দারিদ্র্যের বলি

আপডেট : ০৫ অক্টোবর ২০১৩, ২১:১৭
দুঃসহ দারিদ্র্য হইতে মুক্তির প্রত্যাশায় তাহারা বিপদসঙ্কুল সমুদ্রে নৌকা ভাসাইয়াছিলেন। চোখে ছিল কিছুটা স্বস্তিকর জীবনের স্বপ্ন। গন্তব্য ইতালি। কিন্তু প্রায় ঘাটে আসিয়াই ডুবিয়া গিয়াছে নৌকা। সেই সাথে সলিলসমাধি হইয়াছে হতদরিদ্র এই মানুষগুলির সকল স্বপ্ন ও প্রত্যাশার। তাহাদের অনেকেরই এখন ঠাঁই হইয়াছে সারিবদ্ধ লাশের কফিনে। বিদেশ বিভূঁইয়ে আত্মীয়-পরিজনহীন পরিবেশে এমন মৃত্যু কাহারও কাম্য হইতে পারে না। কিন্তু ইহাই এখন বাস্তবতা। লিবিয়ার মিসরাতা বন্দর হইতে ছাড়িয়া আসা ৬৬ ফুট দীর্ঘ নৌকাটির ৫০০ আরোহীর মধ্যে মাত্র ১৫১ জনকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হইয়াছে। ইতালির ছোট্ট দ্বীপ লেমপেদুসার সন্নিকটে গত বৃহস্পতিবারের মর্মান্তিক এই নৌকাডুবির ঘটনায় মৃতের সংখ্যা ৩০০ ছাড়াইয়া যাইতে পারে বলিয়া আশঙ্কা করা হইতেছে। ইতিমধ্যে শতাধিক লাশ উদ্ধার করা হইয়াছে। নৌকার আরোহীদের বেশির ভাগই ছিলেন আফ্রিকার ইরিত্রিয়া ও সোমালিয়ার নাগরিক। এই মৃত্যু অনিবার্যভাবে আমাদেরকে অনুরূপ আরও অসংখ্য মৃত্যুর ভয়াবহতার কথা স্মরণ করাইয়া দেয়। খুব বেশি দূরে যাইবারও প্রয়োজন পড়ে না। শুধু টেকনাফ উপকূল হইয়া বিদেশে পাড়ি জমাইতে গিয়া বঙ্গোপসাগর ও ভারত মহাসাগরেই প্রতিনিয়ত অকালে ঝরিয়া পড়িতেছে বহু মূল্যবান জীবন। অতএব, যতো বেদনাদায়কই হউক না কেন মৃত্যুর এই মিছিল আকস্মিক যেমন নহে, তেমনি অদূর ভবিষ্যতে এই মিছিল থামিবার সম্ভাবনাও সুদূরপরাহত। কারণ, দারিদ্র্যের নির্মমতাই তাহাদেরকে এই নিশ্চিত মৃত্যুর মুখে ঠেলিয়া দিতেছে। অভিবাসন নূতন নহে। মানবসভ্যতার সূচনালগ্ন হইতে জীবিকা ও সচ্ছলতার সন্ধানে মানুষ একদেশ হইতে অন্যদেশে শুধু নহে, এক মহাদেশ হইতে অন্য মহাদেশেও পাড়ি জমাইয়াছে। শ্বাপদসঙ্কুল অরণ্য, দুর্গম পর্বত কিংবা ঝঞ্ঝাক্ষুব্ধ সমুদ্র—কিছুই তাহাদের সম্মুখে বাধা হইয়া দাঁড়াইতে পারে নাই। কিন্তু এখনকার বাস্তবতা একেবারেই ভিন্ন। এখন ইচ্ছা করিলেই একদেশ হইতে অন্যদেশে পাড়ি দেওয়া যায় না। অরণ্য, পর্বত কিংবা সমুদ্রের চাইতেও বড়ো বাধা হইয়া দাঁড়াইয়াছে মনুষ্যসৃষ্ট আইনকানুন। কিন্তু দারিদ্র্যের কষাঘাতে জর্জরিত এশিয়া, আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকার হাজার হাজার মানুষ এখন অনন্যোপায় হইয়া বাছিয়া লইতেছে অভিবাসনের চোরাগুপ্তা পথ। সেইপথ অতিশয় বিপজ্জনক হইলেও তাহা লইয়া ভাবনাচিন্তা করিবার মতো অবস্থাও তাহাদের নাই। একদিকে উপশমহীন ক্ষুধা ও দারিদ্র্য, অন্যদিকে গোঁদের উপর বিষফোঁড়ার মতো তাহাদের পিছু ধাওয়া করিতেছে যুদ্ধ ও সন্ত্রাসের দানব। ফলে যাহা হইবার তাহাই হইতেছে। নিহতদের জন্য দুঃখ কিংবা শোক প্রকাশ করিয়া আমরা সান্ত্বনা পাইতে পারি। কিন্তু তাহাতে অবস্থার কোনো হেরফের হইবে না। সমস্যাটি এতোই গভীর ও জটিল যে ইহার সহজ কোনো সমাধান নাই বলিলেই চলে। মৃত্যুর এই মিছিল থামাইতে হইলে সংশ্লিষ্ট দেশগুলিকে দারিদ্র্যের দুষ্টচক্র হইতে মুক্ত করিতে হইবে। গত অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় ধরিয়া এই লক্ষ্যে তোড়জোড় কম হয় নাই। কিন্তু ফলাফল যে যথেষ্ট আশাব্যঞ্জক নহে অসহায়ভাবে সমুদ্রে ডুবিয়া মরা মানুষগুলিকেই তাহার অকাট্য প্রমাণ হিসাবে হাজির করা যাইতে পারে। আবার দারিদ্র্যমুক্তির প্রত্যাশায় তাহারা যেইখানে ছুটিয়া যাইতেছিল সেই ইতালিসহ একদা সম্পদশালী বহু দেশও এখন অর্থনৈতিক সংকটে বিপর্যস্ত। এইদিকে যুদ্ধ, সন্ত্রাস ও আত্মঘাতী হানাহানির কারণেও অনেক দেশের অর্থনীতি ভাঙিয়া পড়িতেছে। বিপর্যস্ত হইয়া পড়িতেছে জনজীবন। দারিদ্র্যের দীর্ঘ কাফেলায় নবাগত হিসাবে যুক্ত হইতেছে সেইসব দেশের অগণিত ছিন্নমূল মানুষও। অতএব, দারিদ্র্যের দুষ্টচক্র যেমন ভাঙিতে হইবে— তেমনি যুদ্ধ, সন্ত্রাস ও হানাহানির স্থায়ী অবসান ছাড়া ছিন্নমূল ও দরিদ্র মানুষের বিপজ্জনক এই কাফেলা থামানো যাইবে না।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন