পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা গত রবি ও সোমবার তাণ্ডব চালাইয়াছে সারাদেশে। আমাদের মতো তৃতীয় বিশ্বে রাজপথে নামিয়া অরাজকতা, গাড়ি ভাংচুর, জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করিতে পারিলে সরকার যাহা শুনিতে চাহেন না, তাহা শুনিতে বাধ্য হইবে—এমন ধারণা প্রায় বদ্ধমূল হইয়া গিয়াছে। সুতরাং পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থীরা যাহা করিয়াছেন তাহা আমাদের ব্যথিত করিলেও তাহাদের কি দোষ দেওয়া যায়? কেননা, এমন পন্থা যে বেশ কার্যকর তাহা বিগত সময়ের বেশির ভাগ আন্দোলনের মতো এইবারও কার্যকর ফল মিলিয়াছে। অবশেষে তাহাদের দাবি মানিয়া লইবার আশ্বাস দিয়াছে সরকার। সরকার সিদ্ধান্ত লইয়াছে, দেশের পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট প্রকৌশল বিষয়ে ডিপ্লোমাপ্রাপ্তদের কর্মক্ষেত্রে ‘উপ-সহকারী প্রকৌশলী’ হিসাবে বিবেচনার। তাহা বাস্তবায়িত হইলে এই সকল ইনস্টিটিউট হইতে পাস করা শিক্ষার্থীরা চাকরিতে যোগদানের সময় ‘সুপারভাইজার’ নয়, ‘উপ-সহকারী প্রকৌশলী’ হিসাবে নিয়োগ পাইবেন। এই জন্য ২০০৮ সালের এই সংক্রান্ত গেজেটটি সংশোধনের উদ্যোগ লইয়াছে সরকার। সরকারের এমত সিদ্ধান্তের ফলে চলমান এই আন্দোলন কর্মসূচি ১৫ দিনের জন্য স্থগিতের ঘোষণা দিয়াছেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। তাহাদের আরও দুইটি দাবি রহিয়াছে—ডিপ্লোমা প্রকৌশলীদের পদোন্নতির কোটা ৩৩ শতাংশ হইতে বৃদ্ধি করিয়া ৫০ শতাংশ করা এবং তত্সঙ্গে বেতন বৈষম্য দূরীভূত করা।
প্রথম কথা হইল, পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থীদের দাবি ন্যায়সঙ্গত কিনা। দ্বিতীয়ত, তাহা ন্যায্য হইলে সরকার কেন এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করিবে যাহার পরিনামে তাহারা বাধ্য হইবে রাজপথে নামিতে এবং নিজেদের শক্তি প্রদর্শন করিবে সাধারণ মানুষ ও যানবাহনের ওপর? কেননা, কেবলমাত্র গত সোমবারই এই আন্দোলনে আহত হইয়াছেন দুই শতের অধিক মানুষ। বিভিন্ন স্থানে সড়ক যোগাযোগ ব্যাহত হইয়াছে, হঠাত্ রণক্ষেত্রে পরিণত হইয়াছে রাজধানী ঢাকাসহ কুমিল্লা, পটুয়াখালী, বগুড়া, ফেনীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল। রাজশাহীতে গুলিবিদ্ধ হইয়াছে পুলিশ, বগুড়ায় ভঙ্গ করা হইয়াছে ১৪৪ ধারা।
পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থীরা তাহাদের দাবির যৌক্তিকতার প্রশ্নে বলিতেছে, চার বত্সর ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে পড়ালেখা করিবার পর তাহারা ইঞ্জিনিয়ারিং পদবি ব্যবহার করিতে পারিবে না—ইহা ন্যায়সঙ্গত নহে। তাহাদের যুক্তি হইল, ডিগ্রিধারী ইঞ্জিনিয়ারদের এক ধাপ নিচে চাকুরী শুরু করিয়া ২০-২৫ বত্সর পরও তাহাদের একই পদ উপসহকারী প্রকৌশলী হিসাবেই থাকিয়া যাইতে হয়। তাহারা মনে করেন, এইরূপ বৈষম্যের নিয়ম বহাল থাকিলে মেধাবীরা পলিটেকনিকে পড়িতে আসিবে না। জানা যায়, বিষয়টি সমাধানে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় হইতে বারংবার তাগাদার পরিপ্রেক্ষিতে গত বত্সর ২৮ মে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি এবং গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে আটটি মন্ত্রণালয়ের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের লইয়া আরেকটি আন্ত:মন্ত্রণালয় কমিটি গঠিত হয়। শিক্ষা মন্ত্রণালয় গত বত্সরের ৫ জুলাই এবং গণপূর্ত মন্ত্রণালয় ১৭ সেপ্টেম্বর সরকারের নিকট তাহাদের সুপারিশ দাখিল করে। সেই সুপারিশ যদি ইতিবাচক না হইত, তবে গত বত্সরের ২৩ ডিসেম্বর ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের উপজেলা নেতাদের এক সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী পুনরায় একই আশ্বাস প্রদান করিতেন কি? তাহার পর এই বত্সর ২১ আগস্ট শিক্ষাসচিব এই সংক্রান্ত সমস্যা সমাধানে ১৫ দিনের সময় চাহেন। সেই ১৫ দিনের স্থলে এক মাসের অধিক পার হইবার পরই মূলত ফুঁসিয়া উঠিয়াছে পলিটেকনিক শিক্ষার্থীরা।
সময় পুনরায় ১৫ দিন পাওয়া গিয়াছে। এইবারও এই সমস্যা সমাধানে কালক্ষেপণ করিলে তাহার দায় সম্পূর্ণতই সরকারের ওপর বর্তাইবে, তাহাতে কোন সন্দেহ নাই।
