এবারের সংগ্রাম হোক শান্তির সংগ্রাম, সমঝোতার সংগ্রাম

আপডেট : ০৬ অক্টোবর ২০১৩, ২২:০২
মাত্র কয়েকটি মাস বাকি। বর্তমান সরকারের মেয়াদকাল শেষ, এখন নির্বাচন হওয়ার কথা। সেই হিসাবে আগামী অক্টোবর থেকে জানুয়ারির মধ্যে যে কোন সময় বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচন হওয়ার কথা। বর্তমান রাজনীতিতে এক ধরনের অশান্তি, এক ধরনের অস্থিরতা এবং এক ধরনের স্থবিরতা ভর করে আছে। সরকার তার অধীনেই নির্বাচন করার দৃঢ় প্রত্যয়ে আর বিরোধী দল নির্দলীয় সরকার ব্যতীত নির্বাচনে অংশ নেবে না এবং নির্বাচন করতে দেবে না। সুস্পষ্ট ইঙ্গিত অস্থিরতার। বিদেশি বন্ধুরা বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন, ভারত এবং জাতিসংঘ সকলের অংশগ্রহণে বাংলাদেশে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের লক্ষ্যে বিএনপি এবং আওয়ামী লীগকে চাপ দিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশের সুশীল সমাজ, লেখক, কবি-সাহিত্যিক, পেশাজীবী সকল পক্ষই শান্তিপূর্ণ একটি সমাধানের দাবি জানিয়ে আসছে। শান্তি, না অশান্তি—এই প্রশ্ন সকলের মধ্যে থাকলেও উত্তর শুধু বাংলাদেশের দুই পরাক্রমশালী রাজনৈতিক দল বিএনপি এবং আওয়ামী লীগের কাছে আছে। এই দু’টি দলের ইচ্ছানুযায়ী এ দেশে শান্তিপূর্ণ নির্বাচন হতে পারে, আবার অন্যদিকে এই দু’টি দলের ইচ্ছায় নির্বাচনমুখী অশান্তিতে এ দেশ সয়লাব হয়ে যেতে পারে। আলাদিনের চেরাগ পেয়েছে এই দু’টি দল। প্রকৃতপক্ষে ভুল বলা হলো। আসলে আলাদিনের চেরাগ পেয়েছেন এই দুই দলের দুই নেত্রী। শান্তি-অশান্তি, সমঝোতা-শত্রুতা সবকিছুই এখন এই দুই নেত্রীর হাতে। এই দুই নেত্রীর যে কোন একজন রাজনীতির মাঠে প্রকৃত দেশনেত্রী হতে ইচ্ছা করলেই দেশ ও জাতিকে বিশৃংখলার হাত থেকে রক্ষা করার কাজটি করতে পারেন। প্রতিযোগিতার রাজনীতি বহাল আছে সারা পৃথিবীতেই। যুক্তরাষ্ট্রের কথা বলুন আর ভারতের কথাই বলুন সকল ধরনের রাজনীতিতেই প্রতিযোগিতা বিদ্যমান আছে। কিন্তু সেই প্রতিযোগিতায় দেশের নির্বাচন অনিশ্চয়তায় যাচ্ছে না, নির্বাচন নিয়ে শংকার সৃষ্টি হয়ে রাজপথে রাজনৈতিক কর্মীদের লাশ পড়ে থাকছে না। পাঁচ বছর মেয়াদ শেষে বাংলাদেশেও একটি নির্বাচন হওয়ার কথা। সেই নির্বাচনে সকলের অংশগ্রহণ হবে এবং সুষ্ঠু এই নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সরকার আসবে এমনটাই রাজনীতির ব্যাকরণে লেখা আছে। কিন্তু সেই ব্যাকরণের সোজা ধারা দুই প্রভাবশালী দল মেনে নিচ্ছে না। পরস্পরের অবিশ্বাসের ফলে সৃষ্টি হয়েছিল একসময় নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা। যদিও এ ব্যবস্থা কারও কাম্য ছিল না কখনও এবং সব সময়ই আমরা সবাই আশা করি, কত দ্রুত বের হয়ে আসা যায় এ ব্যবস্থা থেকে। কেননা তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা রাজনীতি আর গণতন্ত্রের জন্য নেগেটিভ একটি ব্যবস্থা। সরকারকে বিরোধী দল আস্থায় নিতে পারে না বলেই মাঝখানে ক্ষমতা দেয়া হয় তত্ত্বাাধায়ক সরকারের হাতে। যদি রাজনীতিতে নীতি আর আস্থার জায়গাটি ফিরে আসে তবে সরকারে যেই থাকুক, নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন করার সুযোগ থাকে না এবং নির্বাচনে অসাধুতার সুযোগ থাকে না। একসময় আজকের দুই প্রধান রাজনৈতিক দলের সংগ্রামের ফলেই রাজনীতিতে গণতন্ত্র ফিরে এসেছিল। হাঁটি হাঁটি পা পা করে সেই গণতন্ত্র এগিয়েও যাচ্ছিল। ২০০৭-এ এসে সেই গণতন্ত্র বড় মাত্রায় হোঁচট খেল। রাজনীতি মুখ থুবড়ে পড়ে গেল এবং দেশে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার এসে গণতন্ত্রের সফলতাকে পিছনে ফেলে দিল। তারপর ২০০৮ থেকে পরবর্তী পাঁচ বছর ভালভাবেই কেটে গেল। ঠিক এবার এসে আবার একটি বড় ধরনের প্রশ্ন সামনে এসে পড়ল নির্বাচনের পূর্বে। সরকার আদালতের রায়ের সুযোগে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করার এখনই উপযুক্ত সুযোগ মনে করে বসল এবং তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা সংবিধান থেকে বাতিল করে দিল। বিরোধী দল নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহাল চাইল। সমস্যাটি শুরু হল এখানেই। নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থাটি বাতিল করার উপযুক্ত সময় নিয়ে দ্বন্দ্ব দুই প্রধান রাজনৈতিক দলের মধ্যে। বিএনপি মনে করে, তাদের রাজনীতি এখনও দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত নয়। অপরদিকে সরকারি দল মনে করে জাতি এখনই প্রস্তুত। সমস্যা এখানেই, দ্বন্দ্ব এখানেই। খুব স্বাভাবিক মতবিরোধ এটি। সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন হবে না এমনটাই মনে করে বিরোধী দল; তাই তার দাবি নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন। সরকার তার অধীনেই নির্বাচন করতে চায়। এ পর্যন্ত দু’দলের অবস্থানকে গ্রহণ করা যায়। তারপর যে বিষয়টি আসে তা হলো, এবারের সংগ্রাম কি শান্তির সংগ্রাম হবে, না ধ্বংসের সংগ্রাম হবে? রাজনৈতিক চাপ অথবা রাজনৈতিক সংগ্রামের সাথে সহিংসতার সংমিশ্রণ করে দেশের সার্বিক পরিস্থিতিকে হুমকির মুখে ফেলে দিয়ে যে রাজনীতি হয় তা কোন দেশেই সুস্থ রাজনীতি বলে পরিচিত নয়। রাজনীতিতে সংগ্রাম ও দাবি আদায়ে জনগণের সমর্থন পাওয়ার কৌশল নির্ধারণ করার নামই জনপ্রিয় রাজনীতি। রাজনীতির নামে রাজপথে মানুষের লাশ উপহার দেয় যে পদ্ধতি, তাকে সুস্থ রাজনীতি বলার কোন সুযোগ নাই। গ্রামবাংলার একটি প্রবাদ আছে- ‘সোজা আঙ্গুলে ঘি না উঠলে আঙ্গুলটি একটু বাঁকা করো’। বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিএনপি-আওয়ামী লীগের কাছে বাঙালির হাজারো কণ্ঠের কান্না কখনও পৌঁছেনি। কারও অনুরোধেই তারা শান্তি বা সমঝোতার পথে আসেনি। শান্তির পথে আসার অনুরোধ বিদেশি শক্তির কাছ থেকেও এসেছে কিন্তু তাতেও কাজ হয়নি। তাই অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, বিদেশি বন্ধুরা আঙ্গুলটি একটু বাঁকা করার অদৃশ্য হুমকি দিয়েছে; আর তাতেই এই দু’টি দলের সুর পাল্টে যাচ্ছে। বিএনপির দাবিকৃত নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের রূপরেখা প্রকাশ আর আওয়ামী লীগের সেই রূপরেখা নিয়ে আলোচনা করার প্রস্তুতি এমন ইঙ্গিতই বহন করে। যা-ই হোক, কারণ যা-ই হোক, দেশে শান্তি ফিরে আসুক এবং এই চির প্রতিদ্বন্দ্বী দুই রাজনেতিক দল সমঝোতার টেবিলে ফিরে আসুক এমনটাই আমাদের প্রত্যাশা। লেখক : সাবেক সেনা কর্মকর্তা

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন