিল মোটামুটি ভয়ংকর, এখন হঠাত্ করে সেগুলোকেই মনে হয় মজার, শুনে সবাই হেসে গড়াগড়ি খায়, সেরকম অবস্থা। আমরা যখন গিয়েছি তখন সবেমাত্র ইলেকশান শেষ হয়েছে। সেই দেশে সবাইকে ভোট দিতে হয়, ভোট না দিলে সত্তর ডলার জরিমানা। একজন বলল, ইলেকশানের খবর পেয়ে তার মা খুব ব্যস্ত হয়ে দেশ থেকে তাকে ফোন করে বলেছেন, বাবা ইলেকশানের দিন খবরদার ঘর থেকে বের হবি না—কখন কোথায় কী বিপদ হয়। শুনে আমরা সবাই হেসেছি, কিন্তু তার মাঝেও বুকের মাঝে কোথায় জানি একটা ব্যথার খোচা অনুভব করেছি—আমাদের দেশেও ইলেকশান আসছে কিন্তু সেটা নিয়ে আমাদের সবার মাঝে কী ভয়ানক একটা অনিশ্চয়তা, কী হয় সেটা ভেবে কী একটা অসহায় আতঙ্ক!
খুব অল্প সময়ের জন্যে অস্ট্রেলিয়া গিয়েছিলাম তাই আমরা আমাদের ছাত্র-ছাত্রীদের খুব বেশি সময় দিতে পারিনি, কিন্তু তার মাঝেই তারা সবাইকে নিয়ে দল বেঁধে সমুদ্রোপকূলে, বনে-জঙ্গলে বেড়াতে নিয়ে চলে গেল। যত ধরনের বেড়ানো আছে তার মাঝে সবচেয়ে মজার বেড়ানো হচ্ছে যখন নিজেদের কিছু করতে হয় না, অন্যেরা সবকিছু করে দেয়। যারা সবকিছু করে দেয় তারা যদি ছাত্র-ছাত্রী হয় তাহলে তো কথাই নেই! (মজার ব্যাপার হচ্ছে দেশে ফিরে আসার পর দেখি আমরা কখন কোথায় কী করেছি তার সবকিছু সবাই জানে। ফেসবুকের কল্যাণে কিছু ঘটার আগেই সেই ঘটনার কথা সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ে। এরকম একটা কিছু যে হতে পারে, আমরা কী অল্প কিছুদিন আগেও সেটা জানতাম? ভবিষ্যতে আরো কিছু কী ঘটতে পারে সেটা এখন আমরা কল্পনাও করতে পারছি না?)
৫.
যারা এই লেখাটি পড়ছে তারা নিশ্চয়ই আবিষ্কার করে ফেলেছে আসলে এখানে অস্ট্রেলিয়ার কোনো কথা নেই। এখানে সব কথা অস্ট্রেলিয়ায় বসবাসকারী বাঙালিদের কথা! আসলে কেউ যদি কয়েকদিনের জন্যে কোনো দেশে যায় তাহলে সেই দেশকে সত্যিকার অর্থে অনুভব করার কোনো সুযোগ থাকে না। একটা দেশকে অনুভব করতে হলে সেই দেশে দীর্ঘদিন থাকতে হয়। তখন সেই দেশের বাহ্যিক চকচকে দৃশ্যের পেছনে গ্লানিগুলো চোখে পড়ে, ব্যর্থতাগুলো দেখা যায়।
যারা সেই দেশে থাকেন তাদের কাছে একটা তথ্য পেয়েছি যেটা আমাকে অবাক করেছে। স্কুলের লেখাপড়া নিয়ে অভিভাবকদের মাঝে এক ধরনের হতাশা, হতাশার মূল কারণ সেখানে যথেষ্ট ভালো শিক্ষক নেই। শিক্ষকের বিশেষ অভাব বিজ্ঞান, গণিত এসব বিষয়ে। সমস্যার সমাধান হবে সেরকম আশাও নেই—বিশ্ববিদ্যালয়ে বিজ্ঞান বিষয়ে ছাত্র-ছাত্রী নেই, প্রায় বিশ্ববিদ্যালয়েই এই বিষয়গুলোই তুলে দেয়া হচ্ছে! শুনে মনে হয় হুবহু আমাদের দেশের কাহিনী। এতো সম্পদ নিয়েও অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশ হিমশিম খাচ্ছে, তাহলে আমরা কেন অভিযোগ করছি? শিক্ষার পিছনে জিডিপির মাত্র ২.২ শতাংশ খরচ করে আমরা তো খুব খারাপ করিনি! আরেকটু বেশি হলে না জানি কী হতো! অস্ট্রেলিয়ায় জনসংখ্যা দুই কোটি আর আমাদের দেশে স্কুলেই পড়ে তিন কোটি বাচ্চা-কাচ্চা। সরকার যদি লেখাপড়ার গুরুত্বটা বুঝে সেনাবাহিনীর বাজেট না বাড়িয়ে শিক্ষার বাজেট বাড়াতো তাহলে এই দেশে কী বিপ্লব ঘটে যেতে পারতো কেউ কী কখনো কল্পনা করে দেখেছে?
শুরুতে বলেছিলাম বিষুব রেখা অতিক্রম করার একটা উদ্দেশ্য ছিল আকাশের দিকে তাকিয়ে পৃথিবীর উজ্জ্বলতম নক্ষত্রটি দেখা। সেটা দেখে এসেছি—কী চমত্কার সেই নক্ষত্র। মনে হচ্ছে গভীর মমতা নিয়ে সেটি আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে! ২৫-৯-১৩
লেখক : কথাসাহিত্যিক
