সরকারের কর্তাব্যক্তিরা প্রায়শ বলিয়া থাকেন যে, সবার আগে জনগণের নিরাপত্তা; কিন্তু ব্যাপক প্রাণহানির মতো গুরুতর বিপর্যয় না ঘটা পর্যন্ত যে তাহাদের নিদ্রাভঙ্গ হয় না— বাস্তবে সেই উদাহরণই বেশি। বিশ্বব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টিকারী সাভারের রানা প্লাজা বিপর্যয়কে ইহার করুণতম উদাহরণ হিসাবে উত্থাপন করা যাইতে পারে। উদ্বেগের বিষয় হইল, এতো ভয়াবহ অভিজ্ঞতার পরও পরিস্থিতির খুব একটা পরিবর্তন পরিলক্ষিত হইতেছে না। বেসরকারি আবাসন বা শিল্পখাত শুধু নহে— শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসহ শুধু সরকারি পর্যায়েই এখনও ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের ছড়াছড়ি। সেইসব ভবনেই চলিতেছে শিক্ষার্থীদের লেখাপড়া, জরুরি স্বাস্থ্যসেবা এবং দাপ্তরিক গুরুত্বপূর্ণ কাজকর্ম। বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জে যেই ভবনটিতে মহিলা অধিদফতরের কার্যক্রম চলিতেছে সেই ভবনটিকে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করা হইয়াছে আগেই। কিন্তু সংস্কারের উদ্যোগ নাই। নাই সেইখানে কর্মরত মানুষগুলির নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের কোনো তত্পরতা। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর উপজেলার দুর্গাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভবন পরিত্যক্ত ঘোষিত হইয়াছে। কিন্তু বিকল্প কোনো ব্যবস্থা গৃহীত না হওয়ায় সন্ত্রস্ত শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা এখন স্কুলমাঠেই শিক্ষা কার্যক্রম চালাইয়া যাইতেছেন। উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা জানাইয়াছেন যে শুধু দুর্গাপুরেই ব্যবহার অনুপযোগী বিদ্যালয়ের সংখ্যা ২৪টি। নোয়াখালীতে ২৫০ শয্যার সরকারি জেনারেল হাসপাতালের অবস্থা আরও শোচনীয়। সমপ্রতি হাসপাতালটির শিশু ওয়ার্ডের আস্তর খসিয়া রোগীর অভিভাবকসহ ৫ জন আহত হইয়াছেন। আতঙ্কে বন্ধ হইবার উপক্রম হইয়াছে চিকিত্সা কার্যক্রম। এইসব যে কোনো বিচ্ছিন্ন চিত্র নহে— তাহা বলার অপেক্ষা রাখে না। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রতিষ্ঠানে জননিরাপত্তার অবস্থা যদি এই হয়, তাহা হইলে নিয়ন্ত্রণহীনভাবে নির্মিত বেসরকারি আবাসিক ভবন এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের অবস্থা কী হইতে পারে— তাহা সহজেই অনুমেয়।
রাজধানী ঢাকায় রাজউকের মতো শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান থাকা সত্ত্বেও সংস্থাটির অনুমোদন ছাড়াই হাজার হাজার ভবন নির্মিত হইয়াছে। খোদ রাজউকই তাহা স্বীকার করিয়াছে। সঙ্গতকারণেই দেশের বেশিরভাগ এলাকায় যেইখানে এই ধরনের নিয়ন্ত্রণ বা তদারককারী কোনো প্রতিষ্ঠান নাই সেইসব এলাকার অবস্থা অনুমান করিতেও ভয় হয়। তবে সরকারি প্রতিষ্ঠানের চিত্র ভিন্ন। তাহাদের নিজস্ব তদারকি ব্যবস্থা রহিয়াছে। বিশেষ করিয়া শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতের যাবতীয় নির্মাণ কাজ তদারকির জন্য বিশালাকৃতির স্বতন্ত্র দপ্তর আছে। আছে পর্যাপ্ত দক্ষ জনবল। প্রতিবত্সর বিপুল অর্থবরাদ্দও যাইতেছে সেইখানে। তাহা সত্ত্বেও সরকারি হাসপাতাল ও বিদ্যালয়গুলির এই দুরাবস্থা কেন— করদাতা জনগণ সেই প্রশ্ন তুলিতেই পারেন। ভবন নির্মাণ হইতে সংস্কার অবধি— তাহা দেখভাল করা যাহাদের কাজ তাহারা তাহাদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করিলে যে এমত অবস্থার সৃষ্টি হইত না তাহাতে সন্দেহ নাই। শুধুই কি অবহেলা? প্রকৃত চিত্রটি যে কতোটা হতাশাব্যঞ্জক তাহাও দেশবাসীর অজানা নহে। সদ্যনির্মিত বহু ভবনেরও আস্তর খসিয়া পড়িতেছে। খুলিয়া পড়িতেছে দরজা-জানালা। অন্যদিকে সময়োচিত সামান্য সংস্কারের অভাবে ব্যবহার অনুপযোগী হইয়া পড়িতেছে বহু ভবন। সেইসাথে বৃদ্ধি পাইতেছে নিরাপত্তার ঝুঁকি। দরিদ্র জনগণের সীমিত সম্পদ ও কষ্টার্জিত অর্থের প্রতি ন্যূনতম দায়বদ্ধতা থাকিলে বত্সরের পর বত্সর ধরিয়া এই অবস্থা চলিতে পারিত না। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সংশ্লিষ্ট দপ্তরের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী এবং উচ্চপর্যায়ের নীতিনির্ধারকরাও তাহাদের দায়িত্ব এড়াইতে পারিবেন বলিয়া মনে হয় না। কারণ এইসব বিষয় তাহাদের অজানা থাকিবার কথা নহে।
