কয়েক বত্সর আগেও দেশে রোগসৃষ্ট মৃত্যুর তৃতীয় কারণ ছিল হূদরোগ। প্রধান ও দ্বিতীয় কারণ ছিল যথাক্রমে সংক্রামক ব্যাধি ও অপুষ্টি। কিন্তু ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, ধূমপান, স্থূলতা, খাদ্যাভ্যাসসহ বিভিন্ন ঝুঁকির কারণে দেশে হূদরোগের হার ক্রমাগত বাড়িতেছে। দেখা যাইতেছে হাসপাতালগুলিতে হূদরোগের কারণেই সর্বাধিক মৃত্যু ঘটিতেছে। স্বাস্থ্য অধিদফতর প্রকাশিত হেলথ বুলেটিন-২০১১ বলিতেছে, আগের এক বত্সরে রাজধানীর বিশেষায়িত পাঁচটি প্রধান হাসপাতালে তিন হাজার ৪০৪ রোগী মারা গিয়াছেন। ইহাদের মধ্যে তিন হাজার ১১০ জনই হূদরোগ ইন্সটিটিউটে মারা যান। জেলা ও উপজেলার হাসপাতালগুলির দিকে নজর ফিরাইলেও দেখা যাইবে, হূদরোগে আক্রান্ত হইয়াই বেশি মানুষ মারা যাইতেছে। কিন্তু এই চিত্রের বিপরীতে দেশে চিকিত্সাসেবা সমপ্রসারিত হয় নাই। সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে হূদরোগ চিকিত্সায় চালু থাকা সেবাকেন্দ্রের সংখ্যা চাহিদার তুলনায় একেবারেই অপ্রতুল। আর, ঢাকার বাহিরে হূদরোগের চিকিত্সাসেবা নাই বলিলেই চলে। ফলে সমগ্র দেশের হূদরোগে আক্রান্তরা চিকিত্সা পাইতে রাজধানীমুখী হইয়া পড়িয়াছেন। উপরন্তু, বয়স্কদের হূদরোগ চিকিত্সাসেবা ধীরগতিতে অগ্রসর হইলেও শিশু হূদরোগ চিকিত্সায় প্রায় কোনোই অগ্রগতি হয় নাই।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য মতে, বিশ্বে প্রতি বত্সর এক কোটি ৭০ লক্ষ মানুষ হূদরোগে মারা যাইতেছেন। আর ওয়ার্ল্ড হার্ট ফেডারেশন বলিতেছে, হূদরোগে যাহারা মারা যাইতেছেন তাহাদের দুই-তৃতীয়াংশই উন্নয়নশীল দেশের বাসিন্দা। কিন্তু আমাদের দেশে সঠিক কত মানুষ হূদরোগে ভুগিতেছেন, সেই সংক্রান্ত নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান নাই। অনুমান করা হয়, দেশের প্রায় ২০ শতাংশ মানুষ হূদরোগে আক্রান্ত। অথচ, দেশের জনসংখ্যার হিসাবে প্রতি পৌনে চার লক্ষ রোগীর জন্য মাত্র একজন কার্ডিওলজিস্ট আছেন। প্রতি ২০ লক্ষ রোগীর জন্য কার্ডিয়াক সার্জন আছেন মাত্র একজন। কার্ডিয়াক অ্যানেসথেসিস্ট ও পারফিউশনিস্ট আছেন হাতেগোনা কয়েকজন। হূদরোগ আক্রান্তদের জন্য দেশের একমাত্র বিশেষায়িত সরকারি চিকিত্সাকেন্দ্র জাতীয় হূদরোগ ইন্সটিটিউটের ধারণ ক্ষমতা ৪১৪ জন। প্রতিদিন গড়ে সেখানে সাড়ে সাতশত রোগী ভর্তি থাকে। বাড়তি চাপের কারণে বারান্দা ও ওয়ার্ডের মেঝেতে রোগীদের থাকিতে হয়। আর, সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলিতে হূদরোগ বিভাগ থাকিলেও চিকিত্সক, জনবল ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি নাই। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নাই চিকিত্সার ব্যবস্থা। অধিকাংশ জেলা সদর হাসপাতালে সেবা চলিতেছে জোড়াতালি দিয়া। উপরন্তু, অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা যায়, রাজধানী ঢাকার বাহিরে মফস্বল কিংবা মাঠ পর্যায়ে কোনো চিকিত্সক যাইতে রাজি হন না। যদিও যান, অবিলম্বে বদলি হইয়া ঢাকায় ফিরিয়া আসেন। সরকারি খাতে কর্মরতদের জেলা বা উপজেলা পর্যায়ে পদায়ন করিলেই বদলির তদবির শুরু হয়। ফলে গ্রামাঞ্চলের রোগীদের চরম বিপদের মুখোমুখি হইতে হয়। হূদরোগে আক্রান্তদের অধিকাংশকেই চিকিত্সার জন্য রাজধানীতে ছুটিতে হয়।
হদরোগ চিকিত্সার এই চিত্র বড়ই আতঙ্কজনক। কার্ডিয়াক সোসাইটি বলিতেছে, দেশে হূদরোগ বিশেষজ্ঞের অভাব নাই, ত্রুটি রহিয়াছে জনবলের সুষ্ঠু ও সুষম ব্যবস্থাপনায়। পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য বিশেষায়িত যন্ত্রপাতি স্থাপনে বড় ধরনের দুর্নীতির কারণেও অব্যবস্থাপনার সৃষ্টি হইতেছে। হূদরোগ চিকিত্সার সীমিত আয়োজন ও জনবলের ঘাটতি বিবেচনা করিয়াই এই অব্যবস্থাপনা কাটাইয়া উঠা অত্যন্ত জরুরি। সেইসঙ্গে, হূদরোগ বৃদ্ধির প্রবণতা বিবেচনায় রাখিয়া দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা লইয়া পর্যাপ্ত চিকিত্সক গড়িয়া তোলা এবং জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে উপযুক্ত অবকাঠামো গড়িয়া তোলাও অত্যন্ত জরুরি বটে। মনে রাখিতে হইবে, সুস্বাস্থ্যবান জনগোষ্ঠীই একটি জাতির সবচাইতে বড় সম্পদ।
