‘দিস ইজ স্টুপিড গভর্মেন্ট’

আপডেট : ০১ অক্টোবর ২০১৩, ২১:৩৬
যুক্তরাষ্ট্রের ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকানদের জেদাজেদিতে বাজেট জটিলতায় পড়েছে দেশটি। ডেমোক্র্যাট সংখ্যাগরিষ্ঠ সিনেট ও রিপাবলিকান সংখ্যাগরিষ্ঠ হাউজ অব রিপ্রেজেনটেটিভ বা প্রতিনিধি পরিষদ হওয়ায় এবং উভয় দলের নেতারা প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার স্বাস্থ্য বিলের ব্যাপারে কোন সমঝোতায় আসতে না পারায় শেষপর্যন্ত পহেলা অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া নতুন অর্থবছরের বাজেট পাস করা সম্ভব হয়নি। ফলে কেন্দ্রীয় সরকারের ‘নন এসেনশিয়াল’ শ্রেণীভুক্ত সরকারি সেবা বন্ধ হয়ে গেছে। এতে মার্কিন প্রশাসন অনেকাংশে অচলাবস্থার মধ্যে পড়েছে। জনগণ পড়েছেন বিপাকে। যুক্তরাষ্ট্র যেখানে সারাবিশ্বে নিয়ম-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার কথা বলে, সেখানে এ ধরনের অচলায়তন ভয়াবহ ও অপ্রত্যাশিত। ১৭ বছর আগে এরকম এক পরিস্থিতি ২১ দিন স্থায়ী হয়েছিল। এবার কতদিনের জন্য সরকারি কার্যক্রমের কিয়দংশ শাটডাউন বা বন্ধ থাকছে তা বোঝা যাচ্ছে না। গত ৩০ সেপ্টেম্বর দিবাগত মধ্যরাত থেকে এই অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। এই প্রেক্ষিতে সিএনএন চ্যানেলে প্রখ্যাত আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক ফরিদ জাকারিয়া তাত্ক্ষণিক এক সাক্ষাত্কার প্রদান করেন। তিনি এই সাক্ষাত্কারে যুক্তরাষ্ট্রের এই উদ্ভূত পরিস্থিতি এবং সেই দেশের অর্থনৈতিক ও বিনিয়োগ ভবিষ্যত্ নিয়ে সারগর্ভ আলোচনা করেন। আমেরিকার সরকার একের পর এক সংকটে নিপতিত হচ্ছে। এজন্য আমেরিকাবাসীকে চরম মূল্য দিতে হবে। এ ব্যাপারে প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী লিওন প্যানেটা সমপ্রতি প্রকাশিত তার এক উপ-সম্পাদকীয়তে বিশদভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি লিখেছেন, ‘এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকগণ আমাদের শাসন ব্যবস্থার প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলবে। সারাবিশ্ব দেখবে যুক্তরাষ্ট্র আর আগের একচ্ছত্র শক্তিতে ফিরে আসতে সক্ষম নয়।’ বিশ্ববাসীর দৃষ্টিতে ওয়াশিংটনের এই আভ্যন্তরীণ সংগ্রাম আমাদের ভাবমূর্তি কতটা ক্ষতিগ্রস্ত করবে বলে আপনি মনে করেন? আমি মনে করি, এই পরিস্থিতি আমাদের জন্য ক্ষতির কারণ হবে। এই মুহূর্তেও আমাদের কোন প্রতিযোগী নেই। তাই মনে করা যেতেই পারে, আমরা উপর্যুপরি সংকট মোকাবেলা করতে পারি। বর্তমান সংকটের জন্যও খুব বেশি মূল্য দিতে হবে না। কেননা বিশ্বমন্দার ধকল কাটিয়ে উঠে আমেরিকার অর্থনীতি দিন দিন উন্নতি হচ্ছে। কিন্তু এখানে দুটি বিষয় ভাবার দরকার আছে। প্রথমত আমেরিকার সরকারের বিশ্বাসযোগ্যতা। ডলার হচ্ছে পৃথিবীর রিজার্ভ কারেন্সি। এছাড়া আমাদের ট্রেজারি বিলগুলো বিশ্বের রিজার্ভ বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচিত। আমরা এই বাস্তবতা থেকে ব্যাপক উপকৃত হচ্ছি। যদি নাটকীয়ভাবে তার পরিবর্তন হয় এবং জনগণ এর কার্যকারিতার ব্যাপারে একবার আশঙ্কা প্রকাশ করতে শুরু করে, তবে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সমূহ বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়াবে। দ্বিতীয়ত সকল প্রকার ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট বা সংকট ব্যবস্থাপনার সময় আমাদের দীর্ঘমেয়াদি কী পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত সে ব্যাপারে কেউ কিছু বলছেন না। আমরা শিক্ষা, অবকাঠামো ও বিশেষত মৌলিক বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে বিনিয়োগ স্বল্পতায় ভুগছি। অথচ এই ধরনের মূলধনই প্রবৃদ্ধির সহায়ক। এটা সকলের জানা, আমেরিকার জনগণ এখন বড় বা ছোট সরকারের শ্লোগান আর দেয় না। তাদের দাবি হল স্মার্ট গভর্মেন্ট। সরকারকে বুদ্ধিমান ও দক্ষ হতে হবে। এখন আমরা যা করছি সম্পূর্ণ তার বিপরীত। বাজেট নিয়ে জটিলতার যে সৃষ্টি হয়েছে তা একটি স্টুপিড গভর্মেন্টের কাজ। ওয়াশিংটনে বসে আপনি যখন সরকারকে স্টুপিড বলছেন, তখন একই সঙ্গে সারা পৃথিবী জুড়ে যা ঘটছে প্রকৃতপক্ষে তার সাথে কি এর কোন যোগসূত্র আছে? উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, কেনিয়ায় সন্ত্রাসীরা একটি শপিংমলে হামলা করে ৬০ জনেরও বেশি মানুষকে হত্যা করেছে। পৃথিবী জুড়ে সফট বা নিরীহ গোছের দেশগুলোতে এই ধরনের হামলা ব্যাপক ভয়-ভীতির সৃষ্টি করছে। আর যুক্তরাষ্ট্রে একটার পর একটা সংকট লেগেই আছে। এতে সন্ত্রাসীরা কি উত্সাহিত হচ্ছে না? আল কায়েদা নেতা আইমান আল জাওয়াহিরি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র যাতে নিরাপত্তাখাতে অধিক ব্যয় করতে বাধ্য হয়, এজন্য তিনি তার অনুসারীদের উত্সাহিত করছেন। তার ভাষায়, ‘অর্থনৈতিকভাবে আমেরিকার রক্ত ঝরাও’। বাজেট নিয়ে আমাদের সকল তর্ক-বিতর্কে কি অর্থনৈতিক সেই ঝুঁকি মোকাবেলার কোন কথা আছে? আমি মনে করি, জনগণ দেখছেন যে, আমাদের সরকার অকার্যকর। তারা এও দেখছেন, আমরা আমাদের কাজ একত্রে বসে আলাপ-আলোচনা সাপেক্ষে আর করতে পারছি না। আমাদের কোন কৌশলগত পরিকল্পনা নেই ইত্যাদি। তবে আমি আইমান জাওয়াহিরির ব্যাপারে খুব একটা উদ্বিগ্ন নই। তিনি আগামী বছরগুলোতেও নাশকতায় কোন নতুন সুর সংযোজন করতে পারবেন না। কেননা আল কায়েদার কেন্দ্রীয় নেতৃত্বাধীন যেসব সন্ত্রাসী নাইন ইলেভেনের পরিকল্পনা করেছিল, প্রকৃত পক্ষে তারা এখন জাহান্নামে গেছে। আমেরিকার ড্রোন বিমান হামলায় অনেক নেতার মৃত্যু হয়েছে। আর অন্য নেতাদের আমরা পিছুটানে বাধ্য করেছি। তাহলে জাওয়াহিরির বক্তব্য কেবলই আমাদের অপমান করা, এর বেশি কিছু নয়। তিনি কেবল চেষ্টা করছেন যাতে কিছু একটা ঘটে। প্রকৃতপক্ষে তিনি যা করতে পারেন তাহলো এ ধরনের শপিং মলে গিয়ে কাউকে হামলার জন্য উত্সাহিত করা। এর বেশি কিছু নয়। কেননা তার পরিকল্পনারও সেই শক্তি নেই। এটা তার ভালমতই জানা। যাহোক, এভাবে কাউকে হামলায় উত্সাহিত করাটাকেও আমি ঘৃণা করি। যদি আমরা এখন থেকে নিরাপত্তা খাতে অধিক ব্যয় করি, তাহলে এটা অর্থনীতির জন্যও কল্যাণজনক হবে। অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করার জন্য বেশি বেশি খরচ ও ভোগের দরকার আছে। সম্প্রতি রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন নিউইয়র্ক টাইমসের এক সাক্ষাত্কারে প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ও তার নীতির সমালোচনা করেছিলেন। তার কোন কোন বক্তব্য মার্কিন জনগণের বিরুদ্ধে গেছে। অন্যদিকে ২০০৮ সালের নির্বাচনে রিপাবলিকানের প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী সিনেটর জন ম্যাককেইন তার কড়া জবাব দেন। একটি উপ-সম্পাদকীয়তে তিনি পুতিনের বিরুদ্ধে লিখেন, ‘আমি বিশ্বাস করি আপনাদের জীবন-যাপনের মানোন্নয়নে এমন এক অর্থনীতি নির্মাণের সুযোগ আছে, যাতে তা স্থায়ী রূপ লাভ করে এবং অধিক সংখ্যক লোকের উপকারে আসে। শুধু কিছু ক্ষমতাবান মানুষ যাতে উপকৃত না হয়।’ এই কথা বলে তিনি পক্ষান্তরে রাশিয়ার জনগণের নিকট এমন এক অর্থনীতির কথা বলেন যেখানে সকলে উপকৃত হবে। এখন আমরা একটি পরিসংখ্যান দেখি। ১৯৮৯ সালে যে বছর বার্লিন ওয়ালের পতন হয়, তখন আমেরিকার দারিদ্র্য হার ছিল ১২.৮ ভাগ। আর গত বছর এই হার ছিল ১৫ ভাগ। তাহলে এটা কিভাবে হল? দেখুন, আমরা রাশিয়ার জনগণের তুলনায় অনেক দিক থেকেই ভাল আছি। তারপরও একটা জায়গায় আপনার যুক্তি অকাট্য। বিশ্বায়ন, প্রযুক্তিগত পরিবর্তন, অর্থনৈতিক জ্ঞান বৃদ্ধি—এসবই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিজয়ী হওয়ার ক্ষেত্রে সহায়তা করে। প্রভাবিত করে সকল পদ্ধতিকে। কিন্তু আমরা কেন শিক্ষা, দিবাযত্ন ইত্যাদিতে সরকারি বিনিয়োগ বাড়াচ্ছি না? আমরা জানি, স্কুলগুলোতে মার্কিন নাগরিকদের অনেকেই ভাল করেত পারছেন না। তার অর্থ হল তারা একটি ভাল কলেজে ভর্তি হতে পারছেন না। এই প্রবণতা আমাদের বন্ধ করতে হবে। আবারও আমি এর জন্য দায়ী করি আমাদের স্টুপিড বা নির্বোধ সরকারকে। আমরা আমেরিকায় গরীব লোকের জন্য খুব বেশি অর্থ ব্যয় করি না। আমরা ভাবি, আমরা করি। কিন্তু আসলে করি না। বরং আমরা মধ্যবিত্তের জন্য অনেক ব্যয় করি। তাদের জন্য আমাদের অনেক সাবসিডি দিতে হয়। বাজেটে নতুন ট্যাক্স কি সেই নিয়ম ভেঙ্গে দিচ্ছে? এটা কিছু ধনী লোকের সমস্যা। কিন্তু গরীবরা সত্যিকার অর্থে উপেক্ষিত। এটা এক ধরনের কেলেঙ্কারি বৈ আর কিছু নয়। এটা পরিষ্কার যে, দেশ সর্বোতভাবে প্রস্তুত। সবচেয়ে শিক্ষিত কর্মশক্তি আমাদের সাফল্য ধরে রাখতে সহায়তা করতে পারে। তাই যদি হয়, তবে আমাদের পরবর্তী নেতাকেও হতে হবে সবচেয়ে কর্মশক্তির অধিকারী। আমরা কি আমাদের সেই কর্মশক্তি বৃদ্ধিতে বিনিয়োগ করছি? একটি ভাল কর্মশক্তি বলতে আসলে কি বোঝায়? এর মানে হল আমাদের দরকার সকলকে শিক্ষিত করে তোলা। এজন্য দরকার কর্মরতদের পুনঃপ্রশিক্ষণ দেয়া। কেননা দক্ষ জনশক্তির অভাবে আমাদের কিছু কর্মসংস্থান হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে। কিছু শিল্প-কারখানা চীনসহ বিভিন্ন দেশে চলে যাচ্ছে। আমরা প্রাথমিক শিক্ষায় খুবই খারাপ করছি। আমরা মাধ্যমিক শিক্ষায় খারাপ করছি। এরপর আমরা চাকরির প্রশিক্ষণে গিয়ে খারাপ করছি। এসমস্ত ক্ষেত্রে অনেক সংস্কার দরকার। যেখানে আমাদের অধিক অর্থ ব্যয় করতে হবে, সেখানে আমরা তা করছি না। ওয়াশিংটন তা করছে বলে আমি মনে করি না। (ঈষত্ সংক্ষেপিত) ভাষান্তর : ফাইজুল ইসলাম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন