পোশাক শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি

আপডেট : ০৪ অক্টোবর ২০১৩, ২১:৫৭
পোশাক শিল্পের শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি কত হইবে তাহা নির্ধারণ করা নিয়া যে তর্ক-বিতর্ক হইতেছে, তাহার প্রেক্ষিতে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সিপিডি অর্থনীতির বিভিন্ন প্রেক্ষাপট বিবেচনা করিয়া ৮১১৪ টাকা ন্যূনতম মজুরী নির্ধারণ করিবার জন্য সুপারিশ করিয়াছে। ইহার বিপরীতে বিজিএমইএ তাহাদের প্রাথমিক প্রতিক্রিয়ায় শুধু ৬০০ টাকা বাড়াইয়া ৩৬০০ টাকা করার কথা জানাইয়াছে। এমন অবস্থায় প্রশ্ন আসিতেই পারে—তাহা হইলে এই ন্যূনতম মজুরি কতটুকু বৃদ্ধি হওয়া উচিত? ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করিবার ক্ষেত্রে আমাদের কী কী বিষয় বিবেচ্য হওয়া উচিত? যখন সিপিডির মত কোন সংস্থা ইহা নির্ধারণের কথা বলিতেছে তখন সর্বশেষ ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করিবার পর তাহার মাঝখানে সেই ব্যয় কতটা বাড়িয়াছে—তাহার সাথে সামঞ্জস্য রাখিয়াই ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করিবার ধাপগুলি নিতেছে বা কোন একটা সংখ্যা তাহারা ঠিক করিতেছে। অন্যদিকে, পোশাক মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ-এর পক্ষ থেকে ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের ক্ষেত্রে বিশ্ববাজারে তাহাদের রপ্তানি করিবার যে সক্ষমতা তাহা মাথায় রাখিয়া যতটা কম সম্ভব ন্যূনতম মজুরি বাড়ানোর কথা চিন্তা করা হইতেছে। এখন বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের এই পোশাকের চাহিদা থাকিবে কি থাকিবে না, তাহা নির্ভর করে দুটি বিষয়ের ওপর। একটি হল ‘সক্ষমতা’, অর্থাত্ আমরা প্রতিযোগিতামূলক দামে ক্রয়-বিক্রয় করিতে পারিতেছি কিনা। আরেকটি হল নির্বিঘ্ন সরবরাহ। বাংলাদেশের খরচ বা দাম যতই কম হউক, সরবরাহ নির্বিঘ্ন না হইলে বিশ্ববাজারে যে দেশগুলি আমাদের চাইতে সক্ষমতায় একটু পিছাইয়া আছে, ক্রেতারা সেই দেশগুলিতে চলিয়া যাইতে বাধ্য হইবে। ফলে এখানে দুটি বিষয় রহিয়াছে চিন্তা করিবার—একটি হইল ন্যূনতম মজুরি বাড়ানো হইলে সক্ষমতার ক্ষেত্রে ইহার প্রভাবের ব্যাপকতা এবং একই সময়ে এই সক্ষমতার ক্ষেত্রে কিছুটা প্রভাব পড়িলেও যদি আমাদের সরবরাহ নির্বিঘ্ন করা যায়, যদি শ্রমিকদের সাথে একটা বিশ্বাসের সম্পর্ক স্থাপন করা যায় তাহা হইলে দীর্ঘমেয়াদে আমাদের পোশাক শিল্পের যেসব সমস্যা ও অস্থিরতা আছে সেইগুলি নিরসন করিবার সম্ভাবনা। এক নম্বর প্রশ্ন অনুযায়ী, এই ন্যূনতম মজুরি আমাদের সক্ষমতার ক্ষেত্রে কতটুকু প্রভাব ফেলিবে? এই ন্যূনতম মজুরি শুধু বাংলাদেশের সমস্যা নয়। কমবেশি মূল্যস্ফীতি আমাদের প্রতিযোগী প্রত্যেক দেশেই হইয়াছে যাহার জন্য ওইসব দেশেও খরচ বাড়িতেছে। আমাদের বিভিন্ন সমস্যা থাকা সত্ত্বেও বিশ্ববাজারের ক্রেতারা আমাদের দেশের দিকেই বেশি করিয়া আসিতেছে। তাহার মানে ইহা কিছুতেই বলা যায় না যে, আমরা সক্ষমতার দিক দিয়া পিছাইয়া পড়িয়াছি। বরং বর্তমানে বিশ্ববাজারে আমাদের পোশাকের চাহিদা যেইভাবে বাড়িতেছে, তাহাতে আমাদের সক্ষমতা ক্রমে বাড়িতেছে বলিয়াই প্রতীয়মান হইতেছে। অন্যদিকে, একজন শ্রমিককে তাহার জীবনযাপনের জন্য প্রয়োজনীয় যে মজুরি দেওয়া দরকার, সেই পরিমাণ মজুরি যদি না দিতে পারা যায়, সেই শ্রমিক যদি কংকালসার-হাড্ডিসার হইয়া যায় ন্যূনতম ভোগের অভাবে, তাহা হইলে একটি শিল্পের সেই ধরনের পরিচালনার মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা আনিবার যৌক্তিকতা দারুণভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হইবে এবং সেই শিল্প টেকসই হইবে না। তাই শ্রমিকের ন্যূনতম জীবনযাপনের জন্য প্রয়োজনীয় মজুরি যে কোম্পানিগুলি দিতে পারিবে না, তাহারা ঝরিয়া পড়িবে ইহাই স্বাভাবিক। এইরকম ১০-১৫ শতাংশ কোম্পানি যদি শিল্প থেকে বাহির হইয়া যায়, তাহা হইলে বরং শিল্পের দক্ষতা বাড়িবে। পৃথিবীর কোন শিল্পেই অদক্ষরা টিকিয়া থাকিতে পারে না, দক্ষরাই তাহাদের পরিচালনার পরিসর আস্তে আস্তে বাড়াইয়া বাজারের বড় অংশ দখল করিয়া নেয়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও তেমনটিই ঘটিতে পারে। আরেকটি বিষয় মনে রাখিতে হইবে যে, যখনি মজুরি বাড়িবে, সাথে সাথে বাড়িভাড়া বাড়াইয়া দিয়া বর্ধিত মজুরি থেকে অনেকটাই বাড়ির মালিকরা কাটিয়া নিবে, সেইক্ষেত্রে শীঘ্রই শ্রমিকরা তাহাদের প্রকৃত আয় আগের জায়গায় ফিরিয়া গিয়াছে বলিয়া উপলব্ধি করিবে, তাই আবার তাহারা আন্দোলন করিবে। ফলে সরকারি ভর্তুকি, বাহির থেকে আসা সাহায্য এবং মালিকদের সহায়তায় সম্মিলিতভাবে শ্রমিকদের আবাসনের ব্যাপারে কোন ব্যবস্থা করা, যেমন কোন পোশাক শ্রমিক পল্লী গঠন করা যায় কিনা তাহা নিয়া চিন্তা করিতে হইবে। যেখানে পোশাক শ্রমিকদের বাড়িভাড়া সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকিবে। ফলে শ্রমিকদের প্রকৃত আয় কমিয়া যাওয়ার ফলে যে আন্দোলন, তাহা অনেকাংশেই প্রশমিত হইবে।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন