আজ ২৯ সেপ্টেম্বর। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গণিত বিভাগের অধ্যাপক আ ম ম শহীদুল্লার তৃতীয় মৃত্যুবার্ষিকী। আমার অগ্রজপ্রতিম গণিত অঙ্গনের বরেণ্য ব্যক্তিত্ব অধ্যাপক শহীদুল্লা ২০১০-এর এই দিনে পৃথিবীর ধূলি ধূসরিত রৌদ্রকরোজ্জ্বল সংসারের মায়া ত্যাগ করে চলে গেছেন অনন্তের কল্যাণলোকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অবসর গ্রহণের (২০০৩) পর তিনি ঢাকার হাতিরপুল সেন্ট্রাল রোডের বাসায় আমৃত্যু বসবাস করেন। তার শারীরিক ও মানসিক ক্ষয়িষ্ণুতা বেড়ে চলে এবং দীর্ঘদিন বার্ধক্যজনিত রোগে ভোগেন। তিনি স্ত্রী, এক পুত্র, এক কন্যা রেখে গেছেন। স্ত্রী অধ্যাপিকা যোবেদা আখতার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গণিত বিভাগ থেকে অবসর গ্রহণ করেছেন।
অধ্যাপক শহীদুল্লার কর্মজীবন যেন ছিল বহুমুখী। ছাত্র শিক্ষক অফিসার কর্মচারী সবাই তাদের প্রিয়জন এই সুদর্শন শিক্ষকের শিষ্ট আচরণে মুগ্ধ হতেন। তিনি ছিলেন একনিষ্ঠ সমাজসেবকও। মানুষের সমস্যা নিরসনে, মানুষের কল্যাণে তিনি তার অকৃপণ সাহায্যহস্ত বাড়িয়ে দিতেন।
আ ম ম শহীদুল্লার প্রথম চাকরিস্থল ঐতিহ্যবাহী রাজশাহী কলেজ। এরপর চার দশক তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিত বিভাগে অধ্যাপনা করেন। আশির দশকের প্রথমভাগে বিভাগের সভাপতি পদে অধিষ্ঠিত হন। একজন সফল শিক্ষক হিসেবে তার নামডাক ছিল। তিনি স্নাতক পর্যায়ের গণিত বিষয়ক কয়েকটি পুস্তক প্রণেতা (সহগ্রন্থকার পি কে ভট্টাচার্য)। তিনি ছিলেন বাংলাদেশ গণিত সমিতির সম্পাদক (১৯৮৩-৮৫)। কখনো কখনো বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ক্লাবের অন্যতম নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন তিনি। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ কর্মকাণ্ডের সাথেও সংশ্লিষ্ট থাকতেন। অধ্যাপক শহীদুল্লা বাংলা ক্যালেন্ডার সংস্কারের ক্ষেত্রে সরকার গঠিত টাস্কফোর্সের ছিলেন অন্যতম সদস্য।
একজন স্পষ্টবাদী রূপে অধ্যাপক শহীদুল্লার বিশেষ পরিচিতি ছিল। অন্যায়ের বিরুদ্ধে তার কণ্ঠ ছিল সোচ্চার। বক্তৃতা-বিবৃতিতেও তিনি ছিলেন পারঙ্গম।
পাকিস্তানের ইসলামাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার পাঠ চুকিয়ে ১৯৭০-এর ডিসেম্বরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিত বিভাগে যোগদান করি। সেই থেকে দেখেছি বিভাগের ঐতিহ্য, বিভাগের সংস্কৃতি লালন ও বিকশিত করার লক্ষ্যে তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করতেন। উচ্চ শিক্ষার্থে যুক্তরাজ্যে তার অবস্থানকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জাহাঙ্গীরনগরে আমার চলে আসা (১৯৭৫) সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে।
একাত্তরে মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে দেশের স্বাধীনতার সপক্ষে তিনি প্রশংসনীয় ভূমিকা রাখেন। বলা অত্যুক্তি হবে না, অধ্যাপক শহীদুল্লা ছিলেন একজন মানবতাবাদী ও সচেতন নাগরিক। এই মানুষটির প্রতি, এই মনস্বী শিক্ষাবিদের প্রতি ছাত্র-ছাত্রীদের ভালবাসা ছিল অগাধ, শ্রদ্ধা ছিল গভীর।
বাংলাদেশ গণিত সমিতির সভাপতি হিসেবে আমার কার্যকালে (২০০৮-২০০৯) সমিতি ১৯ জন বর্ষীয়ান গণিতবিদকে সম্মাননা প্রদান করে ২২ ফেব্রুয়ারি ২০০৯। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রে আয়োজিত এই মহতী ও প্রাণবন্ত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন উপাচার্য অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক। যেসব গণিতবিদ সম্মাননায় ভূষিত হন অধ্যাপক শহীদুল্লা তাদের অন্যতম। মাস চারেক পরে আরো একজনকে সম্মাননা প্রদান করা হয়। তিনি হলেন ‘জীবন্ত শহীদ’ আখ্যায় ভূষিত ‘দেবদাস’ নাম ধারণকারী অকুতোভয় মুক্তিসৈনিক রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী গণিত অধ্যাপক (১৯৬৭-৭৫) মো. মজিবুর রহমান (৮৫)। বর্তমানে জয়পুরহাটের এক নিভৃত পল্লীতে কালাতিপাত করছেন।
অধ্যাপক শহীদুল্লার মৃত্যু অকাল মৃত্যু নয়। তিনি দীর্ঘায়ু (৭৪) লাভ করেন। জীবন সংগ্রামে জয়ী হন। আর জয়ী হয়েছেন গণিতের জন্য ভালবাসায় উজ্জীবিত কর্মের সাধনায়। আমরা তার আত্মার মাগফেরাত কামনা করি। শোকার্ত পরিবার-পরিজনদের জানাই আন্তরিক সমবেদনা। পরম শ্রদ্ধা নিবেদনে স্মরণ করি শিক্ষার মহান ব্রতে উত্সর্গীকৃত এই গণিতবিদকে।
লেখক: ফেলো, ওয়ার্ল্ড ইনোভেশন ফাউন্ডেশন ও সাবেক সভাপতি, বাংলাদেশ গণিত সমিতি
