ঝালে ঝোলে অম্বলে

ক্ষমতার রাজনীতি ও জনপ্রত্যাশা

আপডেট : ০৪ অক্টোবর ২০১৩, ২১:২৪
আগামীতে নির্বাচন হবে কিনা, নির্বাচন হলে সব দল অংশগ্রহণ করবে কিনা, যদি বা নির্বাচনে সব দল অংশগ্রহণ করে তাহলে কে বিজয়ী হবে—দেশজুড়ে আপাতত এই আলোচনা। এই আলোচনার কোনো পরিণতি নেই। একথা ঠিক যে, গত নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ও তার মিত্ররা যে বিপুল জনসমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় এসেছিল, তা পরবর্তী সময়ে আর বহাল থাকেনি। দিন দিন জনসমর্থনের কাটা নিচের দিকে নেমেছে। সরকার হিসেবে অনেক ভালো উদ্যোগের পাশাপাশি নেতিবাচক বিষয়ও সামনে চলে এসেছে। তবে দল হিসেবে আওয়ামী লীগ গত পাঁচ বছরে অনেকটাই ম্লান হয়ে গেছে। দলের যারা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পেয়েছেন, তারা নিজেদের স্বার্থ-সুবিধা অনুযায়ী চলেছেন। দলের কর্মীদের চাঙ্গা করা, দলকে মজবুত করার কাজটি ভীষণভাবে উপেক্ষিত হয়েছে। অনেকে মনে করেন, গত পাঁচ বছরে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক মিত্রের সংখ্যা কমেছে। কিছুটা নীতি-নৈতিকতা আদর্শ ধারণ করেন এমন পোড়খাওয়া কর্মীরা দল থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। ফলে দলের সাংগঠনিক অবস্থা দুর্বল হয়ে গেছে। সরকারের ভুল-ত্রুটি, ব্যর্থতা নিয়ে আলোচনা এত বেশি হয়েছে যে, এই ডামাডোলে মধ্যবিত্ত নাগরিকরা সরকারের ভালো কিছু দেখতে পায়নি। সরকারের ভালো কাজের প্রচার কিংবা সরকারের বিরুদ্ধে নানা ধরনের অপপ্রচারের জবাব দেয়ার কোনো ম্যাকানিজম দেখা যায়নি। ফলে সরকারবিরোধী প্রচারণা প্রবল হয়েছে। প্রতিপক্ষরা যে ধর্মীয় অপপ্রচারের ওপর জোর দিতে পারে বিষয়টি মোটেই আমলে নেয়নি আওয়ামী লীগ। তাই এ অপপ্রচার মোকাবেলায় তাদের প্রস্তুতি চোখে পড়েনি। আগামী নির্বাচনে এই বিষয়টি আওয়ামী লীগের জন্য বড় সমস্যা হয়ে দেখা দিতে পারে। পদ্মা সেতু নিয়ে দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের অভিযোগে বিশ্বব্যাংকের ঋণচুক্তি বাতিল এবং ২০১১ সালের জানুয়ারিতে শেয়ারবাজারে অপ্রত্যাশিত দরপতনের ঘটনার দায় এড়াতে পারছে না আওয়ামী লীগ। হলমার্ক ও ডেসটিনির মতো বড় ধরনের আর্থিক কেলেঙ্কারির ঘটনাও সুখকর হচ্ছে না। ২০১১ সালের মার্চে গ্রামীণ ব্যাংক থেকে নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে অপসারণের ঘটনা আওয়ামী লীগকে এখনও অস্বস্তিতে রেখেছে। গ্রামীণ ব্যাংক নিয়ে নানা তত্পরতা এখনও অব্যাহত আছে। ২০১১ সালের মে মাসে র্যাবের গুলিতে লিমনের পঙ্গু হওয়ার ঘটনা এখনও প্রশ্নবিদ্ধ। ২০১২ সালের ৯ ডিসেম্বর জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগ নেতাদের হাতে বিশ্বজিত্ দাস হত্যাকাণ্ডের ঘটনা সরকারকে চরম বিব্রতকর অবস্থায় ফেলেছে। ছাত্রলীগকে সামলাতে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে সরকার। এর ফলে ব্যাপক নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে মানুষের মনে। এ সরকারের আমলে অনেক মন্দিরে হামলার ঘটনা ঘটেছে। অথচ দোষীদের গ্রেফতার করে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়নি। দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণেও তেমন সাফল্য চোখে পড়েনি। কয়েকজন মন্ত্রীর বিরুদ্ধে দুর্নীতির জোর অভিযোগ সত্ত্বেও তাদের বিরুদ্ধে সন্তোষজনক কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। প্রকাশ্যে অস্ত্র উঁচিয়ে জনতাকে ভয় দেখিয়েছেন এমপি। দলীয় ক্যাডারদের আশ্রয়-প্রশ্রয়, লুটপাট, সন্ত্রাস, ঘুষ ও চাঁদাবাজির প্রতিযোগিতা থামানোর ক্ষেত্রেও সরকারকে আন্তরিক মনে হয়নি। বহু এমপির পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ের শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধেও নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ না রাখার অভিযোগ আছে। উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মন্ত্রী-এমপির আত্মীয়করণের কারণে কর্মীরা তাদের কাছে ঘেঁষতেই পারেননি। তৃণমূল কর্মীদের উপহাস এবং কখনও কখনও অপমান করা হয়েছে। এর ফলে অনেক কর্মীই নিষ্ক্রিয় হয়ে গেছেন। সবচেয়ে বড় কথা, দল এবং সরকারের পক্ষ থেকে সমালোচনাকে মোটে পাত্তা দেয়া হয়নি। উল্টো সমালোচনাকারীদের বিরুদ্ধে ক্ষোভ ঝরে পড়েছে ক্ষমতাসীনদের কথায়। সমালোচনা, আত্মসমালোচনা সম্পর্কে অবশ্য আমাদের রাজনৈতিক-সংস্কৃতিতে একটি নেতিবাচক ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। মনে করা হয়, সমালোচনা মানে বদনাম করা, কুত্সা রটনা করা। যদিও ব্যাপারটা মোটেও তা নয়। বরং উন্নত গণতন্ত্রে এ রকম করে ভাবা হয় যে সমালোচনাই গণতন্ত্রের বড় বন্ধু। মানুষ নিজে নিজের ভুল বুঝতে পারে না, দেখতে পারে না। অন্যরা এ ভুল ধরিয়ে দিলেই ব্যক্তি তা বুঝতে পারে এবং ভুলটা সংশোধন করতে পারে। আর যদি ভুল কেউ ধরিয়েই না দেয়, তবে তো ভুল ভুলের জায়গাতেই থেকে যাবে। মানুষের উন্নতি হবে কীভাবে? দুঃখের সঙ্গে বলতে হয়, আমরা সমালোচনার এ মর্মই বুঝিনি। যিনি সমালোচনা করেন, তিনি হয়তো নিন্দা করেন, আর যাঁর সম্পর্কে সমালোচনা করা হয়, তিনি রীতিমতো ক্রদ্ধ হন। রাগ দেখান, ভয় দেখান, অতপর শাস্তি দেন। এ ব্যাপারে অবশ্য আওয়ামী লীগ বিএনপির মানসিকতায় তেমন প্রভেদ আছে বলে মনে হয় না। ‘যারা দুই দল, বিএনপি ও আওয়ামী লীগকে এক পাল্ল¬ায় ফেলেন তাদের কাছে আমার প্রশ্ন— এই দুই দলের জন্মসূত্র থেকে শুরু করে প্রতিটি কার্যক্রম কি পরিষ্কারভাবে বলবেন? আওয়ামী লীগ ১৯৪৯ সালে ভাষা আন্দোলন ও জনগণের দাবি-দাওয়া আদায়ের লক্ষ্যে জন্মগ্রহণ করে। এ দল ক্ষমতাসীনদের দ্বারা উচ্ছিষ্ট বিলিয়ে গঠিত দল নয়। বরং ক্ষমতাসীনদের অন্যায়-অবিচার, শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী কণ্ঠ হিসেবে আওয়ামী লীগের জন্ম।’ কথাগুলো আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার। খুবই সঙ্গত কথা, হক কথা। ‘বিএনপি ও আওয়ামী লীগকে এক পাল্লায় ফেলেন’ যারা, তারা হয়তো ঠিক কাজটি করেন না। কিন্তু বিএনপির সঙ্গে আওয়ামী লীগের পার্থক্যের সীমারেখাটাকে তো স্পষ্টভাবে আওয়ামী লীগকেই নির্ধারণ করতে হবে। দুই দলকে যেন কেউ এক পাল্লায় মাপার ভুল না করে, দায় আওয়ামী লীগকেই বহন করতে হবে। সে দায়িত্ব একান্তই আওয়ামী লীগের। আওয়ামী লীগের কাছে তো সচেতন মানুষের বিপুল প্রত্যাশা। যারাই মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের যথাযথ বাস্তবায়ন চান, তাদের সবারই এ রকম প্রত্যাশা। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বেই যে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল— এ বিষয়ে সন্দেহ প্রকাশ করাটা একেবারেই অমূলক। মতলববাজরা ছাড়া কেউই এরকম সন্দেহ করতে পারে না। কিন্তু আওয়ামী লীগের বাইরে যাদের অবস্থান ছিল তেমন দেশপ্রেমিক ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর অবদানকে যারা অস্বীকার করে, তাদেরও নিশ্চয়ই সত্যনিষ্ঠ বলা চলে না। সে সময়কার পূর্ব পাকিস্তানের বামপন্থীদের মধ্যে যারা মুক্তিযুদ্ধকে ‘দুই কুকুরের লড়াই’ বলেছিল, তারা তো ছিল খুবই ক্ষুদ্র ও নগণ্য বিভ্রান্ত একটি গোষ্ঠী। এরা ছাড়া আর সবাই, যারা ‘চীনপন্থী’ নামে পরিচিত ছিল তারাও নিজেদের মতো করে মুক্তিযুদ্ধে অবদান রেখেছে। আর সে সময়ে ‘মস্কোপন্থী’ বলে পরিচিত ছিল যে সব দল ও গোষ্ঠী তারা তো সবাই জীবনবাজি রেখে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব মানতেও তাদের কোনই আপত্তি ছিল না। কিন্তু আওয়ামী লীগেরই অভ্যন্তরে অবস্থিত একটি সংকীর্ণমনা গোষ্ঠীর সংকীর্ণতার কারণে আওয়ামী-বহির্ভূত ওই দেশপ্রেমিকদের অনেকেই মুক্তিবাহিনীতে যোগ দিতে পারেনি। অবশেষে ন্যাপ কমিউনিস্ট ছাত্র ইউনিয়নের সম্মিলনে পৃথক বাহিনী গঠন করতে হয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধে সেই বাহিনীর অকুতোভয় কর্মকাণ্ড ও আত্মত্যাগকে কি কেউ অস্বীকার করতে পারবে? স্বাধীনতার পর এরাই তো বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে দেশ গড়ার কর্মযোগে নিজেদের উত্সর্গ করেছিল। আওয়ামী লীগের লেজুড়বৃত্তি করার অপবাদ মাথায় নিয়েই তারা তেমনটি করেছিল। তারা স্বাধীনতাবিরোধী সব শক্তির আক্রমণের হাত থেকে আওয়ামী নেতৃত্বাধীন সরকারটিকে বাঁচিয়ে রাখার প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়েছিল। তবে সে চেষ্টায় তারা খুব বেশি যে সফল হতে পারেনি, সে কথা স্বীকার করতেই হবে। সফল হতে না পারার কারণ, আওয়ামী লীগের ভেতরে তখন মোশতাকের মতো দুর্বৃত্তদের প্রভাব বলয় অতিমাত্রায় বিস্তৃত হয়ে পড়েছিল, আর তাজউদ্দীনের মতো মহান দেশপ্রেমিককে অপমানিত ও অবমানিত হতে হয়েছিল। টালমাটাল অবস্থার মধ্যে স্বয়ং বঙ্গবন্ধুও তাল রাখতে পারছিলেন না, পরস্পরবিরোধী কয়েকটি দুষ্টচক্রের চক্রান্তে অসাধারণত গণসমর্থন ধন্য একান্ত বড় মাপের এই মানুষটিও ক্রমেই গণবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিলেন। এই অবস্থাটির সুযোগ গ্রহণ করেছিল গণশত্রুরা, বাংলাদেশে অবস্থিত পাকিস্তানপন্থীরা। স্বাধীনতার ওই দুশমনরা শুধু সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকেই হত্যা করল না, হত্যা করল মুক্তিযুদ্ধের সব মূল্যবোধকেই। সমালোচনা মানে সম্যক আলোচনা। নির্বিচার প্রশংসা কিংবা নির্বিচার নিন্দা— কোনটাই প্রকৃত সমালোচনা নয়। কারও ভালো-মন্দ, ইতি-নেতি, সবলতা-দুর্বলতা, সংকট-সম্ভাবনা, সম্মুখগতি-পশ্চাত্গতি—এরকম সবকিছুর সম্যক আলোচনাই সমালোচনা। যার কাছে অনেক প্রত্যাশা করা হয়, তারই এ রকম সমালোচনা প্রত্যাশাকারীরা করে থাকে। চাটুকারের দল কেবলই প্রশংসা করে, আর দুশমনরা কেবলই নিন্দা করে—এরা কেউই সমালোচনা করে না। নিন্দুকরা বাইরে থেকে সোজাসুজি ও প্রকাশ্যে দুশমনি করে, আর চাটুকাররা দোস্তির অভিনয়ের মাধ্যমে ভেতর থেকে দুশমনি করতে থাকে। এদেরই বিপরীতে অবস্থান প্রকৃত শুভানুধ্যায়ীদের, তাদেরই ভূমিকা সমালোচকের। যারা এই শুভানুধ্যায়ীদের চিনতে পারে না, সমালোচনাকে মনে করে শত্রুতা— তাদের পতন কেউ ঠেকাতে পারে না। আওয়ামী লীগের এমন পতন তার শুভানুধ্যায়ীদের কেউ কামনা করেনি, করে না, করতে পারে না। তারা চায়, আওয়ামী লীগের শুভবুদ্ধির উদ্রেক হোক, দলটি আত্মসমালোচনায় প্রবৃত্ত হোক। কিন্তু দুঃখ এই : আওয়ামী লীগ তার শুভানুধ্যায়ীদের প্রত্যাশার বিপরীতে অবস্থান নেয়; অন্যের সমালোচনা যেমন সহ্য করে না, তেমনই আত্মসমালোচনার ধারে-কাছেও যায় না। এই দলটির অনেক শুভানুধ্যায়ীর মুখে শুনেছি— আওয়ামী লীগ কারও কাছ থেকে কোন পরামর্শ চায় না, চায় নিঃশর্ত সমর্থন। রাজনীতিতে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন কৌশল গ্রহণের প্রয়োজন অবশ্যই আছে। কিন্তু কৌশলের নামে নীতিকে জলাঞ্জলি দেয়া কি সমর্থনযোগ্য? আওয়ামী লীগ কি সেই সমর্থন-অযোগ্য কর্মকাণ্ডই চালিয়ে যায়নি? অতিরিক্ত কৌশলী হতে গিয়ে আওয়ামী লীগ নিজেই কি বিএনপির সঙ্গে তার সব পার্থক্য প্রায় ঘুচিয়ে দিচ্ছে না? আওয়ামী লীগের কাছে যাদের অনেক বেশি প্রত্যাশা ছিল, তারা এ রকম সব প্রশ্নই অত্যন্ত ক্ষোভের সঙ্গে উচ্চারণ করে থাকে। এসব প্রশ্ন যে অহেতুক, সে কথা প্রমাণের দায়িত্ব তো আওয়ামী লীগেরই। কথার মারপ্যাঁচ দিয়ে কিংবা অন্যের দোষকে বড় করে দেখিয়ে কিংবা অতিরিক্ত ভাবাবেগ সৃষ্টির চেষ্টা করে, সে দায়িত্ব পালিত হবে না। কঠোর নীতিনিষ্ঠা ও স্বচ্ছ কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়েই সেই দায়িত্ব পালন সম্ভব। লেখক :কলামিস্ট

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন