নির্বাচনমুখী রাজনীতিতে সহিংসতার উত্তাপ

আপডেট : ০২ অক্টোবর ২০১৩, ২১:১১
বাংলাদেশের রাজনীতি নির্বাচনমুখী। দেশে এখন চলছে নির্বাচনী আমেজ। বসে নেই সরকারি দল, বিরোধী দল ও অন্যান্য ছোট-খাটো সব রাজনৈতিক দল। সবাই বিজয়ের আশা নিয়ে মেতে উঠেছে জনগণের ভোট পেতে। উত্সাহ-উদ্দীপনা দেখা দিয়েছে যারা নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক দলগুলো থেকে বিভিন্ন রকম সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করেন তাদের মাঝে। দেশের প্রধান বিরোধী দল বিএনপি ইতোমধ্যে দল গোছানোর কাজ সম্পন্ন করে জনমত নিজেদের পক্ষে আনতে প্রাথমিক নির্বাচনী জনসভা আরম্ভ করেছে। দলের প্রধান নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া নরসিংদী, রংপুর, রাজশাহী ও খুলনায় নির্বাচনী জনসভায় ভাষণ দিয়েছেন। বিরোধী দলের এসব জনসভায় দলের মনোনয়ন প্রত্যাশী ও নেতা-কর্মীদের মাঝে ব্যাপক উত্সাহ দেখা গেছে। আগামীতে বিএনপিকে ক্ষমতায় বসানোর অঙ্গীকারও জনগণের নিকট থেকে নেয়া হচ্ছে। অন্যদিকে সরকারি দলও তাদের নির্বাচনী কার্যক্রমে পিছিয়ে নেই। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রায় প্রতিনিয়ত জেলা-উপজেলা পর্যায়ের তৃণমূল নেতা-কর্মীদের সাথে মতবিনিময় সভা করছেন। এছাড়াও সরকারের উন্নয়নমূলক কাজগুলো শেষ হওয়ার পর সেগুলো উদ্বোধন করতে টেকনাফ থেকে তেতুলিয়া ও রূপসা থেকে পাথুরিয়ার প্রতিটি স্থানে যাচ্ছেন এবং সে সব স্থানে জনসভা করে জনগণের সামনে সরকারের উন্নয়ন ও সুশাসনের ফিরিস্তি তুলে ধরে আবার ক্ষমতায় আসর জন্য জনগণের নিকট ভোট চাচ্ছেন। ইতিমধ্যে প্রধানমন্ত্রী ও তার দলের নেতা-কর্মীদের পাশাপাশি নির্বাচনের মাঠ নিজেদের দখলে আনতে মাঠে নেমেছেন প্রধানমন্ত্রীর পুত্র ও তার তথ্য ও প্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা সজিব ওয়াজেদ জয়। তিনিও দেশের বিভিন্ন জেলায় জনসভা করে নিজ দলের নেতা-কর্মীদের চাঙ্গা রাখার পাশাপাশি দেশবাসীর নিকট সরকারের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড তুলে ধরে আগামীতে নির্বাচিত হলে আওয়ামী লীগ জনগণকে কি কি সুবিধা দিবে সে বিষয়ে কথা বলে ভোট প্রার্থনা করেছেন। অন্য রাজনৈতিক দলগুলোও নীরবে-সরবে নির্বাচনী মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন নির্বাচনে জেতার প্রত্যাশায়। বাংলাদেশের কিশোর গণতন্ত্রের জন্য নির্বাচিত ক্ষমতাসীন সরকারের মেয়াদ শেষে জনমানুষের মাঝে নির্বাচনমুখী এমন উত্সাহ-উদ্দীপনা নিঃসন্দেহে ভাল দিক। আশার দিক। কিন্তু হতাশার দিক হলো বিদ্যমান নির্বাচিত সরকারের মেয়াদান্তে নির্বাচন যথাসময়ে না হওয়া, একতরফা নির্বাচন করা, নির্বাচন প্রতিহত করা, প্রতিহত করতে গিয়ে দেশে ওয়ান ইলেভেনের মত পরিবেশ সৃষ্টি করা কিংবা নির্বাচন না করে ক্ষমতাসীনদের ক্ষমতার মেয়াদ শেষেও ক্ষমতার থাকার চেষ্টা করার আশঙ্কা। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, হতাশার এই দিকগুলোই এখন মানুষের মাঝে ব্যাপকভাবে কাজ করছে। এসব নিয়ে উদ্বিগ্ন সুশীল সমাজ, বুদ্ধিজীবী শ্রেণী, প্রবাসী বাংলাদেশিরা, বিদেশি দাতা সংস্থা ও অন্যান্য সব বন্ধু রাষ্ট্র। মাননীয় বিরোধীদলীয় নেত্রী সাম্প্রতিক সময়ে অনুষ্ঠিত তার জনসভাগুলোতে বলছেন যে, নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যতীত তার দল আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে না। একই সাথে দেশের প্রধান বিরোধী দল ব্যতীত আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের চেষ্টা করা হলে তা প্রতিহত করারও ঘোষণা দেন তিনি। বিরোধী দলের এই অবস্থান অত্যন্ত স্পষ্ট, জোরালো এবং দৃঢ়। কিন্তু তাদের এই দাবি কতটুকু পূরণ হবে কিংবা একতরফা নির্বাচন প্রতিহত করার ক্ষমতা বিরোধী দলের কতটুকু আছে বা রাখে তা এক বড় প্রশ্ন। এর থেকেও গুরুতর প্রশ্ন হলো একতরফা নির্বাচন হলে তা সবার নিকট গ্রহণযোগ্য হবে কিনা তা নিয়ে। কেননা, ১৯৯৬ সালে বর্তমান বিএনপিই তত্কালীন বিরোধী দলবিহীন একতরফা নির্বাচন করেছিল এবং সে নির্বাচন সবার নিকট গ্রহণযোগ্য না হওয়ায় পরবর্তীতে বিরোধী দলের দাবি মেনে নিয়ে এবং বিরোধী দলকে সাথে নিয়ে নতুনভাবে সংসদ নির্বাচন করতে বাধ্য হন তারা। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন কার অধীনে, কোন পদ্ধতিতে অনুষ্ঠিত হবে তা এখনো পরিষ্কার নয়। নির্বাচনকালীন সময়ে সংসদ বহাল থাকবে কিন্তু সাংসদের পাওয়ার থাকবে কিনা, অন্য মন্ত্রীদের পাওয়ার থাকবে কিনা সে বিষয়গুলো নিয়ে এখনো অস্পষ্টতা রয়েছে। এসব বিষয় নিয়ে বিরোধীদল বার বার আলোচনায় বসার প্রস্তাব দিলেও সরকারি দল তাতে সাড়া দিচ্ছে আবার দিচ্ছে না। সমঝোতার জন্য বিদেশিদের তত্পরতাও তেমন কোন কাজে আসছে না। জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুনের নেতৃত্বে সমঝোতার উদ্যোগটি ইতোমধ্যে ভেস্তে গেছে। দোদুল্যমানতার মধ্যে রয়েছে ওয়াশিংটনের সমঝোতার উদ্যোগ। রাজনীতিবিদরা যদি নিজ দেশের রাজনৈতিক সংকট বিদেশিদের তত্ত্বাবধানে নিরসন করতে লজ্জা পান কিংবা ইতঃস্তত বোধ করেন তাহলে তো ভাল। আমরাও চাই না দেশের সংকট বিদেশিদের সহায়তায় সমাধান হোক। আমরা চাই নিজেদের সংকট রাজনীতিবিদরা নিজেরাই সমাধান করুন। যা হোক, প্রকৃত গণতন্ত্র চর্চার স্বার্থে সংঘাতময় পরিস্থিতিকে আমরা ঘৃণা করি। অপছন্দ করি শাসন ক্ষমতার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও ক্ষমতার মসনদে থাকা। সমর্থন করি না বিরোধী দলবিহীন একতরফা নির্বাচন। একইসাথে নির্বাচনকে ঘিরে সকল প্রকার অরাজকতা ও সহিংসতা সৃষ্টি করা কিংবা সৃষ্টি করার পরিবেশ তৈরি করে দেয়ারও বিরোধী আমরা। লেখক : শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রিসার্চ ফেলো, সিআইডি এসএম, ঢাকা

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন