[ সা ম্প্র তি ক]

শহরে নতুন আতংক মোটর বাইক খুনি

আপডেট : ২৯ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ২১:৪২
রাজনৈতিক অস্থিরতা, হরতাল, শ্রমিক ধর্মঘট এসব এখন এ শহরে অনেকটাই নিত্যদিনের ঘটনা। যানজট-সড়ক দুর্ঘটনা এগুলোও মেনেই নিয়েছে রাজধানীবাসী অনেকটা ভাগ্য বিড়ম্বনা হিসেবে। আইন-শৃংখলা বাহিনীর ‘ক্রসফায়ার’ গল্পও এখন প্রায় গা সয়ে উঠেছে। কিন্তু হঠাত্ করেই এই শহরে এক নতুন আতংকের নাম মোটর বাইক খুনি। মোটর সাইকেল নিয়ে তারা দিব্যি খুন করতে বের হচ্ছেন। তারা তাদের টার্গেটস্থলের কাছে গিয়ে মোটর সাইকেল থামাচ্ছেন। মোটর সাইকেল চালক ইঞ্জিনটি স্টার্ট করা অবস্থায় অপেক্ষা করছেন। আর পেছনে বসা ঘাতক অস্ত্র নিয়ে শান্তভাবে মোটর সাইকেল থেকে নেমে সোজা টার্গেট করা মানুষটির উপর চালিয়ে দিচ্ছেন গুলি। মুহূর্তের মধ্যে একটি জলজ্যান্ত মানুষকে হত্যা করে দৌড়ে উঠছেন আবার সেই মোটর বাইকে। গুলির শব্দে লোক জমায়েত হয়ে যাওয়ার পূর্বেই আগে থেকে চালু রাখা মোটর বাইকের পেছনে গিয়ে উঠছেন তিনি। দ্রুতই পালিয়ে যাচ্ছেন শহরের জনারণ্যে। যানজটের এ শহরে পালানোর জন্য অবশ্যই মোটর বাইকের চেয়ে ভাল কোন যান এখন আর নেই। গত রমজানের ঈদের কয়েকদিন আগে রাজধানীর গুলশানে একটি শপিং মলের সামনে প্রথম এ ধরনের মোটর বাইক খুনির দেখা মেলে। মোটর বাইকে এসে ঠাণ্ডা মাথায় ওই শপিং মলে প্রবেশের সময় গুলি করে হত্যা করে যুবলীগ নেতা মিল্কিকে। প্রথম দফায় গুলি খেয়ে মিল্কি মারা যায়নি বুঝে ঘাতক পেছনে গিয়ে আবার গুলি চালায়। কয়েক মুহূর্তের মধ্যে টার্গেটের মৃত্যু নিশ্চিত করে অপেক্ষমাণ মোটর বাইকের পেছনে উঠে পালিয়ে যায় ঘাতক। কিন্তু ওই শপিং মলের সামনে সিসি ক্যামেরা থাকায় ধরা পড়ে যায় নাটকীয় এ লোমহর্ষক ঘটনা। ক্যামেরার ফুটেজ টিভি পর্দায় দেখে সাধারণ মানুষ আঁতকে উঠে। হিন্দি সিনেমার ভয়ংকর দৃশ্যের মত যেন এ হত্যাকাণ্ড। তবে আশার কথা সিসি ক্যামেরা সচল থাকার কারণে ওই খুনিকে দ্রুতই শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছিল। খুনি নিহত মিল্কির এক সময়ের রাজনৈতিক সহকর্মী ছিলেন। নাম মো. তারেক। র্যাব ঘটনা ঘটার একদিনের মধ্যেই তারেককে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়। কিন্তু কথিত ক্রসফায়ারে নিহত হওয়ার কারণে খুনির মুখ থেকে বিস্তারিত কোন তথ্য জানা সম্ভব হয়নি। তবে ক্রসফায়ার নিয়ে বিতর্ক থাকলেও এ ঘটনা কিছুটা হলেও স্বস্তিদায়ক হয়েছিল। কারণ এ ধরনের দুর্ধর্ষ ঠাণ্ডা মাথার খুনিকে মানুষ ক্ষমা করে না। আর সিসি টিভির বদৌলতে টেলিভিশনে মানুষ লোমহর্ষক এ ভিডিও চিত্রটি দেখেছে আগ্রহ ভরে। ক্রসফায়ারে এক খুনি নিহত হলেও মোটর বাইকে মৃত্যুদূতদের আসা বন্ধ হচ্ছে না। গত এক মাসে খোদ রাজধানীতেই মোটর বাইক খুুনিদের হাতে প্রকাশ্য দিবালোকে তিনজন খুন হলেন। গত ২৯ আগস্ট রামপুরায় দুর্বৃত্তরা বাসার ড্রইং রুমে গিয়ে খুন করে পুলিশের অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ফজলুল হককে। ১২ সেপ্টেম্বর রাজধানীর উত্তর যাত্রাবাড়ীতে খুন হন এ লেভেল পড়ুয়া ছাত্র বখতিয়ার। আর সর্বশেষ গত শনিবার রাজধানীর মিরপুরে দুপুর সাড়ে ১২টায় নিজ বাড়ির ড্রইং রুমে মোটর বাইকে আসা খুনিদের হাতে নিহত হন ব্যবসায়ী জাফরুল হক ওরফে মুক্তার হোসেন। এ তিন হত্যাকাণ্ডের কোন পরিষ্কার ক্লু এখন পর্যন্ত উদঘাটন করতে পারেনি আমাদের আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। হত্যাকারীদের শনাক্ত করতে হয়ত পুলিশ, ডিবি, র্যাব কিংবা অন্যান্য সংস্থা কাজ করছে। তদন্তও চলছে। কিন্তু বাংলাদেশে সাধারণত যা হয় সেটাই হয়ত এসব ঘটনাতেও ঘটবে। কারণ একটির পর একটি ঘটনা ঘটতে থাকে। পরের ঘটনাটি আরেকটু বড় হলে পেছনের ঘটনাটি দ্রুতই হারিয়ে যায়। আমরাও ব্যস্ত হয়ে পড়ি নিত্যনতুন ঘটা ঘটন-অঘটন নিয়ে। শুধু সরকারি পর্যায়ে কিংবা গণমাধ্যমে নয়, একসময় শোক থিতিয়ে যায় পুরো সমাজে। ক্রমশ পরিবারে। কারণ হত্যাকাণ্ডের শিকার পরিবারের বাকী সদস্যরা বিচার চাইতে চাইতে এক সময় পুরো সমাজের কাছেই যেন অসহায় হয়ে উঠে। পরিবারের উপার্জনক্ষম মানুষগুলোকে হারিয়ে মানসিকভাবে বিপর্যয়ের পাশাপাশি আর্থিক সংকটও পিছু নেয়। এক পর্যায়ে পথে বসে যায় অনেক পরিবার। আবার বিচার চাইতে গিয়ে আদালত-ব্যারিস্টার, পুলিশ-প্রশাসন, রাজনৈতিক নেতাদের পেছনে ছুটতে ছুটতে আরেক দফা পথে বসার উপক্রম হয়। বিচারের জন্য দ্বারে দ্বারে ঘুরে এক পর্যায়ে ক্লান্ত হয়ে যায় সকলেই। অসহায় মুখগুলোর দিকে তখন আর তাকানোও যায় না। এ অবস্থা চলছেই। রাজধানীতে এ মোটর বাইক খুনির নামে নতুন যে যমদূতদের আবির্ভাব ঘটেছে তাদের এখনই মূল উত্পাটন করতে হবে। কারণ নতুন ধরনের এ খুনের কায়দা তরুণদের মধ্যে নানা সংকটের জন্ম দিতে পারে। কারণ মোটর সাইকেলে চড়ে দুই তিন বন্ধু কোন অঘটন ঘটানো কিংবা হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটিয়ে পার পেয়ে যাওয়া কিন্তু বড় আতংকের খবর হয়ে উঠতে পারে। তাই সরকার বিশেষত আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীকে এ বিষয়টি একটু বিশেষভাবে চিহ্নিত করে এখনই বিশেষ নজরে আনা উচিত। সব সমাজেই খুন-খারাবিসহ নানা অপরাধের ঘটনা ঘটে থাকে। কিন্তু এসব অপরাধের ঘটনা নতুন মাত্রা পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই নতুন পথগুলো বন্ধের উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন। নইলে অপরাধের সার্বিক গতি নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন হয়ে পড়তে পারে। আর বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বর্তমান সময়ে তরুণদের প্রিয় বাহনের একটি হলো মোটর বাইক। শহরে যানজট পেরোনোর জন্য আরো বেশি জনপ্রিয়। এর মধ্যে সামনেই আসছে জাতীয় সংসদ নির্বাচন। নির্বাচনের প্রস্তুতিপর্ব ইতিমধ্যে শুরু হয়ে গেছে। সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে শহরে এবং গ্রামে ইতিমধ্যে মোটর বাইক কেনা শুরু হয়ে গেছে। নির্বাচনের সঙ্গে মোটর বাইকের একটি সম্পর্ক অনেকদিনের। কম সময়ে সরুপথে ভোটারদের কাছে যাওয়ার জনপ্রিয় বাহন মোটর বাইক। কিন্তু এখন মোটর বাইক যেভাবে সন্ত্রাসীদের কাজে ব্যবহূত হচ্ছে তা ক্রমশই এক আতংকজনক এক পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দিতে পারে। লেখক:সাংবাদিক

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন