অভাব যাদের নিত্য সঙ্গী, কান্না যাদের প্রতিদিনের নিয়তি, প্রবঞ্চনা যাদের পিছু ছাড়ে না তাদের কথা শোনার মানুষের আজ বড় অভাব। প্রতিটি সকাল এই মানুষগুলোর কাছে আসে কোন প্রকার বৈচিত্র্য ছাড়া। নিয়তিকে ওরা মেনে নিয়েছে এই আশায়, যদি আগামীকাল একটু ভালো থাকতে পারি। না, ওদের ভালো থাকা আর হয় না। নতুন সকাল আসে না কোন বৈচিত্র্য নিয়ে। জীবন কেটে যায় জীবনের নিয়মে। তারপরও এই বৈচিত্র্যহীন জীবনে ওরা আগুনে পুড়ে, চাপা পড়ে ধসে পড়া ভবনের নিচে। অন্যের আনন্দ নিশ্চিত করে নিজের জীবনের বিনিময়ে। হ্যা , এই মানুষগুলো আমাদের দেশের গার্মেন্টস শ্রমিক। যারা দিন-রাত পরিশ্রম করে সচল রেখেছে দেশের অর্থনীতির চাকা। যাদের শ্রম ও ঘামের বিনিময়ে দেশ উপার্জন করছে বৈদেশিক মুদ্রা। বাংলাদেশে তৈরি পোশাক শিল্পের বিকাশ শুরু হয় বিংশ শতকের আশির দশকে। তখন থেকে ধীরে ধীরে এটি বিকাশ লাভ করে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে। এ শিল্পের যাত্রালগ্ন থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত এই খাতের ব্যাপক বিকাশে, এর সাথে সংশ্লিষ্ট শ্রমিকদের অবদান সবচেয়ে বেশি। এই শ্রমিকদের ঘাম ও শ্রমের বিনিময়ে পোশাক শিল্প আজ বিশ্বে জায়গা করে নিয়েছে। বাংলাদেশে বর্তমানে গার্মেন্টস শিল্পে প্রায় চল্লিশ লাখ শ্রমিক কর্মরত। এদের মধ্যে অধিকাংশ শ্রমিক নারী। এই নারী শ্রমিকরা সমাজের সবচেয়ে অবহেলিত জনগোষ্ঠীর একটি অংশ। তৈরি পোশাক শিল্প তাদের সুযোগ করে দিয়েছে নিজেদের কর্মদক্ষতা প্রমাণ করার। তাদের মনে আশা জাগিয়েছে নতুন করে বাঁচার। কিন্তু তাদের সেই বেঁচে থাকার আশা যেন আজ এক চরম পরিণতির দিকে এগিয়ে চলছে। এই আশার দাম জীবন দিয়ে পরিশোধ করতে হচ্ছে । এর সাথে প্রতিদিনকার লাঞ্ছনা, বঞ্চনা তো আছেই। তবু্ও তারা এগিয়ে চলছে, এগিয়ে চলতে হয় তাদের। কিন্তু এই শ্রমিকদের জন্য আমরা কি করছি? তাদের দিকে কি একটু খেয়াল করেছি? কিংবা তাদের যৌক্তিক দাবিগুলো কি আমরা কখনো কান পেতে শোনার চেষ্টা করেছি? নাকি এর পরিবর্তে আমরা শুধু ডলার নিয়ে আলাপ-আলোচনা করছি। তবে হ্যা, সময় এসেছে তাদের কথা শোনার। সাম্প্রতিক সময়ে কয়েকটি তৈরি পোশাক কারখানায় ভয়াবহ বিপর্যয় আমাদের বাধ্য করছে এই অবহেলিত শ্রমিকদের দিকে দৃষ্টি নিবন্ধ করতে। দেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৭৮ শতাংশ আসে এ খাত থেকে। তাই এই খাত নিয়ে দেশে-বিদেশে আলোচনাও হয় বেশি। তবে সেই আলোচনা শুধু বাংলাদেশের এই শিল্পটির এগিয়ে চলা নিয়ে। এর সাথে সংশ্লিষ্ট অবহেলিত, শ্রমক্লিষ্ট মানুষগুলোকে নিয়ে নয়। বর্তমানে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানির পরিমাণ প্রায় ২১ বিলিয়ন ডলার। আশা করা হচ্ছে ২০২০ সালের মধ্যে রপ্তানি ৪৫ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করবে এবং সেইসাথে বাংলাদেশ হবে বিশ্বের একনম্বর তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক দেশ। কিন্তু সেই কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন করতে হলে তৈরি পোশাক শিল্পের সাথে সংশ্লিষ্ট সুবিধাবঞ্চিত শ্রমিকদের দিকে আমাদের দৃষ্টি দিতে হবে। প্রকৃতপক্ষে এখাতের অধিকাংশ শ্রমিক অত্যন্ত সাদামাটা ও কষ্টকর জীবন যাপন করে। সারাদিন পরিশ্রম করে তারা মাস শেষে উর্পাজন করে মাত্র তিন হাজার টাকা। তিন হাজার টাকা তৈরি পোশাক খাতের সর্বনিম্ন বেতন। বর্তমান সময়ে এ টাকা দিয়ে পরিবারসহ কারো জীবন নির্বাহ করা হয় এ কথা বিশ্বাস করা কঠিন। তবে এটি নির্মম হলেও সত্যি। তিন হাজার টাকা দিয়ে একটি পরিবার কিভাবে জীবন নির্বাহ করে? বাধ্য হয়ে তারা ছোট ঘর বা বস্তি এলাকায় থাকে। ফলে তাদের সন্তানদের ঠিকমত লেখাপড়া করাতে পারে না। তাদের পুষ্টির চাহিদা পূরণ করতে পারে না। পারে না তাদের সন্তানদের কোন আবদার মেটাতে।
বর্তমানে প্রায় প্রতিদিন কারখানাগুলোতে শ্রমিকরা বেতন বৃদ্ধির দাবিতে বিক্ষোভ করছে। শ্রমিকদের দাবি তাদের বেতন আট হাজার টাকা করা হোক। এই বেতন বৃদ্ধির দাবি করে, শ্রমিকরা মনে হল এবার ভয়াবহ কোন অপরাধ করে ফেলেছে! আমরা কখনো ভেবে দেখেছি এই টাকা বর্তমান সময়ে খুব কি বেশি ? যেখানে ট্যানারী শ্রমিকের বেতন প্রায় নয় হাজার পাঁচশ’ টাকা এবং নির্মাণ শ্রমিকের বেতন প্রায় দশ হাজার টাকা। আসলে আট হাজার টাকা দিয়ে চারজনের একটি পরিবার ভালোভাবেচলতে পারে না। কিন্তু তাদের এ দাবিটি এখন মালিকপক্ষ অযৌক্তিক বলে উড়িয়ে দিচ্ছে। মালিকপক্ষ শ্রমিকদের বেতন মাত্র ৬০০ টাকা বৃদ্ধি করতে সম্মত হয়েছে। এ প্রসঙ্গে রবিঠাকুরের সেই বিখ্যাত উক্তি : “এ জগতে হায় সেই বেশি চায় , আছে যার ভুরি ভুরি” মনে পড়ে। কারণ মালিকদের আছে টাকা, তাই তাদের আরও টাকা চাই। তারা কেন খেটে-খাওয়া দরিদ্র মানুষগুলোকে টাকা দিবে। ৬০০ টাকা বাড়িয়ে দিচ্ছে সেই তো ঢের। তাদের মর্জির উপর চলতে হবে এ খাতের শ্রমিকদের। সারা দিন-রাত অমানুষিক পরিশ্রম করেও মালিকের কৃপার উপর তাদেরকে নির্ভর করতে হবে।
মালিকদের মনে রাখতে হবে শ্রমিকদের কম মজুরি দিয়ে তারা স্থায়ীভাবে লাভবান হতে পারবে না। অপরদিকে শ্রমিকদেরও মনে রাখতে হবে এ শিল্প থেকে অর্থ উপার্জন করে তারা জীবিকা নির্বাহ করে। ফলে এখানে কোন প্রকার সংঘাত তাদের জন্য ক্ষতির কারণ হবে। তাই কোন ধরনের উসকানিতে তারা যেন ভুল করে এ শিল্পকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে না দেয়। কারণ এই মুহূর্তে যেকোন ধরনের ভুল সিদ্ধান্ত আমাদের সকল সম্ভাবনাকে নস্যাত্ করে দিতে পারে।
লেখক:শিক্ষক, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ,
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
E-mail: [email protected]
