[ সা ম্প্র তি ক]

পোশাক শিল্পে অস্থিতিশীলতা কাঙ্ক্ষিত নয়

আপডেট : ২৮ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ২১:২৭
গার্মেন্টস শিল্প মালিকেরা গার্মেন্টস শ্রমিকদের মজুরি ৬শ’ টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব প্রদান করেছেন। বর্তমানে শ্রমিকদের সর্বনিম্ন মজুরি রয়েছে ৩ হাজার টাকা। বেশ কয়েক বছর ধরেই শ্রমিকদের বিভিন্ন সংগঠন শ্রমিকদের মজুরি ৮ হাজার টাকা করার দাবি করে আসছে। বিষয়টি নিঃসন্দেহে যুক্তিসঙ্গত এবং প্রাসঙ্গিক। বিশ্বায়নের যুগে ব্যক্তির জীবন মানের এত মানবেতর অবস্থা কারোই কাম্য হতে পারে না। গত রবিবার ২২.০৯.২০১৩ তারিখে টঙ্গী, কালিয়াকৈর, গাজীপুরসহ নানা এলাকার শত শত গার্মেন্টস শ্রমিক ন্যায্য মজুরির দাবিতে কারখানায় না গিয়ে রাস্তায় নেমে আসে। এরপর তারা বিক্ষোভ প্রদর্শন করে এবং নানা ধ্বংসাত্মক তত্পরতায় লিপ্ত হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ লাঠিচার্জ করে এবং দেড় শতাধিক রাউন্ড গুলি ও কাঁদানে গ্যাস ছুঁড়ে আর এতে শ্রমিক-পুলিশসহ শতাধিক ব্যক্তি আহত হন। এ দিন হাজার হাজার শ্রমিক এক সঙ্গে রাস্তায় বের হওয়ায় টঙ্গী এলাকা কিছু সময়ের জন্য অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। কোনাবাড়ি এলাকার যমুনা নীট গার্মেন্টসের শ্রমিকেরা ফেব্রিক্স গুদামে আগুন ধরিয়ে দেয়। শ্রমিকেরা ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক অবরোধ করে এবং সড়কের পাশের বেশকিছু কারখানা ও যানবাহন ভাংচুর করে। এতে মহাসড়কের উভয় দিকে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। পুলিশ বাধ্য হয়ে সাঁজোয়া যান থেকে রাবার বুলেট ও টিয়ার সেল নিক্ষেপ করে। শ্রমিক অসন্তোষের ধারাবাহিকতায় ২৩ সেপ্টেম্বর রাজধানী ছাড়াও গাজীপুর, টঙ্গী, সাভার, কালিয়াকৈর ও রাজধানীর আশ-পাশের বিভিন্ন পোশাক কারখানার শ্রমিকরা বিক্ষোভ করেন। তারা যানবাহনে আগুন দেয়া, টায়ার জ্বালানো এবং ইট-পাটকেল ছোঁড়া ছাড়াও গাজীপুর আনসার ক্যাম্পে হামলা চালিয়ে ৪টি রাইফেল ও ১৬০ রাউন্ড গুলি লুট করে। পরে পাশের ডোবা থেকে রাইফেল উদ্ধার করা গেলেও গুলি পাওয়া যায়নি। শ্রমিকদের অবরোধের কারণে কোন কোন মহাসড়কে ১ ঘণ্টা থেকে ৩ ঘণ্টা পর্যন্ত যান চলাচল বন্ধ থাকে। হাজার হাজার শ্রমিক রাস্তায় নামার কারণে বিভিন্ন এলাকায় তীব্র যানজটেরও সৃষ্টি হয়। এছাড়া শ্রমিকেরা উত্তেজিত হয়ে নিজস্ব কারখানার (যেখানে তারা কাজ করে) পার্ক করা গাড়ি, মোটরসাইকেল এবং বাইসাইকেলে আগুন ধরিয়ে দেয়। তবে মন্ত্রী, বিজিএমইএ, শ্রমিক নেতা কারো আশ্বাসেই আশ্বস্ত হতে পারছে না শ্রমিকেরা। শ্রমিকদের মজুরি যখন ৬২৭ টাকা করা হয়েছিল তখনও মালিকেরা বলেছিলেন, কারখানা বন্ধ হয়ে যাবে। এরপরও মজুরি বেড়েছে কয়েকগুণ, কিন্তু কারখানা বন্ধ হয়নি। যতবার মজুরি বোর্ড হয়, মালিকেরা কারখানা বন্ধ হয়ে যাবার আশংকার কথা বলেন। এ ক্ষেত্রে একটি কথাই বলা যায় তা হল মালিকদের ভোগ-বিলাসের মানসিকতা ত্যাগ করে খানিকটা হলেও মানবিক হতে হবে। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) এক সংলাপে জানিয়েছে, একজন শ্রমিক কাজ করতে গিয়ে যে পরিমাণ শক্তি ক্ষয় করে তা পূরণ করে উত্পাদন অব্যাহত রাখাও পরিবারের কথা বিবেচনা করলে তার মজুরি হওয়া উচিত ১৭ হাজার ৮শ’ টাকা। তবে তারা দু’ধাপে ৮ হাজার ২শ’ টাকা মজুরি প্রদানের প্রস্তাব জানিয়েছে। প্রথম বছর ৬ হাজার ৫৬০ টাকা এবং পরবর্তী বছরে বাকিটা। উল্লেখ্য যে, সিপিডি সাভার, টঙ্গী, রামপুরা এলাকার পোশাক শিল্প শ্রমিকদের জীবন-মানের ওপরে গবেষণা করে এ তথ্য জানিয়েছেন। তাজরীন ফ্যাশনস্-এ আগুন এবং রানা প্লাজা ধসের পর দেশীয় এবং আন্তর্জাতিকভাবে শ্রমিকের নিরাপত্তা, বেতন জীবনমান বাড়ানোর দাবি সোচ্চার হবার পর গঠিত হয় মজুরি বোর্ড। বোর্ডে শ্রমিক নেতারা সর্বনিম্ন ৮১১৪ টাকা দাবি করেন। মজুরি বোর্ড গঠনের পরও এমন ধ্বংসাত্মক আচরণের মূল কারণ হিসেবে সাধারণ শ্রমিকেরা ৬০০ টাকা মজুরি বাড়ানোর প্রস্তাবকে দায়ী করেছেন। শ্রমিক সংগঠন এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরাও প্রস্তাবটিকে হাস্যকর আখ্যা দিয়ে ‘শ্রমিকদের সাথে তামাশা’ বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। শ্রমিক নেতা এবং আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংগঠন ‘ইন্ডাস্ট্রিঅল’ এর বাংলাদেশ কাউন্সিলের মহাসচিব রায় রমেশ চন্দ্র মনে করেন, মালিক পক্ষের মাত্র ৬শ’ টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব শ্রমিকদের মধ্যে চরম অসন্তোষ সৃষ্টি করেছে। আবার অনেকে মনে করছেন, নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খানের ডাকা গত শনিবারের শ্রমিক সমাবেশ থেকেও পরিস্থিতি উত্তপ্ত হতে পারে। পোশাক শিল্পে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টির পেছনে বিজিএমইএ নেতারা রাজনীতির দিকে আঙুল তুলছেন, তবে মালিক পক্ষের ৬শ’ টাকা বেতন বাড়ানোর আগে তাদের এর প্রতিক্রিয়া সম্পর্কেও ভাবা উচিত ছিল। এমনিতে নানা ঘাত-প্রতিঘাতে শ্রমিকদের জীবন নাভিশ্বাস। এরপর শ্রম আইনও শ্রমিক বান্ধব হয়নি। শ্রমিকদের বাইরের কোন শক্তি উস্কে দিচ্ছে- এ কথাটাও নতুন নয়। যখন জানা রয়েছে, যে কোন ইস্যুতে এই শিল্প উত্তপ্ত হতে পারে, তবে কেন ৬শ’ টাকা মজুরি বাড়াবার প্রস্তাব? কোথায় ৮ হাজার টাকা আর কোথায় ৩ হাজার ৬শ’ টাকা— টাকার হিসাবের সীমাহীন দূরত্বের বিষয়টি কী পুঁজিবাদী মালিকপক্ষের বিবেচনায় আসেনি। বহির্বিশ্ব জানে, বাংলাদেশে পোশাক শ্রমিকেরা অধিকার বঞ্চিত। এ কারণ দেখিয়ে যুক্তরাষ্ট্র অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য সুবিধা স্থগিত করেছে। বর্তমান সময়ে যা ঘটল অর্থাত্ শ্রমিকদের অধিকার পূরণ না হলে যুক্তরাষ্ট্র ডিসেম্বরে যে পর্যালোচনা করবে, তাতে জিএসপি সুবিধা ফিরে পাবার সম্ভাবনা কমে যেতে পারে। বাংলাদেশের অর্থনীতির স্থিতিশীলতা যে দুটি দিকের ওপর নির্ভরশীল তার একটি হল বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য। বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য নির্ভর করে প্রবাসী আয় এবং রপ্তানি আয়ের ওপর। রপ্তানি আয় প্রায় পুরোটাই নির্ভরশীল পোশাক শিল্পের ওপর। ২০০৯ সালে বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি যখন ০.৬ শতাংশ, তখনও বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৫.৭ শতাংশ ছিল। বৈশ্বিক অর্থনীতির মন্দা বাংলাদেশের অর্থনীতিকে বিপর্যস্ত করতে পারেনি। গত ২০১২-১৩ অর্থবছরে বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যে তৈরি পোশাক থেকে ১ হাজার ৯০০ কোটি ডলারের বেশি এসেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশসমূহে বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর ১ হাজার ২০০ কোটি ডলারের বেশি পোশাক রপ্তানি হয়। এই রপ্তানি বাংলাদেশের মোট রপ্তানির প্রায় ৬০%। আশি ও নব্বই দশকে বাংলাদেশে পোশাক শিল্পের দ্রুত প্রসার ঘটে। এ দেশে ১৯ বিলিয়ন ডলারের গার্মেন্টস শিল্পে কর্মরত আছেন ৪০ লাখের অধিক শ্রমিক। ভাড়া বাড়িতে যাত্রা শুরু হয় যে পোশাক শিল্পের তা এখন পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারক দেশের তালিকায় অবস্থান করে নিয়েছে। পোশাক শিল্প মালিকেরা এই শিল্প থেকে যে পুঁজি আহরণ করেন তার পেছনে ঘামঝরা অবদান রয়েছে শ্রমিকদের। এই শিল্পের মূল চালিকা শক্তি এর শ্রমিক। পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থায় শ্রমিক কখনোই তার কাজের ন্যায্য মূল্য পায় না। শ্রমিক শোষণের বিষয়টি তাই বহুলভাবে পরিলক্ষিত হয়। এই ব্যবস্থার অন্তরালে নানা অশুভ কৌশলে শ্রমিককে তার প্রকৃত পাওনা থেকে বঞ্চিত করা হয়। কার্ল মার্কস তার Das Capital গ্রন্থে দেখিয়েছেন, কিভাবে উদ্বৃত্ত মূল্যতত্ত্ব (উদ্বৃত্ত মূল্যতত্ত্ব বিনিময় মূল্য সংক্রান্ত)-এর দ্বারা শ্রমিক শোষিত হয়। এই তত্ত্বে মার্কস বুঝাতে চেয়েছেন, প্রতিটি উত্পাদিত দ্রব্যেরই বিশেষ কতকগুলো উপকরণ থাকে। এর মধ্যে শ্রমশক্তি একটি বিশেষ উপাদান। শ্রমের এই পরিমাণ নির্ধারিত হয় শ্রমঘণ্টার দ্বারা এবং শ্রমিককে খাটানো হয় নির্দিষ্ট বেতনে। শ্রমশক্তির মূল্য এবং শ্রমিক যা পায় তা বাদ দিয়ে বাকি যা থাকে তা হলো উদ্বৃত্ত মূল্য। উত্পাদনের উপকরণাদির ওপর মালিকানার সুবাদে এই উদ্বৃত্ত মূল্য উপভোগ করেন পুঁজিপতি মালিকেরা। অথচ এই শ্রমিকদের অধিকার ও নিরাপত্তার বিষয়টি সব সময়ই উপেক্ষিত থেকে যায়। পোশাক শিল্পের বেলায় বলা যায়, এই উদ্বৃত্ত মূল্য ভাগাভাগি হয় পোশাক শিল্প মালিক এবং বিদেশি ক্রেতা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে- যে কারণে বিদেশি সচেতন নাগরিকেরা সস্তায় পোশাক পরতে চাইছেন না। এ দেশে ধনী এবং দরিদ্রের জীবন-যাপনের মধ্যে রয়েছে বিশাল ব্যবধান। একদিকে বিলাস অন্যদিকে মানবেতর জীবন পাশাপাশি অবস্থান করছে। বিশেষ করে যারা গার্মেন্টস শিল্পের প্রসারের ফলে নব্য ধনীতে পরিণত হয়েছেন, তাদের দেশের প্রতি মানুষের প্রতি যে কোন দায়িত্ব এবং কর্তব্যবোধ আছে তা তাদের আচরণ দেখে মনে হয় না। তাদের বিলাসবহুল জীবনের আড়ম্বর দেখে মনে হয়, তারা এদেশে সাময়িক সময়ের জন্য বেড়াতে এসেছেন। বাংলাদেশের নব্য ধনীরা শ্রমিকদের সঙ্গে যে ব্যবহার করেন তা সতেরো শতকের ইউরোপের নব্য ধনী মালিকদেরকেও হার মানায়। চীনের সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যাবে, চীনে শ্রমিকের জীবন-মানের পেছনে যে ব্যয় হয় বাংলাদেশে তার পাঁচ ভাগের এক ভাগ খরচ করলেই যথেষ্ট। এ বিষয়ে পোশাক শিল্প মালিকেরা জাপান এবং কোরিয়া থেকে শিক্ষা নিতে পারেন-সেখানকার শ্রমিক-মালিক সম্পর্কের সমীকরণ থেকে। ঘটনা যেখানে যাই ঘটুক, তার দায়-দায়িত্ব শেষ পর্যন্ত সরকারকেই বহন করতে হয়। শুধু শিল্প মালিকদের প্রতি নতজানু হলেই চলবে না, সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষদের অধিকারের প্রতি দৃষ্টি দিতে হবে সরকারকেই। শ্রমিকরা বিদ্রোহ করলে তা দেশের শিল্প এবং সরকার কারো জন্যই শুভ হবে না। রাষ্ট্রকে বুঝতে হবে পুঁজিপতিদের স্বার্থ রক্ষা করে মজুর শ্রেণির পাশে না দাঁড়ালে রাষ্ট্রের নৈতিক, অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক ভিত্তি ক্ষত-বিক্ষত হবে। গার্মেন্টস শিল্পে বিরাজমান সংকট নিরসনের লক্ষ্যে সরকার, মালিকপক্ষ এবং শ্রমিককে একটি সুখকর সমঝোতায় পৌঁছাতে হবে। শ্রমিককে ধৈর্য ধরতে হবে। মালিককে সীমাহীন মুনাফালোভী হলে চলবে না আর সরকারকে শ্রমিক এবং মালিকের মধ্যে মেলবন্ধন সৃষ্টিতে প্রভাবকের ভূমিকা পালন করতে হবে। লেখক :গবেষক, সিইও, এইসএসপিপি ফাউন্ডেশন e-mail: [email protected]

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন