১৯৩৯ সালে ‘ঢাকা ধ্বনি বিস্তার কেন্দ্র’ প্রতিষ্ঠার মধ্যদিয়ে যাত্রা শুরু হয় বাংলাদেশের সম্প্রচার মাধ্যমের। ১৯৬৪ সালের ১৬ ডিসেম্বর জাপানের নিপ্পন কোম্পানীর সহায়তায় পরীক্ষামূলক টেলিভিশন সম্প্রচার শুরুর মধ্যদিয়ে সম্প্রচার জগতে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়। পরবর্তীতে ১৯৬৮ সালে রামপুরায় নিজস্ব ভবনে শুরু হয় টেলিভিশন সম্প্রচার। বেসরকারি পর্যায়ে ১৯৯৯ সালের ১৪ এপ্রিল যাত্রা শুরু করে একুশে টেলিভিশন। বর্তমানে ৩০-এর অধিক সম্প্রচার মাধ্যম বাংলাদেশে কাজ করে যাচ্ছে। সম্প্রচার মাধ্যমের এই দীর্ঘ পথচলা বলা চলে কোনো সম্প্রচার নীতিমালা ছাড়াই চলছিল। তবে আশার দিক হচ্ছে স্বাধীনতার দীর্ঘ ৪২ বছর পর সম্প্রতি খসড়া সম্প্রচার নীতিমালা ঘোষণা করেছে তথ্য মন্ত্রণালয়। দেরিতে হলেও এই উদ্যোগকে যেমনি স্বাগত জানাতে হয়, তেমনি গণমাধ্যমের স্বাধীনতার বিষয়টি চিন্তা করলে আঁেক উঠতে হয়। কারণ উদ্যোগ ভাল হলেও এর মধ্যে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিহিত। কারণ প্রস্তাবিত নীতিমালায় যেভাবে বিধি-নিষেধ আরোপ করা হয়েছে তাতে মনে হচ্ছে নতুনভাবে মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে নিয়ন্ত্রণের অংশ হিসেবেই এ নীতিমালা ঘোষণা করা হয়েছে। একটি নীতিমালা ঘোষণার ক্ষেত্রে কিছু মৌলিক নীতিমালা থাকার প্রয়োজন ছিল কিন্তু তা হয়েছে উপেক্ষিত। মৌলিক নীতিমালায় সম্প্রচার মাধ্যমের মালিকানা, ব্যবহূত ভাষা, লক্ষ্য উদ্দেশ্যের নির্যাস থাকার প্রয়োজন ছিল। কিন্তু নীতিমালা প্রণয়নে এ বিষয়টি খেয়াল করা হয়নি। এক্ষেত্রে এছাড়া নীতিমালায় গণমাধ্যম কর্মীদের যোগ্যতা অযোগ্যতার বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো বক্তব্য দেয়া হয়নি। বাংলাদেশে বিদেশি চ্যানেল প্রচারের কোনো সুস্পষ্ট নীতিমালা স্থান পায়নি এ খসড়া নীতিমালায়। বাংলাদেশে ক্যাবলের মাধ্যমে বেসরকারি টিভি চ্যানেলগুলো দেখার সুযোগ পায় দর্শক শ্রোতারা। কিন্তু ক্যাবল অপারেটরদের বিষয়ে কোনো ধরনের বক্তব্য আসেনি এ নীতিমালায়। এক্ষেত্রে ভারতের ক্যাবল টেলিভিশন নেটওয়ার্কস এ্যাক্ট, ১৯৯৫ অনুসরণ করা যেতে পারে। এছাড়া বাংলাদেশের সম্প্রচার মাধ্যমের অন্যতম উপজীব্য হচ্ছে সংবাদ। সংবাদ পরিবেশনের কোনো বক্তব্যই সুনির্দিষ্টভাবে নীতিমালায় স্থান পায়নি। এক্ষেত্রে ব্রডকাস্ট কোড অব ফিলিপিনস,২০০৭ অনুসরণ করা যেতে পারে। নিউমিডিয়া তথা মাল্টিমিডিয়ার এ যুগে বিশ্বের বেশিরভাগ দেশেই অনলাইনের মাধ্যমে ফুটেজ ও সাউন্ড দর্শক শ্রোতাদের মাঝে উপস্থাপন করা হয়ে থাকে । কিন্তু খসড়া নীতিমালায় এবিষয়টি উপেক্ষিত থেকে গেছে। দেশের বিকাশমান কমিউনিটি রেডিওর সম্প্রচার নিয়ে এ নীতিমালায় কোনো বক্তব্য স্থান পায়নি। উপরন্তু পত্রিকার আদলে প্রাইভেট চ্যানেলগুলো বিজ্ঞাপন সংগ্রহের ক্ষেত্রে যে অবাধ স্বাধীনতা লাভ করতো। সেক্ষেত্রে বিধি-নিষেধ আরোপ করা হয়েছে সচেতনভাবে।
প্রস্তাবিত খসড়ার পঞ্চম অধ্যায়টি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। যেখানে অনুষ্ঠান সম্প্রচারের অনুপযুক্ততা নিয়ে বেশ কিছু বিধি-নিষেধ আরোপ করা হয়েছে। যা মুক্ত গণমাধ্যমের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াবে। ধারা ৫.১.৩ -এ বলা হয়েছে, ‘ বিচ্ছিন্নতা বা অসন্তোষ সৃষ্টির লক্ষ্যে জাতি বা শ্রেণি বিদ্বেষ প্রচার , কোন ধর্মের প্রতি বিদ্রূপ, অবমাননা বা আক্রমণ , বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায় , বর্ণ বা মতাবলম্বীদের মধ্যে বিদ্বেষ বা বিভেদ সৃষ্টি করে এমন কিছু প্রচার করা যাবে না। উপরোক্ত ধারার ফলে বেশ কিছু বিষয়ে গণমাধ্যমের মুখ খোলা চিরতরে বন্ধ করে দেয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। যেমন কেউ কুরানুল কারীমের বিরুদ্ধে কটূক্তি করলো সেই সংবাদ প্রচার করা যাবে না, এনিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশের পর সৃষ্ট ঘটনার দায় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে নিতে হবে। কেউ হিন্দু সম্প্রদায়ের মন্দির ভেঙ্গে ফেলল সেই প্রতিবেদন প্রকাশের পর যে উত্তেজনা তৈরি হবে তার দায়-দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট গণমাধ্যমকে নিতে হবে। কেউ বৌদ্ধদের উপাসনালয়ে হামলা চালালো সেই সংবাদ প্রচারের পর কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটলে তার দায়-দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট গণমাধ্যমকে নিতে হবে। পৃথিবীর কোনো দেশে এ ধরনের নীতি আছে বলে কেউ দেখাতে পারবে না। অথচ তথ্যের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করা সুশাসনের অন্যতম একটি উপাদান। প্রস্তাবিত নীতিমালার ৫.১.৮ ধারায় বলা হয়েছে, একটি বন্ধুভাবাপন্ন বিদেশি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এমন ধরনের প্রচারণা যার ফলে সেই রাষ্ট্রে ও বাংলাদেশের মধ্যে সুসম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশংকা সৃষ্টি হতে পারে-এমন কোন প্রচারণা করা যাবে না। এ ধারাটি দেশের সার্বভৌমত্ব বিকিয়ে দেয়া সংশ্লিষ্ট একটি ধারা। এতে সরকারের একটি দেশের প্রতি নতজানু নীতিই প্রকাশ পেয়েছে। কারণ বাংলাদেশের চতুর্দিকে পরিবেষ্টিত বিশাল দেশ ভারত। স্বাভাবিকভাবেই দেশ দু’টির মধ্যকার আন্তঃসীমান্ত সমস্যা রয়েছে, নদীর পানির ন্যায্য হিস্যার বিষয় রয়েছে, সীমান্ত হত্যাকাণ্ডের মতো বহুবিধ বিষয় জড়িত রয়েছে দেশ দু’টির মধ্যে। এসব বিষয়ে দেশের স্বার্থরক্ষার দিকটি সংশ্লিষ্ট স্টেইক হোল্ডারদের তুলে ধরার কাজটিই করে থাকে গণমাধ্যমগুলো। আর এ বিধি-নিষেধের মাধ্যমে মনে হচ্ছে গণমাধ্যমের এ ভূমিকা স্তব্ধ করে দেয়ার উদ্যোগ হিসেবেই ধারাটি সংযোজিত হয়েছে । যা নীতিমালা থেকে বাদ দিতে হবে। প্রস্তাবিত নীতিমালার ৫.১.১২ ধারায় বলা হয়েছে, ‘ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে কোন বিদ্রোহ , নৈরাজ্য এবং হিংসাত্মক ঘটনা প্রদর্শন করা’ যাবে না। এখন প্রশ্ন হচ্ছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে দাবি আদায়ে হরতাল, অবরোধ, মিছিল, মিটিং অন্যতম উপাদান হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে যত বড় ধরনের দাবি-দাওয়া আদায় হয়েছে তার একটিও আলোচনার মাধ্যমে সম্ভব হয়েছে তা কেউ বলতে পারবে না। এখন প্রশ্ন হচ্ছে রাজনৈতিক দলের এসব কর্মসূচি প্রচার কি চিরতরে বন্ধ করে দেয়া হবে। আর যদি প্রচারই করতে হয় তাহলে কোন মাত্রা পর্যন্ত প্রচার করা যাবে? আর তা কেইবা মনিটর করবে? নীতিমালার ৫.১.১৩ তে বলা হয়েছে, আইন-শৃঙ্খলা ভঙ্গ করে বা আইন অমান্য করার পক্ষে সহানুভূতি সৃষ্টি করে এমন কিছু দেখানো যাবে না। এখন প্রশ্ন হলো টেলিভিশন চ্যানেলগুলো কিভাবে বুঝবে কোন্ তথ্য আইন অমান্যে সহানুভূতি সৃষ্টি করছে। গণতন্ত্রকে সমুন্নত রাখতে এসব কাণ্ডজ্ঞান বিবর্জিত ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিহিত ধারাগুলো অবিলম্বে বাতিল করতে হবে। অন্যথায় গণমাধ্যমকে সরকারের অনুগত মাধ্যম হিসেবে টিকে থাকতে হবে। খসড়া নীতিমালার এসব ধারা অগণতান্ত্রিক। এতে ৪২ বছরে অর্জিত গণমাধ্যমের স্বাধীনতা তীব্রভাবে বাধাগ্রস্ত হবে। রুদ্ধ হবে গণমাধ্যমের বিকাশের ধারা। সুতরাং একটি গণতান্ত্রিক, জনবান্ধব সম্প্রচার নীতিমালা প্রণয়নে দলমতের ঊর্ধ্বে উঠে গণমাধ্যমকর্মীদের এগিয়ে আসা আজ সময়ের দাবি। সেই সাথে রাজনৈতিক দলগুলোকে মুক্ত গণমাধ্যমের পক্ষে হতে হবে আরো উদার, আরো সরব।
লেখক: সাংবাদিক ও গণমাধ্যম বিষয়ক গবেষক,
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
ইমেইল: [email protected]
