সহজে সঠিক তথ্যপ্রাপ্তি ও ব্যবহার প্রত্যেক মানুষের নাগরিক ও গণতান্ত্রিক অধিকার। ইহা সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও দুর্নীতি প্রতিরোধে সহায়ক। ইহার মাধ্যমে সর্বত্র স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠিত হয়। এই ব্যাপারে আগে আমাদের মধ্যে তেমন কোন সচেতনতাই ছিল না। তবে নবম জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে এই দেশে ‘তথ্য অধিকার আইন ২০০৯’ পাস হইবার পর এই ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধিত হইয়াছে। সরকারি-বেসরকারি অনেক প্রতিষ্ঠান ওয়েবসাইটেই অনেক তথ্য সরবরাহ করিতেছে। এই সরকারের আমলে তথ্য-প্রযুক্তির ক্ষেত্রে ব্যাপক উন্নয়ন হইয়াছে। ইহার জন্য বর্তমান সরকার অবশ্যই কৃতিত্বের দাবিদার। এতদসত্ত্বেও এই আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিয়া প্রশ্ন রহিয়াই গিয়াছে।
তথ্য অধিকার আইন প্রণয়নের পর বাংলাদেশে তাহার ভিত্তিতে তথ্য কমিশন প্রতিষ্ঠিত হয়। এই আইনটি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কমিশনের একটি ভূমিকা আছে। কমিশন প্রচার-প্রচারণা, প্রশিক্ষণ ও অভিযোগ সম্পর্কিত বিচার কার্যক্রমকে প্রাধান্য দিয়া কাজ করিয়া যাইতেছে। এইভাবে তথ্য জানিবার ক্ষেত্রে একটি প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি দাঁড়াইয়া গিয়াছে। এক পরিসংখ্যানে জানা যায়, গত তিন বত্সরে বিভিন্ন কর্তৃপক্ষের নিকট তথ্য প্রাপ্তির জন্য ৪৯,৬৯৩টি আবেদন পাওয়া গিয়াছে। তন্মধ্যে ৪৮,৭৫০টি তথ্য সরবরাহ করা হইয়াছে। তথ্য সরবরাহের হার শতকরা ৯৭.৭১ ভাগ। তবে সারাদেশে আবেদনকারীর সংখ্যা এত কম কেন, সেই প্রশ্ন এইখানে সহজেই উত্থাপিত হইতে পারে। প্রকৃতপক্ষে এইক্ষেত্রে গণসচেতনতার অভাবসহ আরও কতিপয় প্রতিবন্ধকতা রহিয়াছে। যেমন- আইনানুযায়ী সকল সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নিয়োগ না দেওয়া, তথ্য গোপন করিবার সেই পুরাতন সংস্কৃতি, আবেদনকারীর অজ্ঞতা, আবেদন করিবার অনীহা ইত্যাদি। প্রসঙ্গত এইখানে উল্লেখ করা যাইতে পারে যে, আইনটি প্রণয়নের সময় আমাদের দেশের এনজিওগুলি বিশেষ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু আইনে তাহাদেরও তথ্য প্রদানের নিয়ম থাকায় এখন তাহারা ইহার বাস্তবায়নে সেইভাবে কাজ করিতেছে না বলিয়া অভিযোগ পাওয়া যাইতেছে। অবশ্য আইনে বহুজাতিক কোম্পানিগুলিকে তথ্য প্রদানে বাধ্য করা হয় নাই। অনেকে মনে করেন ইহা বিদ্যমান আইনের একটি দুর্্বল দিক। তাহার পরও এই পর্যন্ত অগ্রগতিকে খাটো করিয়া দেখার অবকাশ নাই।
প্রায় আড়াইশত বত্সর পূর্ব হইতে বিশ্বের অনেক দেশে বিভিন্ন নামে তথ্য অধিকার আইনের প্রচলন রহিয়াছে। ১৭৭৬ সালে সর্বপ্রথম সুইডেনে এই ধরনের আইন পাস করা হয়। বর্তমানে ৫৬টি দেশে তথ্য অধিকার আইন বলবত্ আছে। সেই হিসাবে বলিতে গেলে আমরা অনেক বিলম্বে এই ধরনের অধিকারকে স্বীকৃতি দিয়াছি। তাই ইহার পুরাপুরি সুফল পাইতে কিছুটা সময় লাগিবে বৈকি। উন্নত গণতান্ত্রিক দেশগুলি এরূপ আইনের সদ্ব্যবহারের মাধ্যমে বহুলাংশে জনগণের শাসন প্রতিষ্ঠায় সক্ষম হইয়াছে। কিন্তু তৃতীয় বিশ্বের অনেক দেশে এই আইন থাকিলেও ততটা কার্যকর নহে। অশিক্ষা ও দারিদ্র্যই ইহার প্রধান প্রতিবন্ধক। বাংলাদেশের দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী এই আইন ও ইহার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে ওয়াকেফহাল নহে। তাহাছাড়া এখনও অধিকাংশ লোকের ইন্টারনেটে প্রবেশগম্যতা নাই। ইহাও অন্যতম সমস্যা। যাহা হউক, বিদ্যমান বাধাগুলি চিহ্নিত করিয়া তাহা অপসারণের চেষ্টা করিতে হইবে। এই ব্যাপারে আমরা নিজেরা যতটা সচেতন হইব, ততই উপকৃত হইতে পারিব। ইতোমধ্যে নবম ও দশম শ্রেণীর পাঠ্যক্রমে এই আইন অন্তর্ভুক্ত করা হইয়াছে। ইহাও একটি বড় অগ্রগতি। অতএব, আইনটি জনস্বার্থে যথাযথ কার্যকরে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা গ্রহণ করিতে হইবে।
