ফরমালিন :নীরব ঘাতক বসিয়া নাই

আপডেট : ২৯ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ২১:৫৯
জনসচেতনতার পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকায় হাতেগোনা দুই একটি বাজার ‘ফরমালিনমুক্ত’ ঘোষণা করা হইয়াছে। পরিতাপের বিষয় হইল, ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই রাজধানীর বাজারগুলিকে ফরমালিনমুক্ত করিবার উদ্যোগ লইলে তাহার কার্যকর চিত্র দূর অস্ত হইয়াই রহিয়াছে। গত শনিবার প্রকাশিত ইত্তেফাকের প্রতিবেদন হইতে জানা যায়, এই পর্যন্ত নয়টি বাজারকে ফরমালিনমুক্ত ঘোষণা করা হইলেও ইহার অধিকাংশ শুধু নামেই ফরমালিনমুক্ত হইয়াছে। মত্স্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে যেই সকল বাজার ফরমালিনমুক্ত ঘোষণা করা হইয়াছে, তাহার সফলতাও প্রশ্নবিদ্ধ। দুই একটি ব্যতিক্রম ছাড়া সকল স্থানে শুভংকরের ফাঁকি রহিয়া গিয়াছে। ফরমালিন লইয়া আমাদের সচেতনতা বাড়িয়াছে বটে, কিন্তু গবেষণাগারের প্রয়োজনের তুলনায় ইহা আমদানি করা হইতেছে চারগুণ অধিক। স্বভাবতই তাহা খাদ্যপণ্যকে দীর্ঘদিনের জন্য সংরক্ষণ করিবার সুযোগে বিষাক্ত করিতেছে আমাদের শরীরকে। ফরমালিন সহজলভ্য, সস্তাও বটে। সুতরাং এককালে পচনশীল পণ্যের ব্যবসায়ীরা যখন উদ্বেগ উত্কণ্ঠায় থাকিত তাহার পণ্যের পচন লইয়া, তাহার চটজলদি অতি সহজ সমাধান দিয়াছে এই ফরমালিন। পানির ভিতরে মিশাইয়া সেই পানিতে বিবিধ ফল ও যেকোনো পচনশীল খাদ্যদ্রব্য চুবাইয়া লইলেই হইল। ব্যাস! নিশ্চিন্ত কয়েক সপ্তাহ, এমন কী কয়েক মাসও তাহা তাজা থাকিবে। এই সুযোগে পণ্যের অবৈধ মজুদ করিয়া কৃত্রিম সংকটসহ ফটকাবাজারি করিতেও সুবিধা হয় বৈকি। কিন্তু তাহার ভয়ানক মাশুল গুণিতে হয় আপামর জনগণকে। আমরা এক্ষণে স্পষ্টতই জানি যে, ফরমালিন এক অর্থে নীরব গণহত্যা চালাইতেছে আমাদের দেশে। গত ১১ সেপ্টেম্বর হাইকোর্টের অবকাশকালীন ডিভিশন বেঞ্চ এই মর্মে রুলজারি করিয়াছে যে, দোষীব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির বিধান রাখিয়া চলতি সংসদ অধিবেশনে ফরমালিন নিয়ন্ত্রণ আইন প্রণয়নে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে সরকারকে কেন নির্দেশ দেয়া হইবে না। ইহার সহিত খাদ্যে ফরমালিন, কার্বাইড, পোড়া মবিল, বিষাক্ত রাসায়নিক ও রং-এর ব্যবহার রোধে সব ধরনের খাদ্য পণ্য, মাছ ও মিষ্টি পরীক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ কেন গ্রহণ করা হইবে না তাহাও জানিতে চাওয়া হইয়াছে। আগামী চার সপ্তাহের মধ্যে নির্দিষ্ট কর্তৃপক্ষকে রুলের জবাব দিতে বলা হইয়াছে। ইহার পূর্বে জুলাই মাসে মন্ত্রিসভা নিরাপদ খাদ্য আইন-২০১৩ (খসড়া) অনুমোদনও করিয়াছে সরকার। সাজা হিসাবে রহিয়াছে—অনূর্ধ্ব পাঁচ বত্সরের কারাদণ্ড বা অনধিক পাঁচ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করিবার বিধান। অর্থাত্ যদি ধরিয়াও লই সরকার কিছুটা আন্তরিক ফরমালিন বন্ধের উদ্যোগ লইতে, তাহার পরও যাহা চলিতেছে তাহা এই আশার প্রদীপকে নিভাইতেই উদ্যত হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, শিল্প, শিক্ষা ও চিকিত্সা খাত মিলাইয়া ফী বত্সর ফরমালিনের চাহিদা রহিয়াছে ৫০ টন। কিন্তু প্রতি বত্সর আমদানি হইতেছে ২০৫ টন। সরকার খুব ভালো করিয়াই অবগত যে, এই অতিরিক্ত ফরমালিন ব্যবহূত হইতেছে খাদ্যদ্রব্যেই, তাহার পরও তাহা বন্ধে কি সত্যিকারের উদ্যোগ আমরা দেখিতেছি? ফরমালিনের পাশাপাশি অতি মুনাফালোভী কৃষক, উত্পাদনকারী, মজুতকারী এবং ব্যবসায়ীরা খাদ্যে বিবিধ ক্ষতিকর রাসায়নিক ব্যবহার করিতেছে। ফল, মাছ, শাক-সবজিতে ফরমালিন, ক্যালসিয়াম কার্বাইড, কীটনাশক, কৃত্রিম ক্রমবৃদ্ধি নিয়ামক ব্যবহারের পাশাপাশি প্রায় সব ধরনের ফলমূলে কার্বাইড, ইথোফেন, ফরমালিন ব্যবহার করা হইতেছে জোর কদমে। মিষ্টিতে ব্যবহূত হইতেছে কৃত্রিম মিষ্টিকারক, আলকাতরা এবং কাপড়ের রং। এই সকল জিনিস বিপজ্জনক ক্যান্সার সৃষ্টিকারক। তাহার প্রতিক্রিয়াজনিত চিত্রও দিন দিন প্রকট হইতেছে। বর্তমানে দেশে দুই কোটি মানুষ কিডনি রোগে আক্রান্ত, ক্যান্সার প্রতিষেধকের ব্যবহার বত্সরে বিশ শতাংশ হারে বাড়িতেছে, বাড়িতেছে মাতৃগর্ভে শিশু মৃত্যু এবং বিকলাঙ্গ শিশু জন্মের হার। ফরমালিন লইয়া এতবিধ অপব্যবহার উন্নত বিশ্বে আমাদের দেশের মতো যদি কেহ (বা কোন মহল) করিত তবে তাহারা বুঝিত কত ধানে কত চাল। ইহাও মনে রাখিতে হইবে, যাহারা এই অসাধু পন্থা অবলম্বন করিয়া নীরব গণহত্যার দুষ্কর্ম চালাইতেছেন, তাহারাও এই বিষে নীল হইতে পারেন। তাহাদের জীবন সংসারও মরণঘাতী রোগে ধ্বংস হইতে পারে। ব্যবসায়ই শেষ কথা নহে।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন