স্মরণ

আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদ

আপডেট : ২৯ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ২২:০০
আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদ পটিয়া উপজেলার সুচক্রদন্ডী গ্রামের এক উচ্চ মধ্যবিত্ত পরিবারে ১৮৭১ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তার আদি পুরুষ ছিলেন হাবিলাশ মল্লা। তিনি গৌড় সুলতানের সম্ভবত শের শাহের সৈনিক ছিলেন। (১৫৩৮-৩৯) সালে। আর এই হাবিল্লাশ মল্লা নাম অনুসারে হাবিলাস দ্বীপ নামের একটা জায়গার নামকরণ করা হয়। আবদুল করিমের দাদার বাবা অর্থাত্ কাদির রাজা (১৭২০-৯০) থেকে আবদুল করিমের বংশে শিক্ষা বা বিদ্যাচর্চা শুরু হয়ে আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদ পর্যন্ত বহাল থাকে। আর আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদ কর্ণফুলী নদীর পূর্বতীর থেকে টেকনাফের অবধি প্রাক্তন চট্টগ্রাম জেলার অর্ধাংশে ১৮৯৩ সালে পটিয়া ইংলিশ উচ্চ বিদ্যালয় হতে একমাত্র এন্ট্রাস (এস.এস.সি) পাস মুসলিম এবং ১৮৯৫ সাল অবধি সে অঞ্চলের একমাত্র এফ.এ (এইচ.এস.সি) পড়ুয়া ছাত্র। টাইফয়েড রোগে আক্রান্ত হওয়ায় তার পক্ষে আর পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। বাংলা সাহিত্যে তিনি যথেষ্ট অবদান রাখেন। তার মূল কাজ হচ্ছে মধ্যযুগের অনাদর, অবহেলায়, নিগৃহীতভাবে গ্রামে-গঞ্জে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা, নষ্ট বা ধ্বংস হয়ে যাওয়া হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান ধর্মের লেখকদের লেখাগুলোকে অসাম্প্রদায়িক দৃষ্টিকোণ থেকে সংগ্রহ করে সেগুলোকে সংরক্ষণ ও সম্পাদনা করে বই আকারে প্রকাশ করে বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করা। এ কাজ করতে গিয়ে তিনি ভিখারির মত মানুষের দুয়ারে দুয়ারে পুঁথি সংগ্রহ করতে গিয়ে অনেক অপমান, লাঞ্ছিত ও নিগৃহীত হয়েছিলেন। তবুও সাহিত্যপ্রেমী আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদ পিছপা হননি। মূলত তার কারণেই মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের ধারাবাহিক ইতিহাস আমরা পাই এবং মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে ইতিহাস ও ঐতিহ্য সংরক্ষিত হয়। সাহিত্য বিশারদ অসাম্প্রদায়িক ব্যক্তিত্ব ছিলেন। তিনি ১৩৪৬ সালে কোলকাতার বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সম্মেলনে মূল সভাপতির ভাষণে বলেন— “সাহিত্যে জাতি-ধর্মের গন্ডি আমি কখনো স্বীকার করি নাই, এখনো করি না, কিন্তু ইহার বৈচিত্র্য স্বীকার করি। সাহিত্য হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান যে জাতিরই হউক, ইহা সাহিত্য পদবাচ্য হইলেই সার্বজনীন হইয়া থাকে। মনীষী আবদুল করিম সংগৃহীত পুঁথিগুলো বিভিন্ন জায়গায় দান করেছেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ১২০০ মুসলিম পুঁথি, রাজশাহী বরেন্দ্র রিসার্চ মিউজিয়ামকে ৪০০ হিন্দু পুঁথি ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ৪০০০ পত্র-পত্রিকা ও সাময়িকী দান করে গেছেন। পরিশেষে বলা যায় বাংলা ভাষা আন্দোলনের তাত্ত্বিক আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদ ১৯০৩ সালে “আল ইসলাম” পত্রিকায় সর্বপ্রথম বাংলাকে মুসলমানদের মাতৃভাষা রূপে তুলে ধরেন। শুধু তাই নয়, এ ভাষা হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান সকলের সার্বজনীন ভাষা হিসাবে গ্রহণের দাবি জানান। তিনি ২৫০০’র মত পুঁথি সংগ্রহ ও ৬০০ প্রবন্ধ লিখে বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছেন। তিনি যা আবিষ্কার কিংবা উদ্ধার করেছেন তখনই তা নিয়ে আলোচনা সাপেক্ষে প্রবন্ধ রচনা করে সাহিত্য, সাহিত্য পরিষদ পত্রিকা, পূর্ণিমা, আলো, ভারতবর্ষ, প্রবাসী, যমুনা, বীরভূম, কল্পতরুসহ ১৪৪ খানা সাময়িকীতে প্রকাশিত হতো। তিনিই একমাত্র মুসলিম লেখক যিনি এতগুলো পত্রিকায় লেখার সৌভাগ্য অর্জন করেছেন। শুধু তাই নয়, উপরোক্ত সাময়িকীর পাতা উল্টালে বিশারদ সাহেব ছাড়া অন্য কোন মুসলিম লেখকের লেখা চোখে পড়ে না। লেখকদ্বয় : প্রো-ভিসি, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, ও এম.ফিল শিক্ষার্থী, সমাজতত্ত্ব বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন