যুক্তরাষ্ট্রের বাজেট জটিলতা

আপডেট : ২৯ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ২১:৫৯
২০১৩-১৪ সালের জাতীয় বাজেট সংক্রান্ত জটিলতায় অচলাবস্থার মুখে নিপতিত হইয়াছে যুক্তরাষ্ট্র সরকার। যুক্তরাষ্ট্রে ১ অক্টোবর হইতে নূতন অর্থবত্সর শুরু হইয়া থাকে। কিন্তু পার্লামেন্ট কংগ্রেসে নির্ধারিত ১ অক্টোবরে বাজেট পাস না হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়াছে। এই আশঙ্কার কারণ বাজেটে বিভিন্ন খাতে অর্থ বরাদ্দ নিয়া ক্ষমতাসীন দল ডেমোক্র্যাট ও বিরোধী দল রিপাবলিকানের মধ্যে সৃষ্ট মতানৈক্য। এই মতানৈক্যের কেন্দ্রবিন্দুতে আছে প্রেসিডেন্ট ওবামার প্রস্তাবিত ও বহুল আলোচিত স্বাস্থ্য বিল। এমতাবস্থায় সরকারের সংস্থাগুলি অনির্ধারিত খরচ ( বাজেট পাস না হওয়া পর্যন্ত) নির্বাহের জন্য নূতন তহবিল পাসের চেষ্টা করিতেছে। ইতোমধ্যে পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষ সিনেটে আগামী ১৫ নভেম্বর পর্যন্ত আপত্কালীন সরকারি ব্যয় নির্বাহের জন্য একটি প্রস্তাব পাস হইয়াছে ৫৪-৪৪ ভোটে। কিন্তু ইহা বাস্তবায়ন করিতে হইলে নিম্নকক্ষ হাউজ অব রিপ্রেজেনটেটিভ বা প্রতিনিধি পরিষদের সদস্যদের অনুমোদন লাগিবে। আর এখানেই দেখা দিয়াছে বিপত্তি। কেননা সংখ্যাগরিষ্ঠতার বলে সিনেট ওবামার ডেমোক্র্যাট দলের নিয়ন্ত্রণে থাকিলেও নিম্নকক্ষ রিপাবলিকানদের দখলে। নিম্নকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ রিপাবলিকান সদস্যরা বলিতেছেন যে, বাজেটে ওবামার প্রস্তাবিত স্বাস্থ্য বিল অন্তর্ভুক্ত করা হইলে তাহারা অনির্ধারিত বাজেটও অনুমোদন করিবেন না। সর্বশেষ খবর অনুযায়ী জানা যায়, গতকাল রবিবার প্রতিনিধি পরিষদ ২৩১-১৯২ ভোটে একটি বিল পাস করিয়াছে যাহাতে স্বাস্থ্যবিল এক বত্সরের জন্য বিলম্বিত করিবার কথা বলা হইয়াছে। অর্থাত্ অচলাবস্থা এখনও কাটে নাই। আজ সোমবার মধ্যরাত অবধি কোন সমাধান না আসিলে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় সরকারের অনেক সেবা বন্ধ হইয়া যাইবে। জাতীয় পার্ক, চিড়িয়াখানা, পোস্ট অফিস ও জাদুঘরগুলি বন্ধ থাকিবে। পাসপোর্ট, ভিসা, ঋণকার্যক্রম ইত্যাদি সেবা পাইতে বিড়ম্বনার শিকার হইতে হইবে জনগণকে। এমনকি হোয়াইট হাউসের অনেক স্টাফকে বাধ্য হইয়া বাসায় অবস্থান করিতে হইবে। কেন্দ্রীয় সরকারের প্রায় আশি হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারী বিনাবেতনে ছুটি ভোগ করিবেন। সর্বশেষ ১৭ বত্সর আগে ১৯৯৫-৯৬ সালে কোরীয় যুদ্ধকে কেন্দ্র করিয়া এরূপ অবস্থার সৃষ্টি হইয়াছিল। মূলত স্বাস্থ্যবিলে অর্থনৈতিক মন্দা হইতে উত্তরণে চিকিত্সা সরঞ্জামাদিতে বিশেষ করারোপ করা হইয়াছে। বিল পাস হইলে প্রতি বত্সর সরকারের সাশ্রয় হইবে ৩৫০ বিলিয়ন ডলার। ডেমোক্র্যাটদের দাবি হইল, ইহাছাড়া আর কোন উপায় নাই। সরকার পরিচালনা অব্যাহত রাখিতে হইলে বাজেট কাটছাঁট বা নূতন করারোপ করিতেই হইবে। পক্ষান্তরে রিপাবলিকানদের দাবি হইল, এই বিল অজনপ্রিয় ও ক্ষতিকর। তাহারা ২.৩% ট্যাক্স প্রত্যাহারের পক্ষপাতী। দেখা যাইতেছে ইউরোপের ন্যায় শেষপর্যন্ত আমেরিকায়ও অর্থনৈতিক মন্দার কারণে রাজনীতিতে অস্থিরতার আর অবশিষ্ট রহিল না। স্বাস্থ্যবিল বলিতে গেলে সেখানকার পলিটিকাল গেইমে পরিণত হইয়াছে। সিনেটে প্রস্তাব পাস হইবার পর গত বৃহস্পতিবার প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা প্রিন্স জর্জস কমিউনিটি কলেজে প্রদত্ত এক ভাষণে বলেন যে, আমি প্রেসিডেন্ট থাকিতে প্রতিনিধি পরিষদের বিল পাস হইতে দিব না (দ্যাটস নট গোয়িং টু হ্যাপেন অ্যাজ লং অ্যাজ আই অ্যাম প্রেসিডেন্ট)। তিনি বিরোধীদের সহিত এই ব্যাপারে কোন প্রকার সমঝোতা না করিবারও কথা বলিয়াছেন। হোয়াইট হাউস প্রয়োজনে প্রেসিডেন্টের ভেটো প্রদানের ক্ষমতার কথাও উল্লেখ করিয়াছে। বর্তমানে নিউইয়র্কে জাতিসংঘ দপ্তরে যখন সাধারণ পরিষদের ৬৮তম অধিবেশন চলিতেছে, তখন মার্কিন প্রশাসনে এইরূপ অচলায়তন অনেককেই ভাবাইয়া তুলিয়াছে। তবে সরকার পরিচালনায় কখনও কখনও কঠোর না হইয়া কোন উপায় থাকে না। সেইসময় বিরোধীদের সহিত কোন প্রকার আলোচনারও অবকাশ থাকে না বলিলেই চলে। তাহাছাড়া সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের ভোট পাইয়া নির্বাচনে জয়লাভ করিয়া সরকার গঠন করে কোন রাজনৈতিক দল। তাই সরকারে থাকিয়া তাহারা নিজস্ব নীতি অনুসরণ করিবেন ইহাই তো নিয়ম। সেই ম্যান্ডেট জনগণ তাহাদের দিয়া রাখিয়াছেন। যতক্ষণ তাহারা সরকারে আছেন, ততক্ষণ নিজেদের পলিসি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করিবেন ইহাই স্বাভাবিক। কিন্তু তৃতীয় বিশ্বের দেশসমূহে প্রায়শ কথায় কথায় বিরোধী দলের সহিত আলোচনা বা সংলাপের জন্য পীড়াপীড়ি করা হয়। এইরূপ আলোচনা বা সংলাপে সরকারি দলের কোন বাধ্যবাধকতা থাকার কথা নহে। যাহা হউক, মার্কিন প্রশাসনে কোন প্রকার অচলাবস্থা দেখা দিলে বিশ্ব অর্থনীতিতেও তাহার নেতিবাচক প্রভাব পড়িবে। তাই এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি না হউক, তাহাই আমরা কামনা করি।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন