পূর্ণিমা তিথিতে সে কাল রাত্রি

আপডেট : ২৮ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ২১:২৬
বিগত ২৯ সেপ্টেম্বর ২০১২ খ্রিঃ ছিল পবিত্র মধু পূর্ণিমার তিথি। সমগ্র বৌদ্ধ জাতির পবিত্র একটা দিন। বার ছিল শনিবার। আমার চোখে ভাসে সে রাতের স্মৃতি। যখন ভাসে তখন আর দু’চোখ দিয়ে ধরে রাখা যায় না পানি। মনে পড়লে মাঝে মাঝে বুক কেঁপে উঠে, সে রাতে ছুরি তলোয়ারের ঝন ঝন শব্দ, কানে বাজে সে স্লোগান। এমন স্বাধীন দেশে কি আমরা বৌদ্ধ হিসেবে জন্ম নিয়ে অপরাধ করেছি। কি অপরাধ ছিল আমাদের সেই বৌদ্ধের। কি অপরাধ করেছি আমরা? কেন পুড়তে হল আমাদের? এই দিনের কথা লিখতে বসে বার বার চোখ মুছতে হচ্ছে। ঠিক বিকাল পাঁচটা। বাড়ি থেকে বের হয়ে মন্দিরে গেলাম সাদা চিং, লাল চিংয়ের দিকে, পূর্ণিমা বলে মোম পূজা করতে সব মন্দিরে পূজা করতে গেলাম বড় কেয়াং চেরেং ঘাটাতে, সাথে আমার কাকীমাও ছিল। প্রায় আটটার দিকে বের হয়ে বাড়ি আসলাম। তখনও বুঝতে পারলাম না আমাদের মুসলিম ভাইয়েরা একত্র হচ্ছে। যখন নয়টা বাজল তখন আয়োজন শুরু হচ্ছে মিছিলের। এই মিছিল ছিল শুধু বড়ুয়া সমপ্রদায়কে জ্বালিয়ে দেবার মিছিল। পর দিন মধু পূর্ণিমা উপলক্ষে মন্দিরে সংঘদান, ঘরে ঘরে ছিল অনেক আয়োজন। বোতলে সাজানো ছিল মধু। দুপুরে সবাই মধু দান করবে। পূজা নিয়ে র্যালি করার জন্য পূজার বাজারও করে আনল সবাই। কিন্তু পারল না বর্ষাবাস চলাকালীন মধূ দান উদ্যাপন করতে। মিছিল যখন শুরু হল তখন আমরা কয়েকজন বের হয়ে দেখলাম উত্তম বড়ুয়াকে নিয়ে আলোচনা, পবিত্র কোরআনে নাকি পা রাখল উত্তম বড়ুয়ার ফেজবুকে। আমরা আলোচনা করলাম তাকে নিয়ে শাস্তি দিলে হয়তো ঘটনা শেষ হয়ে যাবে। সে উত্তম বড়ুয়া এখনও কোথায় আমরা জানি না। তাকে না খুঁজে জ্বালিয়ে দিল বৌদ্ধ মন্দির, বৌদ্ধ বসত বাড়ি, লুটপাট করল মন্দিরের অনেক মূল্যবান জিনিস। আলোচনা করলাম উত্তম বড়ুয়াকে নিয়ে। সাথে সাথে শুরু হল সে মিছিল, প্রথম মিছিলে শুধু বড়ুয়াদের জ্বালিয়ে দেবার মিছিল। দ্বিতীয় মিছিল আসলো ভেঙ্গে ফেলার মিছিল, তৃতীয় মিছিল আসলো গান পাওডার দেবার মিছিল। দ্বিতীয় মিছিল শেষ হবার পর দেখলাম আসছে ঘটনার মূল পরিচালক। তার সঙ্গে ছিল একজন মেম্বার। আমি ওনাকে বললাম, আপনি আমাদের বাঁচান। আপনারা সামলাতে পারবেন সবকিছু। কিন্তু সেটা না করে আরো উত্সাহ যোগাল। এর পরে ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে বসে থাকলাম। ঘরে আসলো আমার এক মামা দীপন ও সাথে ছিল কানন। যারা আমাদের ঐদিন বাঁচাল। আমাদের বাড়িতে যখন আগুন দিল তখন এই দু’জন মানুষ আমাদের পিছন দিক দিয়ে বের করে দিল। আমরা একটা মই লাগিয়ে আমার কাকার ঘরের চালের উপর দিয়ে পুকুর পাড়ে গিয়ে বসে থাকলাম। কি করুণ দৃশ্য দেখলাম। সকল বৌদ্ধ নর-নারী পুকুর পাড়ে বসে কান্না করছে। আর আমাদের সাথে অনেক নেতা অভিনয় করলো যে, তারা আগুন নিভাতে সাহায্য করেছে। রাত তিনটার দিকে আসলো ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি। এর পরে আসলো কক্সবাজার থেকে অনেক বড় নেতা। যারা আগামী দিনে নির্বাচন করবে। তাই তাদের সঙ্গে ছিল র্যাব ও পুলিশ। আগুন দিবার আগে কোন পুলিশ, র্যাব আমরা দেখিনি। আমাদের বাংলাদেশের প্রশাসন এত দুর্বল যে, বিপদে আসবে না, আসবে নেতাদের সফর সঙ্গী হিসেবে। ইসলাম ধর্মে কোথাও নেই অন্য ধর্মকে জ্বালিয়ে ফেলার কথা। আমাদের ঘরে সব কিছু ছিল, কিন্তু একরাতে ধ্বংস করে দিল একটু একটু সঞ্চয়ের সব কিছু। আমাদের ঘরে আগুন দিতে যখন আসলা তখন অনেক জনকে ফোন করলাম আমাদের বড় ভাইদের। যাদের সাথে একটা সুন্দর সম্পর্ক ছিল। কিন্তু কেউ এগিয়ে আসলো না আমাদের কাছে, এটাই অনেক কষ্ট লাগে। আবার দেখলে লজ্জাও লাগে সেই বড় ভাইদের সামান্য ভুলের কারণে। তারা এত খারাপ হতে পারে। প্রায় এক বছর হয়ে গেল, আমাদের মন্দিরে এখনো অনেক বুদ্ধ আগুনে অর্ধেক পোড়া, অনেক বুদ্ধ দৃষ্টি হীন, অনেক বুদ্ধের হাত নেই, কিছু বুদ্ধের আঙ্গুল নেই, আছে শুধু এক একটা মন্দির। ৩০ সেপ্টেম্বরের পর থেকে উচ্চ পর্যায়ে অনেক মন্ত্রী আসলো রামুতে পুড়ে যাওয়া মন্দির ও বসত বাড়ি দেখতে। ৮ অক্টোবর আসলো মাননীয় জননেত্রী ডিজিটাল সরকারের রূপকার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এর পর তিনি সুন্দর একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে সেনাবাহিনী দ্বারা মন্দির নির্মাণ, আর বিজিবি দ্বারা বাড়ি নির্মাণ করে দিল। মাননীয় প্রধান মন্ত্রীকে সাধুবাদ জানাচ্ছি আমাদের সব কিছু করে দেবার জন্য। কিন্তু আমাদের একটা দুঃখ, আসল অপরাধীরা কেন আমাদের সামনে ঘুরে বেড়াবে? আমরা কি বিচার পাব না ? ক্ষতিপূরণ দিয়ে অপরাধ ক্ষমা করা যায় না। যেখানে আমরা হারিয়ে ফেলেছি সমপ্রীতি, ঐতিহ্য, নিরাপত্তা। তাই আমাদের গান পাওডারের আগুন নিভিয়ে যাবার পরেও জ্বলছে মনের আগুন। যে আগুন কখনো নিভাতে পারবে না। রামু কলেজ।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন