কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আইনের কমতি এবং সেসব বিষয়ে মাননীয় আইনসভা ও আইন কমিশনের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য বর্তমান লেখাটির বিশেষ অবতারণা। বাংলাদেশের প্রচলিত রাষ্ট্রীয় ও ধর্মীয় আইনগুলোতে বেনামে ও যৌথভাবে অর্জিত সম্পত্তির বিষয়টি পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। আমাদের দেশে সম্পত্তির মালিকানা, উত্তরাধিকার মূলত মিশ্রভাবে রাষ্ট্রীয় ও ধর্মীয় আইনের সমন্বয়ে বিক্ষিপ্তভাবে নির্ধারিত হয়। আর এক্ষেত্রে যৌথভাবে অর্জিত সম্পত্তির সূক্ষ্ম ও গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয় আইনী সমাধানের বাইরে থেকে যায় যেহেতু বিশেষ কিছু ক্ষেত্রে যথোপযুক্ত আইন নেই বাংলাদেশে। যেমন- যৌথভাবে সম্পত্তি অর্জন করা যায় বিভিন্ন উপায়ে। দুই বা ততোধিক ব্যক্তি ক্রয়, উত্তরাধিকার, চুক্তি ইত্যাদির মাধ্যমে যৌথ সম্পত্তির মালিক হতে পারে। উত্তরাধিকার সূত্রে যৌথ সম্পত্তির মালিক হলে তা ধর্মীয় আইন দ্বারা নির্ধারিত হয়। কিন্তু সমস্যা সৃষ্টি যখন ক্রয় বা চুক্তির মাধ্যমে যৌথভাবে সম্পত্তির মালিক হয়। আমাদের দেশে ক্রয়ের মাধ্যমে সম্পত্তির মালিক হয় কোন ব্যক্তি কতটুকু ভাগ পাবে তা বিক্রয় দলিলে বা আলাদা চুক্তিতে ক্রয়ের পূর্বে বা ক্রয়ের সময়ে নির্ধারণ করে নিতে হয়। যদি তা না করা হয় তাহলে দেশিয় আইনে প্রতিকার পাওয়ার সে ধরনের কোন ব্যবস্থা নেই। টাইটেল/ঘোষণা সত্ত্বের মামলা (suit for declaration under section 42 of Specific Relief Act, 1877 read with section 151 of the Code of Civil Procedure, 1908) করলে বিচারক তার নিজস্ব বিচার ক্ষমতা প্রয়োগের মাধ্যমে এধরনের সমস্যার সমাধান করতে পারে। তাহলে প্রশ্ন হল, এখানে আইনের ঘাটতি কোথায়? একটি বাস্তবিক সমস্যার উদাহরণ দেয়া যাক। দুই ভাই, জামাল ও কালাম । জামালের বয়স ২৭ এবং সে ভাল একটি চাকরি করে। অপরদিকে কালামের বয়স কেবল ১৮, সে পড়াশুনা করে। বড় ভাই ছোট ভাইকে অত্যন্ত স্নেহ করে দু’জনার নামেই ১০ কাঠার একটি সম্পত্তি ক্রয় করে। উল্লেখ্য যে, এখানে সম্পত্তির পুরোটা বড় ভাইয়ের অর্থেই ক্রয় করা হয়েছে। যেহেতু, আমাদের দেশে যৌথ মালিকানা (Joint Tenancy) ও যৌথএকক মালিকানা (Tenancy-in-Common) এর মত কোন ধারণা (Concept) নেই। তাই সমস্যা দাঁড়ায় এমন যে, বড় হয়ে ছোট ভাই যখন আলাদা মালিকানা দাবি করে তখন সম্পত্তির বন্টন ঠিক কি রকম হওয়া উচিত? আমাদের প্রচলিত আইন অনুযায়ী দু’ভাইকে সমান সমান দেয়া হবে। কিন্তু এতে কি প্রকৃত অর্থে ন্যায় বিচার হচ্ছে ? এখন সমস্যাটি এভাবে চিন্তা করা যাক। জামালের স্থলে চাকরিজীবী স্বামী আর কামালের স্থলে গৃহিনী স্ত্রী। স্বামী সম্পত্তি ক্রয় করল কেবল স্ত্রীর নামে (অথবা বেনামে)। এমন সমস্যার সমাধান কি হবে? যে ব্যক্তি তার সমস্ত পুঁজি, পরিশ্রম ঐ সম্পত্তিতে বিনিয়োগ করল তার কি ধরনের বিচার পাওয়া উচিত! সে বেশি ভালবেসে ছোট ভাই বা স্ত্রীর নামে সম্পত্তি কিনেছে আইনের অধীনে এটাই কি তার অন্যায় ? তাই এর শাস্তি হিসেবে সে আর ঐ সম্পত্তিতে কোনরূপ মালিকানা দাবি করতে পারবে না। এটা কি হওয়া উচিত? অথবা যে ব্যক্তি বেনামে সম্পত্তি ক্রয় করেছে তার প্রকৃত বিনিয়োগ (real cost/ consideration) কে কি কোনভাবেই গ্রহণ করা বা আইন দ্বারা স্বীকৃতি দেয়া যাবে না? এখন দেখা যাক পৃথিবীর অন্যান্য দেশ এই সমস্যাটির সমাধান কিভাবে করে থাকে। ইংল্যান্ড, আমেরিকা ও ফ্রান্সে এই ধরনের সমস্যার সমাধান ছোট ও সহজ একটি উপায়ে করা হয়। যদি দুই বা ততোধিক ব্যক্তি ক্রয়কৃত সম্পত্তি যৌথ মালিকানায় অর্থাত্ Joint Tenant হিসেবে অর্জন করে তাহলে একজন মালিক মারা গেলে অপরজন পুরো সম্পত্তির মালিক হবে। এটাকে বলা হয় Rule of Survivorship। তবে এটা খুব কম হয়। কেননা, এধরনের ক্ষেত্রে দুই বা ততোধিক ক্রেতার ইচ্ছাশক্তি (intention of purchase of land) খুব নির্দিষ্ট ও পরিষ্কার (definite/clear/ conspicuous/ specific) হতে হয় এবং আইনানুযায়ী কিছু শর্তও পূরণ করতে হয় (conditions under law)। এর ব্যতিরেকে আইন ধরে নেয় দুই বা ততোধিক ব্যক্তি যৌথ সম্পত্তি Tenancy-in- Common হিসেবে অর্জন করে অর্থাত্ যে যার সম্পত্তি/অংশ পাবে এবং একজন মারা গেলে তার উত্তারাধিকারগণ তার অংশের/সম্পত্তির মালিক হবে। এক্ষেত্রে Rule of Successorship প্রযোজ্য হয় এবং সেক্ষেত্রে আমাদের দেশের মত লিখিত হওয়ার প্রয়োজন নেই।
তাহলে প্রশ্ন হল, কিসের ভিত্তিতে/কি কি ব্যাপার বিবেচনায় এনে এই যৌথ সম্পত্তির মালিকানা/হিস্যা নির্ধারণ করা হয়। মূলত ঐ জমি অর্জন অর্থাত্ ক্রয়ের পিছনে তার কত প্রকৃত বিনিয়োগ রয়েছে - সেটাকেই মুখ্য মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করা হয় (based on real cost/consideration)। এক্ষেত্রে জমি কার নামে ক্রয় করা হয়েছে সেটা গুরুত্বপূর্ণ নয় বরং কার প্রকৃত বিনিয়োগ বেশি সেই বিষয়টা গুরুত্বপূর্ণ। অপরদিকে যদি এমন হয় একজন কিছু বা অর্ধেক বা বেশি অর্থ দিয়ে জমি ক্রয় করেছে কিন্তু অন্যজন ঐ জমির উপর বাড়ী করতে বা ঐ জমির সার্বিক উন্নয়নে বেশি অবদান রেখেছে সেইসব বিষয়গুলোও ঐ জমির মালিকানা নির্ধারণে অবশ্যই বিবেচনা করা হয়। আবার যদি এমন হয় দাম্পত্যকালীন সময়ে জমিটি ক্রয় করা হল, একজন জমির টাকা/লোন শোধ করল কয়েক বছর ধরে, আর অন্যজন সেই টাকা পরিশোধে/পূরণে সকল ধরনের সহায়তা প্রদান যেমন- এই কয়েক বছরের সংসারের যাবতীয় খরচ, বাড়ির উন্নয়ন, গ্যাস, পানি, পয়ঃনিষ্কাশনসহ সবকিছুর বিল, খাবার খরচ, সন্তানের দেখাশুনা অর্থাত্ যাবতীয় খরচ প্রদান করলে- সেইসকল বিষয়গুলোও বিবেচনা করা হয়। এক্ষেত্রে কার নামে ক্রয় দলিল করা হয়েছে সেটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। ইদানিংকালে ইংল্যান্ড, আমেরিকার অনেকগুলো মামলায় আদালত এই সকল বিষয়গুলো আমলে নিয়ে ইতিহাস সৃষ্টিকারী সিদ্ধান্ত প্রদান করেছে যেমন- Lloyds Bank Plc v. Rosset, Stack v. Dowden, Amin v. Amin। প্রশ্ন হল, উন্নত আইন ব্যবস্থার দেশগুলোতে মানুষকে সীমাহীন স্বাধীনতা দেয়া হয়েছে তাদের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও ব্যক্তিগত বিষয়গুলো নির্ধারণ করতে। পার্লামেন্ট কর্তৃক প্রণীত আইনের কাঠামোর মধ্যে নিজেদের সকল বিষয় নির্ধারন করা গণতান্ত্রিক দেশের গণতান্ত্রিক চেতনার আদর্শ উদাহরণ হতে পারে না। সেই চেতনা থেকেই মানুষের পারস্পরিক লেনদেন ও সামাজিক সম্পকের্র বিষয়গুলো আইনের সাথে নয় বরং আইন মানুষের আচরণের সাথে সামঞ্জস্য রেখে আবর্তিত হয় (compromise)।
উল্টোটা আমাদের দেশে; যেখানে পারস্পরিক লেনদেন ও সামাজিক সম্পকের্র বিষয়গুলো নির্ধারণে মানুষের কোন স্বাধীনতা (Liberty) নেই; কিন্তু আইনের স্বাধীনতা (Liberty) রয়েছে। উন্নত দেশে মানুষের স্বাভাবিক লেনদেনগুলো যুক্তি (reason) এবং ন্যায় (Just) দ্বারা বিচার (Justify/ Judge) করে ন্যায়-বিচার (Justice) করা হয়। প্রয়োজনে ন্যায়-বিচারের স্বার্থে আইন পরিবর্তন করা হয়, তবুও ন্যায়-বিচার করা হয়। তাই ঐসকল দেশের Justice কেবল প্রয়োগ ও আইনের অধীনেই হয় না বরং বাস্তবিক অর্থে দেখতেও Justice/Just হয়। আইনের সেই ঘাটতি থেকেই আমাদের দেশের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১০৪ এর অধীনে দেশের সর্বোচ্চ আদালত আপীল বিভাগকে Complete Justice এর এখতিয়ার প্রয়োগ করার সুযোগ দেয়া হয়েছে। তবে এই এখতিয়ার খুব কম (বিশেষ বিশেষ/ exceptionally ordinary cases) ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হয়। সাধারণ মানুষের সে পর্যন্ত পৌঁছানোর ক্ষমতা খু্বই ক্ষীণ অর্থাত্ সাধারণ মানুষ Complete Justice হতে বঞ্চিত। প্রশ্ন হল, এটা কেন? আমাদের দেশে বিচারকদের কি সেই সাহস,- যোগ্যতা, শিক্ষা নেই? সীমাবদ্ধতা বা ভয়টা কোথায়! নাকি আইনের ঘাটতিটাই প্রধান? যেহেতু বাংলাদেশ লিখিত আইনের দেশ তাই, যতক্ষণ পর্যন্ত Justice করার নিমিত্তে প্রয়োজনীয় আইন সুস্পষ্টভাবে লিখিত না হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত বিচারকদের এখতিয়ার অনেকটাই কম। তাই এই বিষয়ে মহামান্য আইনসভা ও আইন কমিশনের বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।
লেখক :এ্যাডভোকেট
