নারী নির্যাতন কেন হয়

আপডেট : ৩০ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ২১:৩০
আমরা নারীদের অধিকার চাই। বাংলাদেশে নারী অধিকার আদায়ে বিভিন্ন সংগঠন মাঠে রয়েছে। নারীরা বিভিন্ন সময় তাদের অধিকার রক্ষার জন্য রাজপথ উত্তালও করেছে। বিভিন্ন দাবি নিয়ে রাস্তায় মানববন্ধন করে গলা ফাটিয়ে বক্তৃতাও করছে। কিন্তু নারীর প্রতি নির্যাতন কমছে না। এখনো প্রতিদিন প্রতিমুহূর্ত নারীরা নির্যাতিত হচ্ছে। ধর্ষণের শিকার হচ্ছে। কর্মক্ষেত্রে নারী উত্ত্যক্ত হচ্ছে। লোকাল বাসে যাত্রী হয়ে উঠলে বাসের হেলপার-এর কাছ থেকে অসৌজন্যমূলক আচরণ পাচ্ছে। চলাচলের রাস্তা থেকে নারীকে তুলে নিয়ে নির্যাতন করা হচ্ছে। ধর্ষণের পর বস্ত্রহীন অবস্থায় লাশ পাওয়া যাচ্ছে। কখনো ধর্ষণের পর লাশ খুঁজে না পাওয়ার নজিরও রয়েছে আমাদের দেশে। অবশ্য আধুনিক সভ্যতার দেশ ভারতের তুলনায় আমাদের দেশে ধর্ষণের পরিমাণ হয়তো কিছুটা কম। ভারতীয় সংবাদ মাধ্যম সূত্রে জানা গেছে ওই দেশে না কি প্রতি ২০ মিনিটে একজন নারী ধর্ষণের শিকার হয়ে থাকে। আমার প্রশ্ন হচ্ছে বাংলাদেশে এতো বড় শক্তিশালী নারী সংগঠনগুলো মাঠে সক্রিয় থাকার পরও কেন নারীর প্রতি নির্যাতন ও ধর্ষণ কমছে না? সমপ্রতি ২৩ আগস্ট মুম্বাই থেকে বাংলাদেশে বাড়ি ফেরার পথে স্বামী ও ছয় বছর বয়সী ছেলের সামনেই ৩০ বছর বয়সী বাংলাদেশি নারী বিএসএফ সদস্যদের কর্তৃক ধর্ষণের শিকার হন। গত জুলাই মাসের ওই ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে ক্ষতিপূরণের পাশাপাশি দোষী বিএসএফ সদস্যদের শাস্তির আওতায় আনার দাবি জানিয়েছে পশ্চিমবঙ্গের মানবাধিকার সংস্থা ‘বাংলার মানবাধিকার সুরক্ষা মঞ্চ’ (মাসুম) । সামাজিক অবক্ষয়, মাদকের বিস্তার, কর্মহীনতা, আকাশ সংস্কৃতির নেতিবাচক প্রভাব, পর্নো ছবির অবাধ বিক্রি সর্বোপরি নারীর প্রতি সহিংসতায় আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে নারী ও শিশু ধর্ষণের ঘটনা। ধর্ষণের সঙ্গে জড়িতরা হয়ে পড়ছে অপ্রতিরোধ্য। তাদের থামানোর যেন কেউ নেই। শিশু, কিশোরী, যুবতী, বৃদ্ধা, স্কুল ছাত্রী, পোশাক কর্মী, ডাক্তার, আইনজীবী এমন কি ভিখারিনীও রেহাই পাচ্ছে না ধর্ষণের কবল থেকে। মেয়ের জামাই কর্তৃক জোরপূর্বক শাশুড়ী ধর্ষণের খবরও আমাদের শুনতে হয়। আবার প্রবাসী শ্বশুরের অনুপস্থিতিতে শাশুড়ীর সঙ্গে যৌন সম্পর্কে জড়িয়ে জামাইয়ের সহযোগিতায় মেয়েকে গলাটিপে হত্যার ঘটনাও পত্রিকায় প্রকাশ পায়। এটি কোনো প্রতিবেশী দেশের তথ্য নয়, ৯০ ভাগ মুসলমানের দেশ বাংলাদেশের একটি চিত্র। এখন প্রশ্ন আসতে পারে ধর্ষণ কেন হয়? যারা ধর্ষণ করে তারা কারা? কী তাদের পরিচয়। যারা ধর্ষিতা হচ্ছেন তারা কারা? ধর্ষণের প্রকৃত কারণ কী? নারী ধর্ষণের জন্য আমি দুটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ উল্লেখ করতে চাই। এক. সমাজের মানুষ নিজ নিজ ধর্মের অনুসরণ না করা। দুই. নারী নিজেকে চোক্ষু শোভা করে ঘর থেকে বের হওয়া। আমরা যদি একটু বিস্তারিতভাবে বলি তাহলে বলবো পৃথিবীর সব ধর্মই নারীকে সম্মান করতে শিখায়। কোনো ধর্ম গ্রন্থই নারী দেহ সব মানুষের কাছে দৃষ্টিনন্দন করে উপস্থাপন করতে বলেনি। সব ধর্মেই নারীকে সংযত পোশাক পরতে বলা হয়েছে। আমরা যদি খবর নিয়ে দেখি যে, এ পর্যন্ত দেশে যত নারী ধর্ষিতা হয়েছে তারা স্ব স্ব ধর্ম পালনকারিনী ছিলেন কী-না? যারা ধর্ষিতা হয়েছে তাদের কত ভাগ ধর্ম পালন করেন? যারা ঘর থেকে বের হওয়ার সময় এমন পোশাক পরেন যে ওই দিকে কোনো বখাটে যুবকের দৃষ্টি পড়লে ওই যুবক উত্তেজিত হয়। কোনো যুবতীকে দেখলেও তাকে ভোগ করার কামনা করাটা যেমন বখাটেপনা আবার কোনো নারী অসংযত পোশাক পরে রাস্তায় বের হওয়াটাও নির্লজ্জতা। এ ধরনের পোশাকও বখাটেদের উত্তেজিত করতে সাহায্য করে। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় নৈতিকতা শিক্ষা দেয়ার ক্ষেত্রে বেশি জোর দেয়া হয়নি। ধর্ম শিক্ষা নেই বললেই চলে। এক সময় স্কুল ও কলেজে সপ্তাহে এক দিন ধর্ম ও নৈতিকতা শিক্ষা দেয়া হতো। আর এখন ধর্ম চর্চা করা হলে তাকে উগ্রপন্থি অথবা মৌলবাদী বলে সন্দেহ করা হয়। এখন পবিত্র কোরআন, গীতা, বেদ ও বাইবেলসহ বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থগুলো অধ্যয়ন করেন না এসব গ্রন্থের কথিত অনুসারীরা। ফলে সমাজে নানাবিদ অঘটন ঘটে। অনেকে আইনের শাসনের কথা বলে। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা হলে নারী আর ধর্ষণের শিকার হবে না। অধিকার ফিরে পাবে প্রত্যেক নারী। কিন্তু আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্যও দরকার নৈতিকতা। যে সমাজে নারীকে কোনো সম্মান করা ছিল না। নির্যাতন করা হতো নারীকে। কন্যা সন্তান জন্ম নিলে জীবন্ত কবর দেয়া হতো সেই সমাজে নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য পাঠানো হয়েছিল মুহাম্মদ মোস্তফা স. কে। যিনি নারীকে দাসত্বের জীবন থেকে রাণীর আসনে বসিয়ে ছিলেন। এমন একটি সমাজ প্রতিষ্ঠা হয়েছিল যে সমাজে একজন নারী গভীর রাতে মরুভূমিতে একাকী পথ চলেছে তাদের মনের মধ্যে আল্লাহ ছাড়া কারো ভয় ছিল না। নৈতিক মানসম্পন্ন একদল দক্ষ নেতৃত্ব রাষ্ট্র পরিচালনায় না থাকলে একটি সুন্দর সমাজ দেখার ইচ্ছা স্বপ্নই থেকে যাবে। লেখক :সদস্য সচিব নারী উন্নয়ন পরিষদ [email protected]

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন