জনগণকে জুজুর ভয় দেখানোর গণতন্ত্র!

আপডেট : ২৯ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ২২:০০
বাংলাদেশের আজকের গণতন্ত্র হলো পিঠোপিঠি সংঘাতের প্রতিযোগিতা, রাষ্ট্রীয় ঝগড়া-ঝাটি। পাল্টা-পাল্টি হুঙ্কার। গণতন্ত্র অর্থ কী মিছিল, হরতাল, জ্বালাও-পোড়াও, অরাজকতা? পুলিশ বাহিনী দিয়ে দলীয় স্বার্থ রক্ষা? সমাবেশে আসতে না দেয়া? পথ রোধ করে দেয়া? গণতন্ত্র মানেই কি কথায় ঘুষ-দুর্নীতি, চাঁদাবাজী আর চাপাবাজী? গণতন্ত্র মানেই কি জাতীয় নির্বাচনের নামে দেশ উত্তপ্ত করে দেয়া। সমস্যা সমাধানে সমঝোতায় না বসা। যদি এর কোনটাই না হয় তাহলে এ দেশবাসী আজ কি প্রত্যক্ষ করছে? আজকাল গণতন্ত্র মানে কেন যেন মনে হয় বাহু বল (বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে)। হালে যা দেখছি শক্তি প্রদর্শনের নামই গণতন্ত্র? “কাহার মুখে কত বল, কাহার বাহুতে কত শক্তি, কাহার দলে কত লোক; তাহা দেখাইয়া দিবার নামই এখনকার রাজনীতি, আজকের গণতন্ত্র।” অন্তত এই দেশে রাজনীতি কিংবা গণতন্ত্রের সংগা এমনটাই হওয়ার কথা । দেশের দুইটি প্রধান রাজনৈতিক গোষ্ঠী; দু’টি বাহুবলি শিবির, দু’টি হুঙ্কার-ব্যবস্থা তাই বলে। আমাদের জনগণও বুঝে গেছে কি চাইছে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি প্রধান দল দু’টি। দুই-এর মরণ পণ লড়াই, কার ভাগে কত লোক, কার ভাগে কত দল উপদল, তা প্রমাণ করে রাজনীতি-খেলার ফলাফল নিশ্চিত করার ইঁদুর-দৌড় চলছে তো চলছেই। আজকাল আমাদের নেতারাও রাজনীতি আর গণতন্ত্র বলতে তাই বুঝেন, নেতাদের অনুসারী মনুষ্য সাধারণও রাজনীতির নামে তারই আরাধনা করেন। সংখ্যার বিরুদ্ধে সংখ্যা দিয়ে টক্কর, আজকের গণতন্ত্রের রাজনীতিতে তার অধিক আর কী চাই? সরকার পক্ষও জানে, বিরোধী পক্ষও জানে, গণতন্ত্রের অর্থই সংখ্যাতন্ত্র, রাস্তায় সংখ্যা নামিয়ে গুনে নেবার তন্ত্র। আর এটাই হচ্ছে এদেশীয় গণতন্ত্র! গণতন্ত্র চর্চায় সরকারি দল যেমনটা; তেমনই বিরোধী দলও কম নয়। তাদের কথা “আমি মরিয়া প্রমাণ করিব; এক দিন হূদয় ছিড়া দেখাইব”। উভয়ে দেশবাসীকে তাদের উতরে ওঠা ভালবাসা দেখানও বটে! এভাবেই কি আমাদের গণতন্ত্রের অভিযাত্রা এগুতে থাকবে? এ পথে যে দেশের অগ্রগতি নেই কিংবা জনপ্রিয়তা নেই তা উপলব্ধির জন্য তো গবেষণার প্রয়োজন হয় না। কিন্তু আমাদের কোন সরকারেরই থিংকট্যাঙ্কে তেমন শুভবুদ্ধির উদয় হয় কিনা- সেটাই প্রশ্ন? গণতন্ত্র মানেই তো সংখ্যালঘুদের বাড়ি পোড়ান। গণতন্ত্র মানেই তো নেতার হুকুমে গাড়ি পোড়ানো, জনগণকে রাস্তায় বের হতে না দেয়া, ভাংচুর, পুলিশ পিটানো আর পাল্টা পুলিশের নির্বিচারে গুলি চালানো; সবিশেষ রক্তমাখা কয়েকটা লাশ! এইতো রাজনীতি! এইতো এদেশীয় গণতন্ত্র! বাহ! চমত্কার রাজনৈতিক খেলা আর চমত্কার গণতন্ত্র চর্চা চলছে দেশে। কোথাও কোন পরিবর্তন নেই। সেই একই ইচ্ছা; সেই একই আকাঙ্ক্ষা সবার মনে। স্বপ্ন চরিতার্থ করতে যা যা করার সবটাই যেন করতে হবে। কোন বিরোধী শক্তি থাকবে না কোথাও? অবিচারের বিরুদ্ধে কোনও প্রতিবাদ করা যাবে না? হত্যা, খুন, ধর্ষণ অন্যায়ের বিচার হবে না। মুক্তভাবে হক কথা, সাফ কথা বলা যাবে না। লুটপাট হবে সেক্টরে সেক্টরে। সন্ত্রাস হবে পাড়ায়-মহল্লায়। ভেজালে ভেজালে ভরে যাবে দেশ। নেশায় বুদ হবে যুবসমাজ। ভাই খুন করবে ভাইকে, নেশাগ্রস্ত ছেলে-মেয়ের হাতে খুন হবে পিতামাতা, মারামারি-হাঙ্গামা লেগেই থাকবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে, লাফিয়ে লাফিয়ে কারণে-অকারণে বাড়বে দ্রব্যের দাম? বড় কষ্টে দেশের মানুষ নিত্য আহ্ উহ্ করবে। বাসায়, কর্মস্থলে, অফিসে স্বজনরা মরবে। বিচার হবে না। গুম হবে, খুন হবে। ভয়ে রাতে ঘুম হবে না। এর পরিবর্তন কবে হবে? বা আদৌ হবে কিনা, তা এদেশের মানুষ জানতে চায়। এভাবেই চলছে দেশ; হয়তো এভাবেই চলবে। গণতন্ত্রে এই তো নমুনা! আজকাল ‘বিরোধীরা করেছে বলে তা আমরাও করব’ ‘সরকার করছে বলে আমরাও করবো’ তিনি বলেন তাই আমিও বলবো, এহেন ধারাই চলছে দেশে। এমন বালখিল্যপনা শোভনীয় নয় মোটেও। বাস্তব হলো, শোভনীয় না হলেও লোভনীয় তো অবশ্যই। আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো বৃহত্তর সংখ্যার ব্যবস্থা করতে ছুটেছেন, কোনও ফাঁক রাখেন না, কারণে-অকারণে মানুষ আমদানি করেন চতুর্দিক হতে। যেমনটা করছেন আমাদের দেশনেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা; তেমনটাই করছেন আপোষহীন বিরোধী দলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া। ভাববার কথা নয়; ভাবলে হয়তো সমঝোতার একটা পথে আসতেন তারা। তা কখনই হয়নি। হয়তো হবেও না। সমঝোতা হলে দেশের মানুষ সুখ পাবে; এটা অন্তত তাদের ভাবা দরকার। আজ যা চলছে তা কেবলই কু-রাজনীতি। এর নিন্দা যদি করতেই হয়, তবে বলতেই হবে, “ইহা আমাদের, ইহা ‘উহাদের’ পাপ!” অর্থাত্, এই পাপের আমরা-ওরা নেই; সবাই। গণতন্ত্র মানেই তো সিভিল রাইটস। আসলে আমাদের কোন রাইটস (অধিকার) আছে কি? আমরা একবার ভেবে দেখি, একবার আওয়াজ উঠাই, এক পা আগালে, আরেক পা পিছিয়ে যাই; একবার নিরুদ্দেশভাবে কোন উদ্দেশ্যকে নিয়ে কথা বলতে গিয়ে নতজানু হই। আর এ জাতীয় প্রক্রিয়া চলতেই থাকে...। এটা মোটেও গণতন্ত্র নয়। লেখক :সাংবাদিক

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন