শিক্ষা খাতে বরাদ্দের সদ্ব্যবহার

আপডেট : ০৫ অক্টোবর ২০১৩, ২১:১৭
খবরে প্রকাশ, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বেতন বাড়িতেছে। প্রধান শিক্ষকদের বাড়িতেছে পদমর্যাদাও। তাহারা তৃতীয় শ্রেণী হইতে দ্বিতীয় শ্রেণীর মর্যাদা লাভ করিবেন। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকরা জাতীয় বেতন স্কেলের ১৩-এর বদলে ১০ম গ্রেডে এবং প্রশিক্ষণবিহীন প্রধান শিক্ষকরা ১৪-এর পরিবর্তে পাইবেন ১১তম গ্রেড। তাহাদের বেসিক বা মূলবেতন দাঁড়াইবে যথাক্রমে আট হাজার ও ছয় হাজার ৪০০ টাকা। পক্ষান্তরে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সহকারী শিক্ষকরা ১৫-এর বদলে ১২তম এবং প্রশিক্ষণবিহীন সহকারী শিক্ষকরা ১৬-এর পরিবর্তে ১৩তম গ্রেড লাভ করিবেন। এইজন্য সরকারের বত্সরে অতিরিক্ত খরচ হইবে ২৯২ কোটি টাকা। শীঘ্রই এই ব্যাপারে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসিতে পারে বলিয়া জানা গিয়াছে। অন্যদিকে বর্তমানে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা আবার বেতন-ভাতা বৃদ্ধিসহ নানা দাবিতে আন্দোলন শুরু করিয়াছেন। তাহারা দাবি না আদায় পর্যন্ত রাজপথ ছাড়িবেন না বলিয়া দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করিয়াছেন। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। কেননা শিক্ষার্থীদের মৌলিক শিক্ষা প্রদানে তাহাদের ভূমিকাই ব্যাপক। ফাউন্ডেশন বা ভিত্তি মজবুত না হইলে যেমন কোন ভবন টিকিয়া থাকিতে পারে না, তেমনি প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের ভিত্তি শক্ত না হইলে তাহারা উচ্চশিক্ষায় ও কর্মজীবনে সফল হইতে পারে না। এইক্ষেত্রে এই স্তরের শিক্ষকদের নিবিড় পর্যবেক্ষণ, যত্ন ও ধৈর্য্যের একান্ত প্রয়োজন। ইংরেজিতে বলা হয়, Preparing today’s students for tomorrow’s economy. অর্থাত্ আজিকার শিক্ষার্থীদের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া মানে আগামীর অর্থনীতির পথ প্রশস্ত করা। অন্যকথায়, শিক্ষার ক্ষেত্রে অগ্রগতি হইলে দেশের অর্থনীতির চাকাও সচল হইবে। তাই যাহারা এইরূপ মানুষ গড়ার কারিগর তাহাদের কথাও সর্বাগ্রে ও সর্বান্তকরণে ভাবিতে হইবে। তবে শুধু প্রাথমিক বিদ্যালয়ই নহে, স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদেরও আর্থিক সুবিধাদি বৃদ্ধি করা দরকার যাহাতে তাহাদের সামাজিক মর্যদা বাড়ে এবং তাহারা নিশ্চিন্তে পাঠদান করিতে পারেন। আমরা জানিতে পারিয়াছি যে, আমেরিকার প্রাথমিক শিক্ষকরা প্রতি বত্সর গড়ে ৭৯৪ ঘন্টা শিক্ষার্থীর পিছনে ব্যয় করেন। এইভাবে ১৫ বত্সর অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষকরা পান বার্ষিক ৪৩,৬৩৩ ডলার। হিসাব করিলে দেখা যায়, ইহাতে তাহাদের মাসিক বেতন দাঁড়ায় বাংলাদেশি মুদ্রায় তিন লক্ষাধিক টাকা। তাহারপরও ইহাকে তাহারা অপ্রতুল মনে করেন। যুক্তরাষ্ট্র পৃথিবীর এক নম্বর অর্থনীতির দেশ। সেখানকার জীবনযাত্রার ব্যয় ও আর্থিক সংগতি অনুযায়ী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের এমন বেতন হওয়াই স্বাভাবিক। তবে আমাদের নিকটতম প্রতিবেশী দেশ ভারতের কথাও এইখানে বিবেচনায় আনা যাইতে পারে। সেখানে একজন প্রাথমিক শিক্ষক বেতন পান কমপক্ষে ১৫ হাজার রুপি। ভারত নব্বই দশক হইতে শিক্ষা বিস্তারে নিরলসভাবে কাজ করিয়া যাইতেছে। বিশ্বের উদীয়মান অর্থনীতির দেশ হিসাবে তাহার সুফল তাহারা হাতেনাতেই পাইতেছে। বাংলাদেশেরও উন্নতি সাধন করিতে হইলে শিক্ষকদের উপযুক্ত বেতন-ভাতা দিতে হইবে। যাহাতে মেধাবীরা শিক্ষকতার ন্যায় মহান পেশায় আসিতে পারেন। ইজাছাড়া ইংরেজি, চীনা, কোরিয়ান প্রভৃতি একাধিক বিদেশি ভাষা চর্চা এবং কারিগরি ও প্রযুক্তিগত শিক্ষাকে গুরুত্ব দিতে হইবে। বর্তমানে আমাদের বাজেটে দ্বিতীয় অগ্রাধিকার পাইতেছে শিক্ষা খাত। তাহারপরও এই খাতে সমস্যার অন্ত নাই। প্রয়োজনে এই বরাদ্দ আরও বাড়াইতে হইবে যাহাতে শিক্ষা ও শিক্ষা অবকাঠামো খাতে আরও ব্যয় করা যায়। তাহাছাড়া শিক্ষা ব্যবস্থাপনায় নানা অনিয়ম ও দুর্নীতি দূর করিয়া বাজেটে প্রদত্ত অর্থের সদ্ব্যবহার করা অত্যাবশ্যক। বর্তমান সরকার শিক্ষক নিবন্ধন কর্তৃপক্ষ গঠন হইতে শুরু করিয়া প্রাথমিক ও জুনিয়র মাধ্যমিকে পাবলিক পরীক্ষা চালু, হাজার হাজার শিক্ষক নিয়োগসহ শিক্ষাখাতে অনেক ভাল কাজ করিয়াছে। ইতোমধ্যে জাতীয়করণ করা হইয়াছে ২৬ হাজার ১৯৩টি প্রাথমিক বিদ্যালয়। ইহাতে ব্যাপক জনগোষ্ঠী উপকৃত হইয়াছে, ইহাতে কোন সন্দেহ নাই। এখন বেতন-ভাতা বৃদ্ধির দাবিটিও যৌক্তিক। তবে এতসব ইতিবাচক পদক্ষেপ গ্রহণের পরও যদি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কোন শিক্ষকের অনুপস্থিতি বা ক্লাস করানোর ক্ষেত্রে ফাঁকিবাজি ধরা পড়ে, তাহা হইলে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হইবে। ট্যাক্সের টাকায় সরকারি ব্যয় হইতে জনগণ যাহাতে প্রকৃত অর্থেই উপকৃত হন সেদিকেও নজর দিতে হইবে।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন