প্রায় সপ্তাহকাল ধরিয়া জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশন মাতাইয়া দেশে পৌঁছিবামাত্র পুষ্প ও ছিন্নপাদুকার মুখোমুখি হইলেন ইরানের নয়া প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি। বর্তমানে বা ভবিষ্যতে কখনোই পরমাণু অস্ত্র নির্মাণ না করিবার অঙ্গীকার করিয়া, যুক্তরাষ্ট্রের তথা পশ্চিমা বিশ্বের সহিত সম্পর্কোন্নয়নের ইচ্ছা প্রকাশ করিয়া, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালে ইহুদী সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে সংগঠিত হলোকাস্টের বিষয়টি স্বীকার করিয়া, এবং সর্বশেষে শনিবার দেশে ফিরিবার সামান্য পূর্বে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সহিত টেলিফোনে আলাপ করিয়া আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোড়ন তুলিয়া দিয়াছেন রুহানি। বিশ্লেষকদের অনেকেই এই কয়দিনে ধরিয়া লইয়াছিলেন যে রুহানির এই সকল কথাবার্তাতে ইরানের মূল ক্ষমতাধিকার অর্থাত্ প্রধান ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি ও তাহার সহযোগীগণের সমর্থন রহিয়াছে। ইরানের দিক হইতে তিন দশকের ব্যবধানে এহেন ব্যতিক্রমী উদ্যোগকে যুক্তরাষ্ট্র ও তাহার মিত্ররা এবং জায়নবাদী ইসরায়েল কিভাবে গ্রহণ করে তাহাই হইয়া উঠিতেছিল দেখিবার বিষয়। কিন্তু শনিবার তেহরান বিমানবন্দরে অবতরণ করিয়া মোটর শোভাযাত্রা সহকারে শহর অভিমুখে রওয়ানা হইবার প্রাক্কালে পরস্পরবিরোধী দুই প্রতিক্রিয়া রুহানির যুক্তরাষ্ট্র অবস্থানকালের কথাবার্তার ব্যাপারে কিছুটা ভিন্ন ভাবনার জন্ম দিতেছে।
শনিবার বিমানবন্দর হইতে শহর অভিমুখী কয়েকশত সমবেত জনতার একটি অংশ রুহানিকে ফুলেল শুভেচ্ছা জানায়, তাহারা রুহানির নামে জয়ধ্বনি দেয়। কেউ কেউ রুহানিকে “শান্তির বাদশা” আখ্যায়িত করা প্ল্যাকার্ড উচ্চে তুলিয়া ধরে। সাংবাদিকদের সহিত আলাপকালে সমর্থকদের অনেকেই আশা প্রকাশ করেন যে রুহানির বক্তব্যের ধারাবাহিকতাতে ইরানের সহিত পশ্চিমের বিবাদের মীমাংসা হইবে এবং তাহাদের দেশের উপরে বত্সরের পর বত্সর ধরিয়া জাঁকিয়া বসিয়া থাকা নিদারুণ অর্থনৈতিক অবরোধের অবসান ঘটিবে। সম্পর্ক উন্নয়নের মধ্য দিয়া ইরানের ভঙ্গুর-প্রায় অর্থনীতির পুনর্গঠনের আশাবাদও ব্যক্ত করেন এইসব লোকেরা। কিন্তু ঘটনা এইখানেই শেষ হয় নাই - তেহরান বিমানবন্দরে উপস্থিত ইরানীরা সকলে রুহানিকে অভিনন্দন জানাইতে আসেন নাই। তাহাদের মধ্যে দুই-একজন রুহানির উদ্দেশ্যে ছিন্ন-পাদুকা ও ডিম্ব নিক্ষেপ করেন; কেহ কেহ নিন্দাসূচক প্ল্যাকার্ড বহন করেন। তাহারা যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপারে শিথিল মনোভাব দেখাইবার জন্য রুহানিকে অভিযুক্ত করেন।
পুলিশ জানাইয়াছেন যে, বিমানবন্দরে জনতার উপস্থিতিটি ছিল স্বতঃস্ফূর্ত। কিন্তু বিশ্লেষকদের অনেকের মধ্যেই এই ব্যাপারে ভিন্নমত দেখা যাইতেছে। কেননা, ইরান যে কোন ধরণের সভা-সমিতি-জমায়েতের ব্যাপারে সরকারের কড়া নজরদারী কার্যকর রহিয়াছে। এমতাবস্থাতে প্রেসিডেন্টের আগমনকালে বিমানবন্দরের কড়া নিরাপত্তার মধ্যে আচমকা কয়েক শত লোক জড়ো হইয়া পক্ষে-বিপক্ষে শ্লোগান দিতে থাকা, পুষ্প কিংবা পাদুকা ছুঁড়িয়া মারিবার মত ব্যাপারগুলি ঠিক স্বাভাবিক বলিয়া মনে করিতেছেন না অনেকে। তাহা হইলে কি ধরিয়া লইতে হইবে যে, বিমানবন্দরের অনভিপ্রেত ঘটনাটির মধ্য দিয়া ক্ষমতাসীন চক্রের কোন একটি অংশ রুহানির তত্পরতার ব্যাপারে নিজেদের আপত্তি থাকিবার কথা জানান দিয়াছে এবং তাহাদের শক্তিমত্তার চিহ্ন রাখিয়াছে? ইরানী ক্ষমতাচক্রের কোন একটি অংশ ইরানের সহিত যুক্তরাষ্ট্র তথা পশ্চিমা বিশ্বের সম্পর্কোন্নয়ন কিংবা গত তিন দশক ধরিয়া চলিয়া আসা বিদেশনীতি বা প্রচার-প্রোপাগান্ডার হঠাত্ অবসান হইয়া যাইবার ব্যাপারে অস্বাচ্ছন্দ্যে রহিয়াছে কি? স্মর্তব্য, সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমেদেনিজাদের সময়ে যুক্তরাষ্ট্র, পশ্চিমা বিশ্ব ও ইসরায়েলবিরোধী কথাবার্তাকে বিশেষ এক পর্যায়ে লইয়া যাওয়া হইয়াছিল। ইহা হইয়া উঠিয়াছিল ইরানী পররাষ্ট্রনীতির মূল বৈশিষ্ট্য। রুহানির কথাবার্তায় পরিবর্তনের চিত্র ফুটিয়া উঠিতেছিল। কিন্তু শনিবারের ঘটনা পুরানো চিত্র নূতন করিয়া স্মরণ করাইয়া দিল। মূল ক্ষমতাধিকারীরা রুহানিকে নূতন পথে হাঁটিতে দিবেন নাকি এতদিনকার পুরানো পথেই হাঁটাইবেন তাহা দেখিবার জন্য অপেক্ষায় থাকা ভিন্ন অন্য পথ নাই।
